একজন ব্যক্তি দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রেখে মৃত্যুবরণ করলে, স্বাভাবিকভাবেই সেই সম্পত্তি তার উত্তরাধিকারদের মাঝে বণ্টিত হওয়ার কথা। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, দোকানটির পরিচালনার দায়িত্ব কেউ একজন (ওয়ারিশ কিংবা তৃতীয় কোনো ব্যক্তি) নিজ উদ্যোগে ব্যবসা চালিয়ে যান। এ অবস্থায় প্রশ্ন ওঠে: এই ব্যবসা থেকে যে মুনাফা অর্জিত হলো, সেটি কার অধিকার? ব্যবসা পরিচালনাকারীর, না ওয়ারিশদের?
ইসলামি ফিকহের অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ ফকিহগণের মতে, মৃত ব্যক্তির ব্যবসায় ব্যবস্থাপক যেহেতু ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া তাদের সম্পদ ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা করেছেন, তাই এর মাধ্যমে অর্জিত লাভ বৈধ নয়। ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, এ ধরনের লাভকে অবৈধ (হারাম) আয় হিসেবে গণ্য করা হয়।
এক্ষেত্রে মূল সম্পদ (পুঁজি) মালিকদের ফিরিয়ে দিতে হবে এবং লাভের অর্থ গরিব-মিসকিনদের মাঝে সদকা (দান) করে দিতে হবে। কারণ মালিকদের অনুমতি ছাড়া উপার্জন করা লাভ তাদের হক নয়।
অপরদিকে, ইমাম বুখারি (রহ.) ও কয়েকজন ইমাম ভিন্নতর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তারা বলেন, যেহেতু মৃত ব্যক্তির সম্পদ উত্তরাধিকারসূত্রে ওয়ারিশদের হয়ে গেছে, তাই ব্যবসা থেকে যে মুনাফা অর্জিত হয়েছে, তা আসলে ওয়ারিশদেরই প্রাপ্য।
এ মতের পক্ষে ইমাম বুখারি একটি প্রামাণিক হাদিস উপস্থাপন করেন। হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি তার এক শ্রমিকের পারিশ্রমিকের অর্থ দিয়ে ব্যবসা করেন। পরে শ্রমিক ফিরে এলে, মালিক তাকে লাভসহ তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেন। (সহিহ বুখারি: ২২১৫) এ থেকে ইমাম বুখারির মত হচ্ছে, অন্যের সম্পদ বিনা অনুমতিতে ব্যবসায়ে ব্যবহার করে যে লাভ হয়, তার প্রকৃত মালিক মূল সম্পদের মালিকই।
তবে অধিকাংশ আলেম বলেন, উক্ত হাদিসটি ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে লাভ ফিরিয়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতার প্রমাণ দেয় না। বরং এখানে মূল উদ্দেশ্য ছিল, মালিকের দান ও অনুগ্রহ প্রদর্শন। কারণ, যদি লাভ ফিরিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক হতো, তবে সেটি নেক আমলের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতো না। যেহেতু হাদিসে ব্যক্তি তার এই কাজকে নেক আমল হিসেবে আল্লাহর কাছে পেশ করেছেন, বোঝা যায় এটি ছিল অনুগ্রহ, দায়িত্ব নয়।
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া অন্যের সম্পদ দিয়ে ব্যবসা করলে তা থেকে অর্জিত আয় বৈধ নয়। অতএব, মূল সম্পদ মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া হবে এবং লাভের অর্থ সদকা করতে হবে। এটাই তাদের মৌলিক অবস্থান। তবে পরবর্তী হানাফি ফকিহদের মধ্যে অনেকেই এ বিষয়ে কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছেন। তাদের মতে, যেহেতু লাভ অবৈধ হওয়ার একমাত্র কারণ অনুমতি না থাকা, তাই যদি সেই লাভ ওয়ারিশদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তা হলে সেটিও বৈধ হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ আলেম এ মতকেই বাস্তবসম্মত ও উত্তম বলে গণ্য করেন। কারণ এতে মূল সম্পদের মালিকরাই উপকৃত হন এবং সম্পদের প্রকৃত মালিকদের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।
বর্তমান সমাজে মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া ব্যবসা পরিচালনা ও মুনাফা বণ্টন একটি বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। শরিয়াহর আলোকে বিচার করলে স্পষ্ট হয়, অনুমতি ছাড়া ওয়ারিশদের সম্পদ দিয়ে ব্যবসা করা ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে যদি সেই মুনাফা তাদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়, তা হলে তা বৈধ বলে বিবেচিত হবে।
অতএব, উত্তম হবে ব্যবসা পরিচালনার আগে ওয়ারিশদের সম্মতি নেওয়া এবং পরে অর্জিত মুনাফা যৌথভাবে ন্যায়সঙ্গতভাবে বণ্টন করা। এটাই ইসলামি শরিয়াহর ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সৌন্দর্য।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক