ড. মাওলানা শহীদুল ইসলাম ফারুকী—পড়াশোনা করেছেন দেশ-বিদেশের স্বনামধন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে অধ্যাপনা করেছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমানে তিনি মাকাসিদ ইনস্টিটিউটের পরিচালক এবং দারুল হাবিব মাদরাসার শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাইয়েদ মুহাম্মদ রাবে হাসানী নদভী (রহ.)-এর সুযোগ্য খলিফাও তিনি। তার রচিত বইয়ের সংখ্যা ২৫। মাকাসিদুশ শরিয়াহর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেছেন খবরের কাগজের সঙ্গে।
মাকাসিদুশ শরিয়াহ বলতে কী বুঝায়?
ড. ফারুকী: মাকাসিদুশ শরিয়াহ ইসলামি আইন দর্শনের একটি মৌলিক শাখা, যার অর্থ ইসলামি শরিয়াহর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ইসলামি শরিয়াহ শুধু কিছু আদেশ-নিষেধের সমষ্টি নয়, বরং এর প্রতিটি বিধানের পেছনে মানবজাতির কল্যাণ নিশ্চিত ও অকল্যাণ দূর করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। মাকাসিদুশ শরিয়াহ এই লক্ষ্যগুলো চিহ্নিত ও বিশ্লেষণ করে। ঐতিহাসিকভাবে ইসলামি পণ্ডিতগণ পাঁচটি মৌলিক উদ্দেশ্য চিহ্নিত করেছেন সেগুলো হলো—মানুষের দ্বীন, জীবন, বিবেক-বুদ্ধি, বংশধারা এবং সম্পদ সংরক্ষণ করা, যা ‘আল-কুল্লিয়্যাতুল খামসাহ’ বা পাঁচটি মৌলিক উদ্দেশ্য নামে পরিচিত। মাকাসিদুশ শরিয়াহ গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে, এটি কেবল বাহ্যিক বিধান পালনের চেয়েও গভীরে গিয়ে ইসলামি আইনের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ও প্রজ্ঞা বুঝতে সাহায্য করে। কোনো আইনের পেছনের কারণ জানলে তা মানা সহজ হয় এবং তার প্রতি বিশ্বাস দৃঢ় হয়। শরিয়াহর প্রতিটি বিধানই মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করে এবং ক্ষতি দূর করে। আধুনিক যুগে নতুন নতুন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ দেখা দিচ্ছে, যা কোরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট কোনো বিধানে সরাসরি পাওয়া যায় না। মাকাসিদুশ শরিয়াহ এই ধরনের পরিস্থিতিতে ইসলামি আইনের মূল উদ্দেশ্যগুলোকে সামনে রেখে ফতোয়া দেওয়া এবং সমাধান বের করার পথ দেখায়। কিছু মানুষ ইসলামি আইনকে শুধু কঠোর নিয়মকানুন বা রীতিনীতি হিসেবে দেখে। মাকাসিদুশ শরিয়াহ এই ভুল ধারণা দূর করে এবং প্রমাণ করে যে, ইসলামি আইন মানুষের জন্য কল্যাণকর ও যুক্তিপূর্ণ।
সাধারণ মুসলমান কীভাবে তাদের জীবনযাপনে এর মূলনীতি বাস্তবায়ন করতে পারে?
ড. ফারুকী: সাধারণ মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনে মাকাসিদুশ শরিয়াহর মূলনীতি বাস্তবায়ন করা আসলে খুব কঠিন কিছু নয়, বরং এটি আমাদের জীবনকে আরও অর্থপূর্ণ এবং উদ্দেশ্যপূর্ণ করে তুলতে পারে। এর জন্য বিশেষজ্ঞ আলেম হওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং কিছু মৌলিক বিষয় সম্পর্কে সচেতনতাই যথেষ্ট। একজন সাধারণ মুসলমান তার জীবনযাপনে মাকাসিদুশ শরিয়াহর মূলনীতিগুলো (বিশেষ করে পাঁচটি মৌলিক উদ্দেশ্য : দ্বীন, জীবন, বিবেক-বুদ্ধি, বংশধারা ও সম্পদ সংরক্ষণ) বাস্তবায়ন করতে পারে। ঈমান-আকিদার হেফাজত, ইবাদতের প্রতি মনোযোগ, মৌলিক দ্বীনি ইলম শিক্ষা করা, আত্মশুদ্ধি অর্জন, ইসলামি মূল্যবোধ ও আখলাকের চর্চা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আত্মহত্যার প্রবণতা পরিহার করা, অপরকে হত্যা ও খুন-খারাবি হতে বিরত থাকা, মাদক, নেশা, অশ্লীলতা ও বাতিল চিন্তাধারা পরিহার, জিনা-ব্যভিচার থেকে দূরে থাকা, বৈবাহিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া, পর্দা পালন, সন্তানদের সঠিক প্রতিপালন এবং পরিবার ও আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় রাখা, হারাম বর্জন, হালালভাবে উপার্জন, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ ও কুক্ষিগত না করা, সম্পদ অপচয় না করা, বরং সম্পদকে জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা, গরিব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়ানো এবং জাকাত আদায় করা ইত্যাদি মৌলিক বিষয় দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজে স্মরণে রাখলেই একজন সাধারণ মুসলমান মাকাসিদুশ শরিয়াহর মূলনীতিগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে।
পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রপর্যায়ে মাকাসিদুশ শরিয়াহ কীভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে?
ড. ফারুকী: মাকাসিদুশ শরিয়াহর মূলনীতিগুলো শুধু ব্যক্তিগত জীবনেই নয়, বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত এর প্রয়োগ সম্ভব এবং এটি একটি কল্যাণমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য। মাকাসিদুশ শরিয়াহর প্রয়োগ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ নিশ্চিত করে। পরিবারিক পর্যায়ে মাকাসিদুশ শরিয়াহর মূল উদ্দেশ্য হলো বংশধারার সুরক্ষা। এর জন্য বিবাহের মাধ্যমে পরিবার গঠনে উৎসাহিত করা, ব্যভিচার ও অবৈধ সম্পর্ক প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, পরিবার প্রথার সুরক্ষা, ইসলামি পরিবার প্রথার গুরুত্ব তুলে ধরা, রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা ও পারিবারিক বন্ধনকে মজবুত করা। সামাজিক পর্যায়ে মাকাসিদুশ শরিয়াহর মূল উদ্দেশ্য হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এর জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধের কাজ করা, সমাজে প্রচলিত শিরক, বিদআত, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস দূর করা, সুদ, ঘুষ, মজুতদারি ও কালোবাজারিমুক্ত একটি ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, মাদকতা ও অশ্লীলতা কার্যকরভাবে নিষিদ্ধ করা, জাকাত ও সাদাকার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মাকাসিদুশ শরিয়াহর মূল উদ্দেশ্য হলো সুশাসন, জনকল্যাণ ও নাগরিকদের অধিকার সংরক্ষণ করা। এতে আইনের শাসন, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অন্তর্ভুক্ত।
শিক্ষা সিলেবাসে মাকাসিদুশ শরিয়াহ কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়?
ড. ফারুকী: দ্বীনি শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে সহজ ভাষায় মাকাসিদুশ শরিয়াহর ধারণা এবং এর পাঁচটি মৌলিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। গল্পের মাধ্যমে বা বাস্তব উদাহরণ দিয়ে এই উদ্দেশ্যগুলোর গুরুত্ব বোঝানো। ছোট ছোট কেস স্টাডি করে দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ ঘটনাগুলোর মাধ্যমে কীভাবে মাকাসিদ প্রয়োগ হয় তা দেখানো, যেমন কেন স্বাস্থ্যবিধি মানতে হয় (নফস সংরক্ষণ), কেন পড়ালেখা জরুরি (আকল সংরক্ষণ), কেন মিথ্যা বলা নিষেধ (দ্বীন ও আকল সংরক্ষণ); মাধ্যমিক স্তরে উসুলুল ফিকহের অংশ হিসেবে মাকাসিদুশ শরিয়াহর একটি পূর্ণাঙ্গ অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। ফিকহি মাসয়ালা আলোচনার সময় এর পেছনে নিহিত মাকাসিদ বা উদ্দেশ্যগুলো তুলে ধরা। যেমন—কেন জাকাত ফরজ (মাল ও দ্বীন সংরক্ষণ, সামাজিক ন্যায়বিচার), কেন বিবাহ জরুরি (নছল ও দ্বীন সংরক্ষণ) ইত্যাদি; উচ্চতর স্তরে স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে মাকাসিদুশ শরিয়াহর ওপর স্বতন্ত্র ও আলাদা কোর্স চালু করা। এ জন্য প্রয়োজন হবে শিক্ষক প্রশিক্ষণ। শিক্ষকদের মাকাসিদুশ শরিয়াহ সম্পর্কে সঠিক ও গভীর জ্ঞান প্রদান করা, যাতে তারা শিক্ষার্থীদের কাছে তা সঠিক ও সহজভাবে উপস্থাপন করতে পারেন।