আধুনিক যুগে সংসারের কাজকে অনেক সময় অবহেলার চোখে দেখা হয়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে সংসারের কাজ শুধু একটি দায়িত্ব নয়, এটি ভালোবাসা, আনুগত্য এবং ইবাদতের অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রীগণ এবং তার কন্যা হযরত ফাতেমা (রা.)-এর জীবন থেকে আমরা এর জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত পাই।
হযরত ফাতেমা (রা.)-এর দৃষ্টান্ত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদরের কন্যা হযরত ফাতেমা (রা.) নিজের হাতে সংসারের সব কাজ করতেন। তিনি এতটাই পরিশ্রম করতেন যে, যাঁতা (চাক্কি) ঘোরাতে ঘোরাতে তার হাতে ফোস্কা পড়ে গিয়েছিল। ইমাম বুখারি (র.) তার কিতাবে এই ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন। মুহাদ্দিসগণ এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে বলেন, মুসলিম মহিলাদের উচিত নিজেদের ঘরের কাজ নিজ হাতে করা। হযরত ফাতেমা (রা.) যাঁতা চালাতেন, আটা মাখতেন এবং রুটি বানাতেন। তার এই জীবন আমাদের জন্য এক মহান আদর্শ।
ইমাম মালেক (র.)-এর নির্দেশনা প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম মালেক (র.) বলেন, ‘স্বামী যদি দরিদ্র হয়, তা হলে সংসারের কাজ স্ত্রীর জন্য অপরিহার্য হয়ে যায়, স্ত্রী যতই ধনীর দুলালি হোক না কেন।’ এই উক্তিটি প্রমাণ করে যে, সংসারের কাজ করা শুধু একটি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত বিষয় নয়, বরং প্রয়োজনে তা স্ত্রীর জন্য একটি অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব। এটি স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সহযোগিতার এক দারুণ উদাহরণ।
হযরত হেলাল ইবনু উমাইয়া (রা.)-এর স্ত্রীর আনুগত্য তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার কারণে যে তিনজন সাহাবিকে বয়কট করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হযরত হেলাল ইবনু উমাইয়া (রা.)। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন তাদের স্ত্রী-সংশ্রব বর্জন করার নির্দেশ দিলেন, তখন হযরত হেলাল (রা.)-এর স্ত্রী রাসুল (সা.)-এর কাছে গিয়ে স্বামীর সেবা করার অনুমতি চান। তিনি বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার স্বামী বৃদ্ধ মানুষ। তার সেবা-যত্ন করার মতো কেউ নেই।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন তাকে স্বামীর সেবা করার অনুমতি দেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, স্ত্রীর জন্য স্বামীর সেবা করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
হযরত জুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.)-এর স্ত্রীর পরিশ্রম হাফেজ ইবনুল কাইয়্যিম জাওজি (র.)-এর বর্ণনা থেকে জানা যায়, হযরত জুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.)-এর স্ত্রী ঘর-সংসার গুছিয়ে রাখতে এবং স্বামীর খেদমত করতে এতটা পরিশ্রম করতেন যে, প্রায়শই ক্লান্ত হয়ে পড়তেন। এই ক্লান্তি তার জন্য কোনো বোঝা ছিল না, বরং স্বামীর প্রতি তার ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধেরই প্রতিফলন ছিল।
সংসারের কাজ করা কোনো ছোট কাজ নয়, বরং এটি ইবাদতের একটি অংশ। সাহাবি নারীদের জীবন থেকে আমরা শিখতে পারি যে, ভালোবাসা, আনুগত্য এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই একটি সুখী ও সমৃদ্ধ পরিবার গড়ে ওঠে। একজন মুসলিম নারীর জন্য নিজের ঘরকে ভালোবাসার ছোঁয়ায় সাজিয়ে তোলা এবং স্বামীর সেবা করা—এই দুটি কাজই ইবাদতের মর্যাদা লাভ করে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক