ইসলামি অর্থনীতিতে ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং বাজারের স্বাভাবিক গতিশীলতা কাম্য। কিন্তু যখন ব্যক্তিগত মুনাফার লোভ জনস্বার্থকে গ্রাস করে, তখন সেই স্বাধীনতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। মজুতদারি (Hoarding) এমন একটি জঘন্য অর্থনৈতিক অপরাধ, যা মানুষের মৌলিক প্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলে এবং কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করার অপচেষ্টা চালায়। এই নিকৃষ্ট মানসিকতার কারণেই ইসলামে মজুতদারদের ওপর এসেছে কঠিনতম অভিসম্পাত (লানত)।
মজুতদারি হলো সেই অমানবিক কাজ, যেখানে কোনো ব্যক্তি সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ খাদ্য ও মৌলিক প্রয়োজনীয় সম্পদ গুদামজাত করে রাখে শুধু বাজারমূল্য বাড়লে বিপুল লাভে তা বিক্রির উদ্দেশ্যে। এর ফলে সমাজে কৃত্রিম সংকট ও মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়, আর দরিদ্র মানুষ চরম দুর্দশার শিকার হয়।
৪০ দিনের বেশি খাদ্যপণ্য গুদামজাত করে রাখা একটি গুরুতর অপরাধ। ইবনু উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ৪০ দিন পর্যন্ত খাদ্যপণ্য গুদামজাত করে রাখল, সে আল্লাহ থেকে সম্পর্কহীন হয়ে গেল এবং আল্লাহও তার থেকে সম্পর্কহীন হয়ে গেলেন।’ (মুসনাদে আহমাদ)
আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাওয়া একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় ক্ষতির বার্তা আর হতে পারে না। এই হাদিস মজুতদারিকে নিছক অর্থনৈতিক ভুল নয়, বরং ঈমান ও আকিদার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত একটি বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছে।
নবিজি (সা.) মজুতদারদের শুধু নিন্দাই করেননি, তাদের চরিত্র ও পরিণতি বর্ণনা করতে গিয়ে অত্যন্ত কঠিন শব্দ ব্যবহার করেছেন: ১. মজুতদার ‘অপরাধী’ (মুজরিমান)। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মজুতদার হচ্ছে ‘অপরাধী’ (আসি)।" এখানে ব্যবহৃত ‘অপরাধী’ শব্দটি কিন্তু হালকা নয়।
পবিত্র কোরআনে এই শব্দটি সাধারণত ফিরআউন ও হামানের মতো চরম অবাধ্য ও অত্যাচারী লোকদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে, নিশ্চয়ই ফিরআউন, হামান ও তাদের বাহিনী ছিল অপরাধী। (সুরা কাসাস, ৪)। সুতরাং, যারা সাধারণ মানুষের মৌলিক প্রয়োজন নিয়ে ব্যবসা করে তাদের কষ্ট দেয়, তাদের মানসিকতাকে ইসলাম ফিরআউনদের মতো অত্যাচারী মানসিকতার সমতুল্য হিসেবে দেখে।
মজুতদারদের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে নবিজি (সা.) তাদের হীন স্বার্থবাদিতা উন্মোচন করেছেন। মুআজ ইবনু জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘মজুতকারী বান্দা কতই না খারাপ! যদি আল্লাহ মূল্যহ্রাস করে দেন তা হলে সে বিষণ্ণ হয়, আর যদি তিনি মূল্যবৃদ্ধি করে দেন তা হলে সে খুশি হয়।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ)
সাধারণ মানুষ যখন দাম কমার কারণে স্বস্তি পায়, মজুতদার তখন লোকসানের ভয়ে মনঃক্ষুণ্ণ হয়; আর যখন জনগণের দুর্ভোগ বাড়ে (দাম বাড়ে), তখন সে উল্লাসে ফেটে পড়ে। এই হীন স্বার্থবাদিতা তাকে মানবসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
ইসলামে বৈধ ব্যবসায়ীকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু মজুতদারকে অভিশাপ দেওয়া হয়েছে। উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, পণ্য-আমদানিকারক (বাজারের সরবরাহকারী) রিজিকপ্রাপ্ত, আর পণ্য-মজুতদার অভিশপ্ত। (সুনানু ইবনে মাজাহ)
এই হাদিস ব্যবসায়ীদের মধ্যে পরিষ্কার পার্থক্য টেনে দেয়:
আমদানিকারক: যিনি বাইরে থেকে পণ্য এনে বাজারে সরবরাহ সচল রাখেন, তিনি আল্লাহর কাছ থেকে বরকতপূর্ণ রিজিক লাভ করেন।
মজুতদার: যিনি সরবরাহ আটকে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন, তিনি আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যান (অভিশপ্ত)।
ব্যক্তিগত প্রাচুর্যের লোভে সাধারণ মানুষের জীবনে দুর্ভোগ নিয়ে আসা মজুতদারি ইসলামি সমাজে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একজন মুমিনের কর্তব্য হলো, সমাজের চাহিদা অনুসারে পণ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং ন্যায্য লাভে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করা।