মুহাররম মাসের ১০ তারিখকে ‘আশুরা বা আশুরার দিন’ বলা হয়। আরবি ‘আশারা’ থেকে ‘আশুরা’ শব্দের উৎপত্তি। ‘আশারা’ অর্থ দশ। আর ‘আশুরা’ মানে দশম। ইসলামি পরিভাষায়, মুহাররম মাসের ১০ তারিখকে ‘আশুরা’ বলা হয়। এ মাসের এই দিনে পৃথিবীতে বহু ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে। এদিনে আল্লাহতায়ালা তাঁর কুদরত প্রকাশ করেছেন। বনি ইসরাইলের জন্য সমুদ্রে রাস্তা বের করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে নিরাপদে পার করে দিয়েছেন। আর একই রাস্তা দিয়ে ফেরাউন ও তার অনুসারীদের ডুবিয়ে মেরেছেন। (বুখারি, ১/৪৮১)
তবে এ দিনের গুরুত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে অনেক ভিত্তিহীন কথারও প্রচলন ঘটেছে। যেমন, এদিন হজরত ইউসুফ (আ.) জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন, হজরত ইয়াকুব (আ.) চোখের জ্যোতি ফিরে পেয়েছেন, হজরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছেন, হজরত ঈসাকে (আ.) আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়। অনেকে বলে থাকেন, এদিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে— এসব কথার কোনো ভিত্তি নেই। (আল আসারুল মারফুয়া, ৬৪/১০০)
এ দিনের একটি বিশেষ ঘটনা হলো ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত। হিজরি ৬১ সনের ১০ মুহাররম সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) এবং তার পরিবারের সদস্যরা কারবালার ময়দানে শহিদ হন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এ দিন রোজা রাখতেন। ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) হিজরত করে মদিনায় আসার পর দেখলেন ইহুদিরা এ দিনে রোজা রাখছে। এ দিনকে তারা বিশেষভাবে উদযাপন করছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, এ দিনে তোমরা কী জন্য রোজা রাখছ? তারা বলল, এটি একটি মর্যাদাপূর্ণ দিন। আল্লাহতায়ালা এ দিনে মুসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন এবং ফেরাউনকে তার দলবলসহ (দরিয়ায়) নিমজ্জিত করেছেন। মুসা (আ.) এ দিনে শুকরিয়া আদায়স্বরূপ রোজা রাখতেন। তাই আমরাও রোজা রাখি। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ কথা শুনে বললেন, মুসা (আ.)-এর অনুসরণের ক্ষেত্রে তো আমরা তোমাদের চেয়ে অধিক হকদার। এর পর রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও রোজা রাখলেন এবং অন্যদের রোজা রাখতে বললেন।’ (বুখারি, ১১২৫, ১৯০০, ৩৯৪৩; মুসলিম, ১১৩০)
মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)কে এ দিন সম্পর্কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘এ দিনটি হলো আশুরার দিন। আল্লাহতায়ালা এ দিনে রোজা ফরজ করেননি। তবে আমি এ দিনে রোজা রেখেছি। অতএব যারা রোজা রাখতে ইচ্ছুক, তারা যেন রোজা রাখে। আর যে না রাখতে চায়, নাও রাখতে পারে।’ (মুসলিম, ১১২৯) আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আশুরার রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহতায়ালার কাছে প্রত্যাশা করি— তিনি এর বিনিময়ে পূর্ববর্তী এক বছরের যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (মুসলিম, ১১৬২; তিরমিজি, ৭৫২; আবু দাউদ,২৪২৫)
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘(জাহেলি সমাজে) লোকেরা রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার দিন রোজা রাখত এবং এ দিনে কাবায় গেলাফ জড়ানো হতো। এর পর যখন রমজানের রোজা ফরজ হলো তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘যে এ দিন রোজা রাখতে চায়, সে রাখুক। যে না চায়, সে না রাখুক।’ (বুখারি, ১৫৯২)
বিশেষ সতর্কতা : ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখো এবং তাতে ইহুদিদের বিরুদ্ধাচরণ করো। আশুরার আগে এক দিন বা পরে এক দিন রোজা রাখো।’ (মুসনাদে আহমাদ : হাদিস নং-২১৫৪) আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন আশুরার দিনে রোজা রাখেন এবং অন্যদের রাখার নির্দেশ দেন, তখন সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! ইহুদিরা ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ও (রোজা রেখে) এ দিনকে সম্মান করে। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ইনশাআল্লাহ আগামী বছর আমরা নবম তারিখও রোজা রাখব। বর্ণনাকারী বলেন, তা আর হয়ে ওঠেনি। কারণ পরবর্তী বছরের এ দিন আসার আগেই রাসুলুল্লাহ (সা.) ইন্তেকাল করেন।’ (মুসলিম, ১১৩৪; আবু দাউদ, ২৪৪৫)
লেখক : আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক