ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই খুশি! বিশেষ করে ঈদুল আজহা, যা ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর। এই দিনে মুসলিম উম্মাহ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানি করে থাকে। ইসলাম আনন্দ-উৎসবের এই দিনটিকে ইবাদত-বন্দেগি দ্বারা মহিমান্বিত করেছে। তাই এই দিনের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো সঠিকভাবে জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য জরুরি।
ঈদুল আজহার করণীয়সমূহ
গোসল করা: ঈদের নামাজের আগে গোসল করা সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে গোসল করতেন। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক)
উত্তম পোশাক পরিধান: ঈদের দিন উত্তম ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) ভালো পোশাক পরিধান করতেন এবং তাঁর একটি লাল ও সবুজ ডোরার চাদর ছিল, যা তিনি দুই ঈদ ও জুমার দিন পরতেন। নতুন পোশাক না থাকলেও পরিষ্কার পোশাক পরলেই চলবে।
সুগন্ধি ব্যবহার: সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নত, আর ঈদের দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশেষভাবে সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। সুগন্ধি ছিল তাঁর তিনটি পছন্দনীয় জিনিসের অন্যতম।
ঈদের দিনে খাওয়া: ঈদুল আজহার দিন ঈদের নামাজের আগে কিছু না খাওয়া মোস্তাহাব। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল আজহার দিন ঈদের নামাজ আদায় পর্যন্ত কিছুই খেতেন না। (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ) সাধারণত কোরবানির গোশত দিয়েই ঈদের দিনের প্রথম খাবার শুরু করা হয়।
ঈদগাহে যাওয়া ও ফেরা: ঈদগাহে এক পথ দিয়ে যাওয়া এবং অন্য পথ দিয়ে ফেরা সুন্নত। (বোখারি, ৯৮৬)
সম্ভব হলে ঈদগাহে হেঁটে যাওয়াও সুন্নত। (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১০৭১)
তাকবির পাঠ করা: ঈদের দিন তাকবির পাঠের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালাকে বেশি বেশি স্মরণ করা সুন্নত। পুরুষরা এই তাকবির উঁচু আওয়াজে পাঠ করবে, মেয়েরা নিরবে। এই তাকবির জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর পাঠ করতে হয়। (ফাতহুল বারি, ২/৫৮৯)
ঈদের নামাজ আদায়: ঈদের নামাজ সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। সব নফল নামাজের মধ্যে এটি সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ। ঈদের নামাজের কোনো আজান ও ইকামত নেই। ঈদের আনন্দ এই নামাজের মাধ্যমেই পূর্ণতা পায়।
শুভেচ্ছা বিনিময়: ঈদের দিনে ছোট-বড় সবার সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা সুন্নত। সাহাবায়ে কেরামদের সম্ভাষণ ছিল ‘তাকাব্বাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’ (আল্লাহ তায়ালা আমাদের ও আপনার পক্ষ থেকে কবুল করুন)।
কোরবানি করা: ঈদুল আজহার দিনে সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। কোরবানির গোশত নিজে খাবে, নিজের পরিবারবর্গকে খাওয়াবে, আত্মীয়স্বজনকে হাদিয়া-তোহফা দেবে ও গরিব-মিসকিনকে দান করবে। মোস্তাহাব হলো, কোরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করা: ১. নিজ পরিবার-পরিজনের জন্য এক ভাগ। ২. আত্মীয়স্বজনের জন্য এক ভাগ। ৩. দরিদ্রদের জন্য এক ভাগ। তবে যদি পরিবারের লোকসংখ্যা বেশি হয়, তাহলে কোরবানির সব গোশত খেলেও অসুবিধা নেই। (শামি: ৫/২০৮)
পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা: ঈদুল আজহায় পশুর রক্ত, আবর্জনা ও হাড় থেকে যেন পরিবেশ দূষিত না হয়, সেদিকে প্রত্যেক মুসলমানের সতর্ক থাকা উচিত। কোরবানি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্ত, আবর্জনা ও হাড় নিরাপদ দূরত্বে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে দিতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ এই মূলনীতি মেনে পরিবেশ সুরক্ষিত রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
ঈদুল আজহার বর্জনীয়সমূহ
ঈদের দিনে রোজা রাখা: ঈদের দিনে রোজা রাখা হারাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। (বোখারি ও মুসলিম)
ঈদের দিনকে কবর জিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট করা: ঈদের দিনকে কবর জিয়ারতের বিশেষ দিন মনে করে জিয়ারত করা বিদয়াত। (ফিকহুস সুন্নাহ,১/৬৬৯)। তবে পূর্বনির্ধারিত রুটিন ছাড়া হঠাৎ সুযোগ হয়ে গেলে একাকী কেউ জিয়ারত করলে দোষণীয় নয়।
ঈদের নামাজ না পড়ে আনন্দ-ফুর্তি: অনেকে ঈদের আনন্দে মশগুল হয়ে নতুন জামা-কাপড় পরিধান, সেমাই, ফিরনি ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ঈদের নামাজ আদায় করার কথা ভুলে যায়। অথচ এই দিনে ঈদের নামাজ ও কোরবানি করাই হচ্ছে মুসলমানদের মূল কাজ।
মুসাফাহা-কোলাকুলি জরুরি মনে করা: ঈদগাহে বা ঈদের দিন সাক্ষাৎ হলে মুসাফাহা (হাতে হাত মেলানো) ও মুয়ানাকা (কোলাকুলি) করতেই হবে এমন বিশ্বাস ও আমল করা বিদয়াত। তবে এমন বিশ্বাস না করে সালাম ও মুসাফাহার পর মুয়ানাকাতে কোনো অসুবিধা নেই। কারণ মুসাফাহা ও মুয়ানাকা করার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি হয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘একদা হাসান ইবনে আলী (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এলেন, তিনি তখন তাকে জড়িয়ে ধরেন ও মুয়ানাকা করেন।’
কোরবানির কোনো কিছু বিক্রি করা: কোরবানির গোশত, চামড়া ও এর কোনো অংশ বিক্রি করা যাবে না। অর্থাৎ, বিক্রি করে নিজে উপকৃত হওয়া যাবে না। এমনকি কসাইকে পারিশ্রমিকস্বরূপ গোশত দেওয়াও নিষিদ্ধ। (বোখারি,১৭১৭; মুসলিম,১৩১৭)। তবে সাধারণভাবে তাকে খেতে দেওয়ায় কোনো অসুবিধা নেই।
ঈদুল আজহার এই পবিত্র দিনগুলো আমাদের জীবনে ত্যাগ, সংযম ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা নিয়ে আসে। উপরোক্ত করণীয়গুলো পালন এবং বর্জনীয় বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি এবং ঈদের প্রকৃত আনন্দ উপভোগ করতে পারি।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক