আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো সত্তাকে কোনো ক্ষেত্রে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করাকে শিরক বলে। শিরকের প্রকার: শিরক প্রধানত দুই প্রকার। (১) শিরকে আকবর বা বড় শিরক। (২) শিরকে আসগর বা ছোট শিরক। বড় শিরক হলো আল্লাহতায়ালার সঙ্গে প্রকাশ্যে কাউকে অংশীদার করা, যা ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় এবং তওবা ছাড়া আল্লাহ ক্ষমা করেন না। বরং এটি ব্যক্তির সমস্ত নেক আমলকে নষ্ট করে দেয় এবং খালেছ তওবা ব্যতীত মারা গেলে জাহান্নামের চিরস্থায়ী শাস্তি ভোগ করতে হবে। ছোট শিরক হলো এমন কোনো কাজ বা বিশ্বাস, যা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করার সমতুল্য নয়, তবে তা আল্লাহর সঙ্গে কারও অংশীদারত্বের দিকে নিয়ে যায়।
শিরকের উৎপত্তি: ইমাম বাগভীর বর্ণনা মতে, পৃথিবীতে শিরকের সূচনা হয়েছিল হজরত আদম (আ.) ও হজরত নূহ (আ.)- এর আমলের মাঝামাঝি সময়ে। সে সময়ে দুনিয়াতে আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত পাঁচজন বিশেষ নেককার বান্দা ছিলেন। যাদের নাম কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে ওয়াদ, সুয়া, ইয়াগুছ, ইয়াউক ও নসর। তাঁদের অনেক নেক ভক্ত ও অনুসারী ছিল। তাঁদের ইন্তেকালের পর ভক্তরা সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আল্লাহর ইবাদত পালন করতে লাগল। কিছুদিন পর শয়তান তাদের এই বলে প্ররোচিত করল যে, তোমরা যেসব মহাপুরুষের অনুসরণ করে উপাসনা করো, যদি তাদের মূর্তি তৈরি করে সামনে রেখে দাও, তবে তোমাদের উপাসনা পূর্ণতা লাভ করবে এবং বিনয় ও একাগ্রতা অর্জিত হবে।
তারা শয়তানের ধোঁকা বুঝতে না পেরে সেইসব মহাপুরুষের প্রতিকৃতি তৈরি করে উপাসনালয় স্থাপন করল এবং তাদের স্মৃতি জাগরিত করে ইবাদতে বিশেষ পুলক অনুভব করতে লাগল। এমতাবস্থায় তাদের সবাই একে একে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে গেল এবং সম্পূর্ণ নতুন এক বংশধর তাদের স্থলাভিষিক্ত হলো। এবার শয়তান এসে তাদের বুঝাল, তোমাদের পূর্বপুরুষদের খোদা ও উপাস্য মূর্তিই ছিল। তারা এই মূর্তিগুলোরই উপাসনা করত। তখন সবাই তার কথা বিশ্বাস করল এবং এখান থেকেই পৃথিবীতে শিরক ও প্রতিমা পূজার সূচনা হয়ে গেল। (তাফসীরে মা’আরিফুল কোরআন, সুরা নূহ, ২৩)।
শিরক ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ: কারণ, এটি আল্লাহর একক সত্তার সঙ্গে অন্যকে অংশীদার করা এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বকে অস্বীকার করা হয়। শিরক আল্লাহর নিকট সবচাইতে বড় নাফরমানি। কোরআনে এটাকে মহাঅপরাধ ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা সতর্ক করে ইরশাদ করেছেন, ‘হে রাসুল! আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি এই মর্মে ওহি নাজিল করা হয়েছে যে, যদি আপনি শিরক করেন, তা হলে অবশ্যই আপনার সব আমল বাতিল হয়ে যাবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন’ (সুরা যুমার, ৬৫)।
অন্যত্র ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শিরক করাকে ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া সবকিছু যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং কেউ আল্লাহর সঙ্গে শরিক করলে সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়।’ (সুরা নিসা, ১১৬)। সুরা মায়েদায় বলেছেন, ‘কেউ আল্লাহর সঙ্গে শিরক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করবেন এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম। সেখানে জালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই’ (আয়াত ৭২)। আর রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যদি তোমাকে হত্যা করা হয় এবং জ্বালিয়েও দেয়, তার পরও আল্লাহর সঙ্গে তুমি কাউকে শরিক করবে না।’ (মিশকাত, হাদিস ৬১)।
শিরকের নমুনা: (১) আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ইবাদতের যোগ্য মনে করা। (২) আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ওপর ভরসা করা। (৩) মাখলুকাতের কসম খাওয়া। (৪) মৃত ব্যক্তির কাছে সাহায্য চাওয়া। (৫) গায়রুল্লাহর নামে জবাই করা। (৬) কোনো বুজুর্গের নামে মান্নত করা। (৭) জাদুকরের কথা বিশ্বাস করা ইত্যাদি।
শিরক থেকে বাঁচার দোয়া: নবিজি (সা.) শিরক থেকে বাঁচার জন্যে প্রতিদিন এই দোয়া তিনবার পড়তে বলেছেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা আন উশরিকা বিকা ওআনা আ’লাম ওয়া আস্তাগফিরুকা লিমা লা আ’লাম।’ অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমার জানা অবস্থায় আপনার সঙ্গে শিরক করা হতে আপনারই কাছে আশ্রয় চাই। আর অজানা অবস্থায়ও আপনার সঙ্গে শিরক করা থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করছি ‘(আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৭২১)।
লেখক: খতিব ও মাদরাসা শিক্ষক