ইসলামের ইতিহাসে এমন অসংখ্য ঘটনার দৃষ্টান্ত রয়েছে যে, মুসলিম শাসকরা ছিলেন সাধারণ জনগণের উত্তম অভিভাবক। ছিলেন সফল রাষ্ট্রনায়ক, সুশাসক ও সত্যিকার মানবতার সেবক। মানব সেবাই যেন ছিল তাদের জীবনের এক মহান ব্রত। শুধু শাসন কার্য পরিচালনা করাই যাদের কাজ ছিল না। প্রকৃত জনসেবাও ছিল তাদের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। তারা মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবার প্রতি ছিলেন আন্তরিক। ছিলেন প্রজা হিতৈষী শাসকও।
এমনই একজন শাসক হলেন অর্ধজাহানের খলিফা হজরত উমর (রা.)। যাকে বলা হতো খলিফাতুল মুসলিমিনও। যিনি তার শাসনামলে যুগান্তকারী অনেক কার্যকর ও জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে ইতিহাসের পাতায় চির অমর হয়ে আছেন। সিরাত-ইতিহাসের কিতাব থেকে সংকলিত করে আল্লামা শিবলী নোমানী (রহ.) লিখেছেন, অনবদ্য এক সংকলন খলিফা উমর (রা.)-এর জীবনীগ্রন্থ ‘আলফারুক’।
বইটি প্রত্যেক সমাজকর্মী, সমাজ সংস্কারক, রাষ্ট্রচিন্তক, রাজনীতিবিদের অধ্যয়ন করা উচিত বলে মনে করি। এছাড়া রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং যারা রাষ্ট্র নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন। গবেষণা করেন। রাষ্ট্র পরিচালনা করেন কিংবা ভবিষ্যতে করবেন, তাদেরও এটি পাঠ করা উচিত। একবার এক শীতের রাতে খলিফা হজরত উমর (রা.) নিয়ম মাফিক টহল দিচ্ছিলেন মদিনার পথে। তখন হঠাৎ তিনি বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলেন। শব্দ অনুসরণ করে সেই গন্তব্যে পৌঁছলেন। দেখলেন, একজন বিধবার চারপাশ ঘিরে বাচ্চারা কান্নাকাটি করছে।
আরো পড়ুন: জুমাবারে হজ হলে কি সত্তর হজের সওয়াব?
কারণ জানতে চাইলে ওই নারী বললেন যে, ক্ষুধার জ্বালায় তারা কাঁদছে। তখন জ্বলন্ত উনুনে হাঁড়িতে কি যেন টগবগ করছিল। হজরত উমর (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন, চুলার ওপর হাঁড়িতে কী আছে? ওই নারী উত্তর দিলেন যে, তাতে কয়েকটি নুড়ি পাথর ছাড়া আর কিছুই নেই। বরং বাচ্চাদের এভাবে ভুলিয়ে রাখা হচ্ছে। যতক্ষণ না তারা ঘুমিয়ে যায়। নারীটি খলিফার বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ তুললেন।
হজরত উমর (রা.)-এর দুচোখ বেয়ে অশ্রুধারা নেমে এল। তিনি বায়তুল মালে (রাষ্ট্রের কোষাগারে) ছুটে গেলেন এবং সেখান থেকে আটার বস্তা ও তেল নিজের পিঠে করে বয়ে নিয়ে এলেন। নিজ হাতে আগুন জ্বালালেন। খাবার তৈরি করে বাচ্চাদের খাওয়ালেন। তারপর তিনি ওই নারীকে বললেন, বায়তুল মাল থেকে তিনি যেন তার প্রতিদিনের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় খাবার নিয়ে আসেন।
এটি ছিল সত্যিকার অর্থে একজন উত্তম শাসক বা রাষ্ট্রীয় অভিভাবকের করণীয় মহান দায়িত্ব। উল্লিখিত এ ঘটনা থেকে আমাদের সবার জন্য শিক্ষা হচ্ছে যে, আমরা আমাদের আশপাশের অসহায় মানুষের সেবায় এগিয়ে আসব। এটি শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদেরই কর্তব্য নয়। বরং আর্থিকভাবে সক্ষম প্রতিটি মানুষেরই দায়িত্ব হচ্ছে যে, তার পার্শ্ববর্তী প্রতিবেশী ও অসহায় নিকটাত্মীয়দের খোঁজখবর রাখা। প্রয়োজনীয় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। সত্যিকার অসহায় অভাবীর অভিযোগকে আমলে নিয়ে সাধ্যমতো সঠিক ব্যবস্থা করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। তোমাদের বের করা হয়েছে, মানবকল্যাণের জন্য। (সুরা আলে ইমরান, ১১০)
সহিহ মুসলিমের এক বর্ণনায় এসেছে, সাহাবি হজরত তামিম দারি (রা.) বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দ্বীন-ইসলাম হচ্ছে কল্যাণ কামনার নাম। জিজ্ঞেস করা হলো, কার জন্য কল্যাণ হে আল্লাহর রাসুল। বললেন, আল্লাহর, তার রাসুলের এবং সব মুসলমানের জন্য কল্যাণ কামনা করা।
আজ আমরা প্রত্যেকেই যদি এভাবে ভাবি। আমাদের রাষ্ট্রের ও সমাজের দায়িত্বশীল অভিভাবকরাও যদি এভাবে জনগণের পাশে এসে দাঁড়ান। সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অসহায়-অবলা নারী, পথশিশু ও সাধারণ দিনমজুর মানুষের সেবায় এগিয়ে আসেন। তবে বাস্তবিক অর্থে আমরা একটি কল্যাণ (রাষ্ট্রের সমূহ কল্যাণ) দ্বারা উপকৃত হতে পারব। অনাহারে অসহায় মানবেতর জীবনযাপন করে দুঃখ-কষ্টে জীবন কাটাতে হবে না সাধারণ মানুষের। এমন একটি কল্যাণকর আদর্শ রাষ্ট্র কী আমাদের দায়িত্বশীল অভিভাবকরা আমাদের উপহার দিতে পারেন না? আমরা আমাদের দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের অভিভাবকদের থেকে এমনটিই আশা করছি।
লেখক: খতিব, ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, গাজীপুর