আমাদের সমাজে অনেক সময়ই দেখা যায়, কোনো পদে থাকা ব্যক্তিকে 'উপহার' বা 'হাদিয়া' হিসেবে অর্থ বা জিনিসপত্র দেওয়া হয়। বিশেষ করে বিচারক এবং অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। কিন্তু ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে, এ ধরনের 'উপহার' প্রকৃতপক্ষে ঘুষের শামিল, যা সম্পূর্ণরূপে হারাম। হাদিয়ার আড়ালে ঘুষ দেওয়া হলে তা কখনোই হালাল হয়ে যায় না।
রাসুল (সা.)-এর সাবধান বাণী ইসলামে ঘুষকে অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হাদিসের মাধ্যমে রাসুল (সা.) এ বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা দিয়েছেন। হযরত বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, কাউকে আমরা কোনো পদে নিযুক্ত করে তার জন্য নির্ধারিত সম্মানীর ব্যবস্থা করলাম। এর পর সে অতিরিক্ত যা কিছু নেবে তা চুরি বা আত্মসাৎ হিসেবে গণ্য হবে। এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, কোনো সরকারি পদে থাকা ব্যক্তির জন্য নির্ধারিত বেতন-ভাতার বাইরে কোনো কিছু গ্রহণ করা জায়েজ নয়।
একবার ইবনুল লুতবিয়া নামে একজন সাহাবিকে রাসুল (সা.) জাকাত আদায়কারী হিসেবে নিয়োগ করেন। কাজ শেষে ফিরে এলে তিনি হিসাব দিতে গিয়ে কিছু অংশকে 'হাদিয়া' বলে উল্লেখ করেন। তখন রাসুল (সা.) কঠোর ভাষায় বলেন, তুমি যদি সত্যবাদী হয়ে থাকো, তা হলে তুমি তোমার মা-বাবার ঘরে বসে থাকলে না কেন? যাতে সেখানেই তোমার কাছে তোমার হাদিয়া পৌঁছে যেত। রাসুল (সা.) আরও বলেন, আল্লাহর শপথ! যদি তোমাদের কেউ অন্যায়ভাবে কোনো কিছু গ্রহণ করে, তবে সে কিয়ামতের দিন তা বহনরত অবস্থায় আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, কোনো দায়িত্বের কারণে পাওয়া কোনো উপহার সরাসরি ঘুষ।
খলিফা উমার (রা.)-এর দৃষ্টান্ত খলিফা উমার ইবনু আব্দুল আযিয (রা.)-এর জীবন ছিল সততার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একবার তিনি একটি হাদিয়া গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, কেন তিনি হাদিয়া নিলেন না, যখন রাসুল (সা.) হাদিয়া গ্রহণ করতেন। তিনি উত্তরে বলেন, সেটা তাঁর জন্য হাদিয়া ছিল, আর এটা আমাদের জন্য ঘুষ। এই ঘটনাটি থেকে এটি স্পষ্ট যে, সাধারণ মানুষের দেওয়া হাদিয়া এবং কোনো সরকারি পদে থাকার কারণে পাওয়া হাদিয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
ইমাম গাযালীর (র.) নির্দেশনা: প্রখ্যাত ইসলামিক চিন্তাবিদ ইমাম গাযালি (র.) এ বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, বিচারক ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের চিন্তা করা উচিত, হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে যারা তাকে হাদিয়া দিত, তার জন্য তাদের হাদিয়া নেওয়া বৈধ। আর যেগুলোর ব্যাপারে বোঝা যায়— এসব হাদিয়া তার পদের জন্য এসেছে, সেগুলো নেওয়া তার জন্য হারাম। বিচারক ও দায়িত্বশীলদের জন্য তাদের বন্ধু-বান্ধবের হাদিয়া গ্রহণ করাও ঠিক নয়। এই কথাগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, কোনো দায়িত্বে থাকা অবস্থায় প্রাপ্ত উপহারের পেছনে সাধারণত একটি গোপন উদ্দেশ্য থাকে, আর তাই তা বৈধ নয়।
বিচারক বা অন্য কোনো সরকারি পদে থাকা ব্যক্তির জন্য জনগণের দেওয়া উপহার বা হাদিয়া মূলত একটি অনৈতিক প্রলোভন। এটি ন্যায়বিচারকে প্রভাবিত করতে পারে এবং সমাজে দুর্নীতির পথ খুলে দেয়। ইসলামি শরিয়াহ এই ধরনের কার্যকলাপকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। সুতরাং জনগণের পক্ষ থেকে 'উপহার' হিসেবে আসা যেকোনো কিছু বিচারক এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের প্রত্যাখ্যান করা উচিত। এতে শুধু তাদের সততাই প্রমাণিত হবে না, বরং সমাজে ন্যায় ও সততার মানদণ্ডও প্রতিষ্ঠিত হবে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক