ইসলাম যে কয়েকটি বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছে, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা সেগুলোর অন্যতম। মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে, এমন সব কাজকে ইসলামে অবৈধ ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশান্তচিত্তে মানুষ জীবন কাটাবে, যাপিত জীবনে নির্বিঘ্নে আপন রবের ইবাদত করে যাবে—এমনটাই ইসলামের শিক্ষা। সে ধারাবাহিকতায় ইসলাম সব ধরনের অন্যায় হত্যাকাণ্ডকে সর্বোচ্চ অপরাধগুলোর অন্যতম সাব্যস্ত করেছে। মানবহত্যার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কোরআন মাজিদে এবং হাদিস শরিফে মানবহত্যার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি ও ভয়াবহ ধমকিবাণীর নির্দেশনা রয়েছে।
মানুষ সম্মানিত প্রাণী: কোরআন মাজীদের ভাষায় মানবজাতি মর্যাদাশীল প্রাণী। আল্লাহ মানবজাতিকে সম্মানিত করেছেন। উত্তম রিজিক দিয়েছেন। অন্যান্য সৃষ্টির মাঝে দিয়েছেন শ্রেষ্ঠত্ব। ইরশাদ হয়েছে, বাস্তবিকপক্ষে আমি আদম সন্তানকে মর্যাদাদান করেছি এবং স্থলে ও জলে তাদের জন্য বাহনের ব্যবস্থা করেছি, তাদেরকে উত্তম রিজিক দান করেছি এবং আমার বহু মাখলুকের ওপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। (সুরা বনি ইসরাঈল, ৭০)
ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড অকল্পনীয়: একজন মুমিন আরেকজন মুমিনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করবে, এটা কল্পনাও করা যায় না। হ্যাঁ, কখনো ভুলক্রমে হয়ে গেলে সেটা ভিন্ন কথা। সে ক্ষেত্রে জরিমানা বা শাস্তির যথার্থ নির্দেশনা রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, এটা কোনো মুসলিমের কাজ হতে পারে না যে, সে (ইচ্ছাকৃত) কোনো মুসলিমকে হত্যা করবে। ভুলবশত এমনটা হয়ে গেলে সেটা ভিন্ন কথা। (সুরা নিসা, ৯২)
অন্যায় হত্যাকাণ্ড হারাম ও কুফরতুল্য: অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা অত্যন্ত ভয়াবহ গুনাহগুলোর অন্যতম। কোরআন মাজীদে স্পষ্ট ভাষায় অন্যায় হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে- আল্লাহ যেই প্রাণকে মর্যাদাদান করেছেন তাকে হত্যা করো না, তবে (শরিয়ত অনুযায়ী) তোমরা তার অধিকার লাভ করলে ভিন্ন কথা। যাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়, আমি তার অলিকে (কিসাস গ্রহণের) অধিকার দিয়েছি। সুতরাং সে যেন হত্যাকার্যে সীমা লঙ্ঘন না করে। নিশ্চয়ই সে এর উপযুক্ত যে, তার সাহায্য করা হবে। ( সুরা বনি ইসরাঈল, ৩৩)
সুরাতুল ফুরকানে শিরকের মতো ভয়াবহ গুনাহের উল্লেখের পরপরই অন্যায় হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এখান থেকে প্রতীয়মান হয়, অন্যায় হত্যাকাণ্ড কুফর-শিরকের কাছাকাছি ভয়াবহ কবিরা গুনাহ। ইরশাদ হয়েছে এবং যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো মাবুদের ইবাদত করে না এবং আল্লাহ যে প্রাণকে মর্যাদাদান করেছেন, তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে না এবং তারা ব্যভিচার করে না। যে ব্যক্তিই এরূপ করবে, তাকে তার গুনাহের (শাস্তির) সম্মুখীন হতে হবে। (সুরা ফুরকান, ৬৮)
ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ পরিণতি: ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। চিরস্থায়ী শাস্তির হুশিয়ারি রয়েছে এ ক্ষেত্রে। রয়েছে আল্লাহর গজব ও লানতের ধমকিবাণী। ইরশাদ হয়েছে- যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমকে জেনেশুনে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম, যাতে সে সর্বদা থাকবে এবং আল্লাহ তার প্রতি গজব নাজিল করবেন ও তাকে লানত করবেন। আর আল্লাহ তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন। (সুরা নিসা, ৯৩)
যেন পুরো মানবজাতিকে হত্যা করল: ইসলামে জীবনের নিরাপত্তার ব্যাপারে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কোনো একজন ব্যক্তির জীবন বিপন্ন হলে, তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে যেন পুরো মানবজাতিকে হত্যা করা হলো। কোরআন মাজিদে স্পষ্ট ভাষায় এ হুশিয়ারি প্রদান করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে- ‘আমি বনি ইসরাঈলের প্রতি বিধান দিয়েছিলাম, কেউ যদি কাউকে হত্যা করে এবং তা অন্য কাউকে হত্যা করার কারণে কিংবা পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তারের কারণে না হয়, তবে সে যেন সমস্ত মানুষকে হত্যা করল। আর যে ব্যক্তি কারও প্রাণ রক্ষা করে, সে যেন সমস্ত মানুষের প্রাণ রক্ষা করল। বস্তুত আমার রাসুলগণ তাদের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলি নিয়ে এসেছে, কিন্তু তার পরও তাদের মধ্যে বহু লোক পৃথিবীতে সীমা লঙ্ঘনই করে যেতে থাকে। (সুরা মায়িদা, ৩২)
ভয়াবহ কবিরা গুনাহগুলোর অন্যতম: অন্যায় হত্যাকাণ্ড ভয়াবহ কবিরা গুনাহগুলোর অন্যতম। নবিজি (সা.) কবিরা গুনাহের বিবরণ দিতে গিয়ে শিরক পরপরই অন্যায় হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি উল্লেখ করে উম্মতকে সতর্ক করেছেন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি (সা.) বলেছেন, কবিরা গুনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় গুনাহ্ হচ্ছে আল্লাহ্র সঙ্গে শরিক করা, প্রাণ হত্যা করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া আর মিথ্যা বলা, কিংবা বলেছেন, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া। (বুখারি, ৬৮৭১)
তওবার সুযোগকে শেষ করে দেয়: প্রতিটি গুনাহের ব্যাপারে দয়াময় আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা পাওয়ার আশা থাকলেও অন্যায় হত্যাকাণ্ডের মতো গুনাহ তওবার সুযোগ শেষ করে দেয়। শিরকের মতো অন্যায় হত্যাকাণ্ডও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। আবু দারদা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ সব গুনাহই ক্ষমা করবেন; কিন্তু মুশরিক অবস্থায় কেউ মারা গেলে অথবা কোনো ঈমানদার ব্যক্তি অপর কোনো ঈমানদারকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করলে (তা ক্ষমা করবেন না। (আবু দাউদ, ৪৭২০)
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া গাফুরিয়া মাখযানুল উলুম, টঙ্গী