ঢাকা ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
নারায়ণগঞ্জে ১৭ বন্যপাখি উদ্ধার ও অবমুক্ত হান্নানের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির তথ্য ফাঁস, ছাত্রদল নেতার বাড়িতে হামলার অভিযোগ নায়িকা মিমির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট, শেষ দেখে নেওয়ার হুমকি! দোয়া গুরুত্বপূর্ণ এক ইবাদত সংসদ ভবন এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র বহনসহ মিছিল-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা কটাক্ষের শিকার আনুশকা কলকাতার মেয়র পদ ছাড়লেন ফিরহাদ হাকিম চট্টগ্রামে কাফনের কাপড় পরে যুবলীগের বিক্ষোভ মিছিল হরোস্কোপের গোলকধাঁধায় ভবিষ্যৎ ভাবনা বিয়ে করলেন উপস্থাপিকা দীপ্তি চৌধুরী উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের মানসিকতা সরকারের নেই: তথ্য প্রতিমন্ত্রী দিনে দিনেই ঘুরে আসুন মৈনট ঘাট থেকে পাবনায় ২০০ একর জমির ওপর বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী সবার সহযোগিতায় বাসডুবিতে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি: নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী নতুনধারার ‘কেমন বাজেট চাই’ শীর্ষক গোলটেবিল লক্ষ্মীপুরে হাসপাতালে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী কিশোরকে বলাৎকার, ওয়ার্ডবয় আটক জিয়া স্মৃতি জাদুঘর শিগগিরই দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হবে: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী চীনের ইভি প্রযুক্তিতে গাড়ি বানাবে ভারতের টাটা পাটগ্রাম সীমান্তে পুশইন ঠেকালো বিজিবি, বিএসএফকে কড়া প্রতিবাদ হবিগঞ্জে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বাবা-ছেলের মৃত্যু দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও সীমান্তে পুশইনের আশঙ্কা: বিজিবির নজরদারি জোরদার দিল্লির হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে এক বাংলাদেশি নিহত কন্যাসন্তানের বাবা-মা হলেন শাকিব ও বুবলী হাম উপসর্গে একদিনে ৫ জনের মৃত্যু ফটিকছড়িতে ছাত্রলীগের গোপন সভা, গ্রেপ্তার ২ রাঙ্গুনিয়ায় সড়ক ভেঙে দুর্ভোগে হাজারো মানুষ ,ভরসা বাঁশের সাঁকো বরগুনায় বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত টাঙ্গুয়ার হাওরে অপরিকল্পিত হাউজবোট চলাচল: বেলার উদ্বেগ প্রকাশ পীরগাছায় পুকুরে ডুবে প্রাণ গেল ভাই-বোনের
Nagad desktop

সংস্কার প্রস্তাব: সময় নিচ্ছে সরকার

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৪, ১১:৫১ এএম
আপডেট: ০২ অক্টোবর ২০২৪, ১১:৫৫ এএম
সংস্কার প্রস্তাব: সময় নিচ্ছে সরকার
রাজনৈতিক দলগুলোর মনোভাব বুঝতে সময় নিচ্ছে সরকার। খবরের কাগজ গ্রাফিকস

রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে অন্তর্বর্তী সরকার আরও সময় নিতে চায়। বুঝে নিতে চায় রাজনৈতিক দলগুলোর মনোভাবও। এ ছাড়া বিভিন্ন পেশাজীবীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিয়ে এগোতে চায় সরকার। আর এ কারণেই ছয় কমিশন পুরোপুরি গঠন ও কাজ শুরু করতে সরকার আরও কিছুটা সময় নিতে চাইছে।

এদিকে বিএনপিসহ (অংশীজন) অন্যান্য রাজনৈতিক দল এ প্রশ্নে নিজেদের করণীয় নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামীসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে প্রস্তাবও তৈরি করছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে।

এদিকে সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সঙ্গে কথা বলেননি সরকারের সংশ্লিষ্ট কেউ। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘এখন এই ধরনের কোনো বিষয় নেই। বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী এবং যে দলের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে সেই দল আওয়ামী লীগকে শেষ করে দেওয়ার একটা চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র চলছে। যে দলের জনপ্রিয়তা তৃণমূলে বিস্তৃত, সেই দলের নাম নিলেই অনেকের গাত্রদাহ শুরু হয়। যারা এই দলের অনুসারী, তাদের পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, মেরে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। এখন আর এই দেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো কোনো কথা বলে না।’

বিএনপির সংস্কার প্রস্তাব 
সূত্রমতে, এরই মধ্যে সংস্কার প্রস্তাব তৈরির জন্য বিএনপির ছয় সদস্যের কমিটি কাজ শুরু করেছে। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ। 

মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর খবরের কাগজকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র মেরামত বা সংস্কারের যে উদ্যোগ নিয়েছে, বিএনপি তাকে স্বাগত জানিয়েছে। বিএনপি মনে করে, দ্রুত সংস্কার করে জাতীয় নির্বাচন দেওয়া প্রয়োজন। এরই মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে বিএনপি কাজ শুরু করেছে। প্রস্তাব তৈরির কাজ শেষ করে বিএনপির কেন্দ্রীয় বৈঠকে চূড়ান্ত করা হবে। বিএনপির পক্ষ থেকে তৈরি চূড়ান্ত সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জমা দেওয়া হবে। আশা করি, বিএনপির দেওয়া সংস্কার প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা হবে।’ 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত খুবই ভালো উদ্যোগ। আমরা দলীয় ফোরামে আলোচনা করেই চূড়ান্ত সংস্কার প্রস্তাব ঠিক করছি।’ 

তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যে বিএনপি ইন্টারনাল (অভ্যন্তরীণ) কমিটি গঠন করেছে। সেখান থেকে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাব সাজেস্ট করা হবে, দলীয় ফোরামে আলোচনা করে তা আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তুলে ধরব। আশা করি, দু-এক দিনের মধ্যে আমাদের প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়ে যাবে।’ 

আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে বিএনপির সমাবেশে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত জবাবদিহিমূলক সরকার এবং সংসদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য সামনে রেখেই সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া দরকার। জনগণের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছাড়া উন্নয়ন-গণতন্ত্র বা সংস্কার কোনোটিই টেকসই ও কার্যকর হয় না।’

নির্বাচনের লক্ষ্যে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়ার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যেই বেশ কিছু ক্ষেত্রে সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন, জনপ্রশাসনের সংস্কার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ‘সক্ষম এবং উপযুক্ত’ গড়ে তুলতে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। বিএনপি মনে করে, অন্তর্বর্তী সরকার এজেন্ডা সেটিংয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে না পারলে গণ-অভ্যুত্থানের সাফল্য ব্যাহত করতে ষড়যন্ত্রকারী চক্র নানা সুযোগ গ্রহণ করতে পারে।’

প্রস্তাব তৈরি করছে জাতীয় পার্টি 
জাতীয় পার্টির প্রস্তাবে সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রশাসন দলীয়করণমুক্ত করা এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতেও বিভিন্ন পদক্ষেপ প্রস্তাবে রাখা হবে। 

এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহম্মদ কাদের (জি এম কাদের) খবরের কাগজকে বলেন, ‘অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে দ্রুত সংস্কারের কাজ শেষ করতে হবে। প্রশাসনসহ সব জায়গায় দলীয়করণ হয়েছে। সংস্কারের মাধ্যমে এসব দলীয়করণ দূর করতে হবে। রাষ্ট্রকাঠামো ঠিক না করে নির্বাচন হলে তা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে না। আবারও আমরা প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন দেখতে চাই না।’

তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। না হলে আবারও স্বৈরশাসন শুরু হবে, স্বৈরশাসকের জন্ম হবে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে একবার আওয়ামী লীগ, একবার বিএনপি সরকার গঠন করে কর্তৃত্ববাদী সরকার তৈরি করেছিল। ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর একই ঘটনা ঘটেছে। দেশ ও প্রশাসন সম্পূর্ণ দলীয়করণ করা হয়েছে। নির্বাচন নিয়ন্ত্রণের জন্য দুই পক্ষই চেষ্টা করেছে।

তিনি বলেন, সরকার পতনের আগে প্রশাসনে আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ ছিল। আওয়ামী লীগ সরে যাওয়ার পর এখন বিএনপির প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে। তাই প্রশাসন সম্পূর্ণ দলীয়করণমুক্ত হয়, এমন পদক্ষেপ এখন জনগণের আকাঙ্ক্ষা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্যও সংস্কার প্রয়োজন। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে হলে অর্থ খাতে ব্যাপক সংস্কার করতে হবে। এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির প্রস্তাব থাকবে। জাতীয় পার্টি রাষ্ট্র মেরামতের জন্য সব খাতেই সুষ্ঠু, বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার চায়। এসব সংস্কার দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে। এরপর একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে হবে। 

জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাব 
এদিকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রেখে সংবিধান সংশোধনসহ কয়েকটি প্রস্তাব তৈরি করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে এ বিষয়ে একটি কমিটি কাজ করছে। প্রস্তাবে একক কর্তৃত্বপরায়ণ কোনো সরকার যাতে আগামীতে ক্ষমতায় আসতে না পারে, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া, ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী নির্বাচনি ব্যবস্থা, রাজনৈতিক বিভেদ ও বিভাজন কমিয়ে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি বাদ দেওয়ার কথা থাকবে। 

দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মওলানা আবদুল হালিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে প্রাধান্য দিয়ে তাদের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে আমরা প্রস্তাব দেওয়ার কথা চিন্তা করছি। বাংলাদেশে আর যাতে একক কর্তৃত্বপরায়ণ সরকার না আসে, এমন পদক্ষেপ গ্রহণের কথা আমরা বলব।’ 

সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে জামায়াতের দলীয় ফোরামে সংস্কার বিষয়ে কয়েকবার আলোচনা হয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। 

অন্যান্য রাজনৈতিক দল 
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘আমরা তখনই বলেছিলাম এটা ঠিক হচ্ছে না। রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে শুরুতেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা দরকার। সব পয়েন্টেই আলোচনা করা দরকার; বিশেষ করে নির্বাচনি ব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে এখনই আলোচনা করা দরকার। আমরা এখন জানতে পারলাম সরকার ছয়টি কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে এবার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে চায়। যদি চিঠি পাই, তবে আমরা যাব। আলোচনায় গেলে প্রথমেই জানতে চাইব, সংস্কারের লক্ষ্যে কী কী করতে চায়। তারা এই সংস্কারের বিষয়ে আমাদের কাছে পূর্ণাঙ্গ মতামত চাইলে তখন আমরা তা পেশ করব। আমাদের ডাকলে আমরা আমাদের পরামর্শ দেব। নির্বাচন সংস্কার নিয়ে বাম গণতান্ত্রিক জোটের প্রস্তাব আগে থেকেই ঠিক করা আছে। অন্তর্বর্তী সরকার যদি আমাদের সঙ্গে নাও বসে, তাহলে আমরা সংবাদ সম্মেলন করে সেসব প্রস্তাব দেশবাসীকে জানিয়ে দেব।’ 

গণ-অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর বাংলাদেশকে আমরা নতুনভাবে বিনির্মাণের সুযোগ পেয়েছি। সেখানে রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি প্রতিটি স্টেকহোল্ডারের মতামতের ভিত্তিতে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক সংসদ এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট গঠনের ব্যাপারে আমাদের প্রস্তাব তুলে ধরব। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংস্কার, শিক্ষা খাতসহ রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব থাকবে। ইতোমধ্যে আমরা রাষ্ট্র সংস্কারে আমাদের প্রস্তাব চূড়ান্ত করার কাজ শুরু করেছি।’

এবি পার্টির সদস্যসচিব মজিবুর রহমান মঞ্জু খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাষ্ট্র সংস্কার এজেন্ডা মোটা দাগে তিনটি। প্রথমত, আমরা রাজনৈতিক দল ও সরকার কাঠামোতে সংস্কার চাই; দ্বিতীয়ত, আইন ও বিচারব্যবস্থার সংস্কার এবং তৃতীয়ত, জনপ্রশাসন ও পুলিশি ব্যবস্থাপনার সংস্কার। আমাদের প্রস্তাব হলো- দলের প্রধান ও সরকারপ্রধান একই ব্যক্তি হতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য পদে পরপর অথবা বিরতি দিয়ে দুই মেয়াদের বেশি কেউ নির্বাচিত হতে পারবেন না। দলের প্রধান ও দায়িত্বশীল পদগুলোতেও একজন ব্যক্তি দুই বা তিন মেয়াদের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। এতে দলে গণতন্ত্রের চর্চা, নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি ও জবাবদিহির পথ সুগম হবে। ব্যক্তি বা পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির পথ রুদ্ধ হবে এবং দুর্নীতি কম হওয়ার আশঙ্কা কম থাকবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।’

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ১১ সেপ্টেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নির্বাচনব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, সংবিধান ও দুর্নীতি দমন বিষয়ে সংস্কারের জন্য ছয়টি কমিশন গঠনের কথা জানান।

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বদিউল আলম মজুমদার, পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান সফর রাজ হোসেন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমান, দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনের প্রধান ইফতেখারুজ্জামান, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী। আর সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে প্রথমে বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিকের নাম ঘোষণা করা হলেও পরে তা পরিবর্তন করে অধ্যাপক আলী রীয়াজকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

১ অক্টোবর থেকে ছয় কমিশনের কাজ পুরোদমে শুরুর কথা থাকলেও তা হয়নি। এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘ছয়টি সংস্কার কমিশনের প্রধান নির্বাচন করা হয়েছে। এর মানে কমিশনের কাজ কিন্তু শুরু হয়েছে। তবে পুরোদমে শুরু করার আগে সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা বসতে চায়। কারণ রাজনৈতিক দলগুলোই আমাদের স্টেকহোল্ডার (অংশীজন)। তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনায় বসা হবে।’ 

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনে আট থেকে নয়জনকে সদস্য হিসেবে, সর্বোচ্চ ১০ জন নেওয়া হবে। সদস্যদের বিষয়ে আমি মতামত দিয়েছি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের ঊর্ধ্বতনরা নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্যদের বিষয়ে আরও বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবেন। তাই সদস্য বাড়তে বা কমতে পারে। আমি আশা করছি, অল্প সময়ের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি হবে। সংস্কারকাজে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে পরামর্শ আশা করছি।’ 

পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান সফর রাজ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাকে দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকেই সংস্কারের বিষয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছি। এখন সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে সদস্য চূড়ান্ত করার পর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। সংস্কার বিষয়ে শুধু রাজনৈতিক দল না, সমাজের অন্যদের মতামতেরও গুরুত্ব দিতে চাই। সবার কাছ থেকেই মতামত নেওয়া হবে।’ 

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৭৯তম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার ভাষণে সংস্কার সম্পর্কে বলেন, মানুষের আস্থা ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে এবং নির্মম অতীত যেন আর ফিরে না আসে, সে জন্য আমরা কিছু সুনির্দিষ্ট খাতে সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। নির্বাচনব্যবস্থা, সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা-ব্যবস্থা সংস্কারে স্বাধীন কমিশন গঠন করেছি। সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের সংস্কারের জন্য পৃথক কমিশনসহ আরও কয়েকটি বিষয়ে কমিশন গঠন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

ভালোবাসা বটমূলে

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২২ পিএম
ভালোবাসা বটমূলে
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

ভোর ৫টায় মোবাইল ফোনটা বেজে উঠতেই শমীকের ঘুম ভেঙে গেল। ডানপাশে টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা নিয়ে দেখে স্ক্রিনে তার বন্ধু চন্দন রায়ের নাম।
‘কীরে শমীক, ঘুম ভেঙেছে? আজ পয়লা বৈশাখ, মনে আছে তো?’
‘হ্যাঁ, মনে আছে। আমি ৬টার আগেই বটমূলে পৌঁছাতে চাই। তুই সময়মতো রমনা পার্কের প্রধান গেটে গিয়ে অপেক্ষা করবি, আমরা একসঙ্গে ভেতরে যাব।’
‘ঠিক আছে দোস্ত, আজ সারা দিন আমরা একসঙ্গে কাটাব। বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান দেখব, গান শুনব। তার পর যাব চারুকলায়, মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখব, ওদের সঙ্গে হাঁটব।’
‘তার পর আমরা যাব ধানমন্ডি লেকের পাড়ে, ওখানে নববর্ষের অনেক অনুষ্ঠান হয়। খাওয়াদাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থাও থাকে। আজ দুপুরের খাওয়া ওখানেই হবে।’
‘সবই ঠিক আছে, সবই হবে। কিন্তু তোর গার্লফ্রেন্ড চৈতি আজকের দিনে আমাদের সঙ্গে থাকবে না, এটা ভাবতেও আমার খারাপ লাগছে। আগে প্রতিটি পয়লা বৈশাখে আমরা তিনজন একসঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম, কত আনন্দ করতাম। হঠাৎ তোদের কী হলো? তোরা আড়ি দিলি কেন?’
‘আমি তো আড়ি দিইনি, ওই দিয়েছে। মেয়েটা বড় সেনসিটিভ, ওর আঁকা পেইন্টিং নিয়ে ঠাট্টা করে কিছু একটা বলতেই ও রেগে গেল, কথা বন্ধ করে দিল। তিন মাস হয়ে গেল আমাকে ফোন করে না, ফোন ধরে না। দেখা হলে কথাও বলে না।’
‘ঠিক আছে, আজ যদি চৈতিকে বটমূলে পাই, আমি কথা বলব ওর সঙ্গে। আড়ি ভাঙিয়ে তোদের ভাব করিয়ে দেব। চিন্তা করিস না। এখন তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে যা। ৬টার মধ্যেই বটমূলে পৌঁছতে হবে।’ 

২.
শমীক মাহমুদ ও চন্দন রায় দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ছাত্র। তৃতীয় বর্ষ অনার্সে ওরা পড়ছে। শমীক থাকে শহীদুল্লাহ হলে, জগন্নাথ হলে থাকে চন্দন। ওরা এইচএসসি পাস করেছে একই সঙ্গে ঢাকা কলেজ থেকে। সেখানে হোস্টেলে থেকেছে একই রুমে। শুরু থেকেই ওদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব। শমীক কবিতা লেখে স্কুলজীবন থেকেই। এখন তার কবিতা প্রায় প্রতি সপ্তাহেই সংবাদপত্রের সাহিত্য পাতায় ছাপা হয়। কবি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বন্ধু চন্দন কবিতা না লিখলেও শমীককে কাব্যচর্চায় উৎসাহ দেয়। 
শমীক ও চন্দন দুজনেই চিত্রশিল্পের অনুরাগী। চারুকলা ইনস্টিটিউটে কোনো প্রদর্শনী থাকলে ওরা যাবেই। এ কারণেই চারুকলায় তাদের যাতায়াত ছিল। এমনি এক চিত্র প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে ওদের পরিচয় হয়ে গেল ফাইন আর্টস বিভাগের ছাত্রী চৈতি রহমানের সঙ্গে। চারুকলা চিত্রশিল্প নিয়ে কথা বলতে বলতে ওদের সম্পর্ক, আরও ঘনিষ্ঠ হলো। শমীক কবিতা লেখে জেনে চৈতি খুশি হলো। সেও কবিতা পছন্দ করে, মাঝেমধ্যে লিখেও ফেলে। 
ওদের প্রায়ই দেখা যায় টিএসসি অথবা মধুর রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছে, চা খাচ্ছে। কখনো ওরা বেইলি রোডের কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসে। শিল্পকলা একাডেমির অনুষ্ঠানেও যায়, নাটক দেখে। এভাবে দিন গড়িয়ে যায়, ওদের লেখাপড়াও এগিয়ে চলে। 
চন্দন একদিন বুঝতে পারে শমীক ও চৈতির সম্পর্কটা বন্ধুত্বের পর্যায় ছেড়ে আরও কিছুটা এগিয়ে গেছে। চৈতির প্রতি চন্দনের দুর্বলতা ছিল ঠিকই, কিন্তু সে বাস্তববাদী। বাস্তবকেই মেনে নেয় চন্দন। নিজেকে সে গুটিয়ে নিতে থাকে ওদের কাছ থেকে। মনে মনে বলে, ‘সত্য যে বড়ই কঠিন/ সে কখনো করে না বঞ্চনা/ তাই কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।’ 
কিন্তু শমীকের কাছে ধরা পড়ে যায় চন্দন। শমীক তাকে সরাসরি প্রশ্ন করে, ‘কী হয়েছে তোর? তুই আমাদের কাছ থেকে দূরে থাকিস কেন?’
‘দূরে কোথায়, তোদের কাছেই তো থাকি। আমাকে ডাকলেই পাওয়া যায়।’
‘তা পাওয়া যায়, কিন্তু ডাকতে হবে কেন? আমরা তিনজন একসঙ্গে ছিলাম, এক সঙ্গেই থাকতে চাই। কিন্তু তুই একটু দূরে সরে গেছিস। কেন বুঝতে পারছি না। তাই জানতে চেয়েছি কী হয়েছে।’
এবার চন্দন হেসে ফেলে। শমীকের পিঠে হাত রেখে বলে, ‘কিছুই হয়নি দোস্ত, সব ঠিক আছে। আমি তোকে খুব ভালোবাসি, সব সময় তোর ভালোটাই আমি চাই। তাই তোর পথ থেকে একটু সরে দাঁড়ালাম। তোরা দুজন এগিয়ে যা। আমি তোদের পাশে না হলেও ঠিক পেছনে আছি।’ 
‘না, আমি তোকে আমার পাশেই চাই। আমরা তিনজন আগের মতোই একসঙ্গে থাকব, একসঙ্গে ঘুরে বেড়াব। একজনকে পাওয়ার জন্য তোকে আমি হারাতে চাই না চন্দন।’
‘বোকার মতো কথা বলছিস শমীক। আমি তো হারিয়ে যাচ্ছি না। তোদের সঙ্গেই থাকব। আমি শুধু তোদের দুজনকে স্থায়ীভাবে এক করে দিতে চাই। তোর আর চৈতির জুটিটা চমৎকার হবে। একজন কবি, আরেকজন শিল্পী, তোদের দুজনেরই কাজ অনেক সুন্দর হবে, সৃষ্টিশীলতা অনেক বাড়বে।’

৩.
সেদিন বাংলা নববর্ষ-পয়লা বৈশাখ। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল। ভোর ৬টার মধ্যেই শমীক পৌঁছে যায় রমনা পার্কের প্রধান গেটে। গিয়ে দেখে চন্দন আগেই এসেছে সেখানে।
‘শুভ নববর্ষ শমীক। তোকে অনেক ধন্যবাদ, সময়মতো এসেছিস। হালকা নীল রঙের পাঞ্জাবি পরেছিস, তোকে খুব মানিয়েছে।’
‘শুভ নববর্ষ চন্দন। হ্যাঁ, এই পাঞ্জাবিটা আমার খুব পছন্দের। গত বছর নববর্ষে চৈতি উপহার দিয়েছিল। একবার ভাবলাম এটা আর পরব না। তার পরেই মনটা কেমন হয়ে গেল। এটাই পরে ফেললাম।’
‘খুব ভালো করেছিস। তোকে এই পাঞ্জাবি পরা দেখলে চৈতির মনটাও নরম হয়ে যাবে। তোদের মান-অভিমানের মীমাংসা আজই করে ফেলব। চল বটমূলের দিকে যাই। দেখি চৈতি এসেছে কি না।’
ওরা দুজন মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে থাকে। তখন ঘড়িতে সোয়া ৬টা। নগরীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ এসে গেছে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে। নবীন-প্রবীণ সব বয়সী মানুষ আসছেন রমনায়, অনেক দম্পতির সঙ্গে তাদের শিশু সন্তানও আছে। 
রমনার প্রাঙ্গণে জনতার ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। বেশির ভাগ পুরুষের পরনে পাঞ্জাবি-সাদা অথবা রঙিন। মেয়েরা প্রায় সবাই লালপাড় সাদা শাড়ি পরেছে। চুলে কানের পাশে অথবা খোঁপায় ফুল গুঁজেছে অনেকেই। অল্পবয়সী মেয়েরা ফুলের রিং মাথায় দিয়ে হাসি-উল্লাসে মেতেছে। তরুণ-তরুণীদের জটলা এখানে-ওখানে। সকালের নরম রোদ আর স্নিগ্ধ বাতাস, আনন্দ-মুখর মানুষের সমাবেশ আর বর্ষবরণের গান, রমনার প্রাঙ্গণকে নতুন রূপে সাজিয়েছে। 
‘এটাই বাঙালির বর্ষবরণ। এক সময় পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন হতো শুধু গ্রামাঞ্চলে, এখন এটা এসে গেছে শহরে, নগরে। ঢাকা মহানগরীতে নববর্ষের অনুষ্ঠান বেশি হয়। তাই না শমীক?’
‘ঠিকই বলেছিস চন্দন। পাকিস্তানি শাসনামলে ওরা বলত পয়লা বৈশাখের বর্ষবরণ উদ্‌যাপন এ দেশের সংস্কৃতি নয়, ওটা ভারতীয় সংস্কৃতি। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ঘোষণা করলেন, পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন করতে দেওয়া হবে না। ফলটা কী হলো? বাঙালিরা খেপে গিয়ে আরও বেশি করে নববর্ষ উদ্‌যাপন করতে থাকে। রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান শুরু হয় ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। প্রতি পয়লা বৈশাখে ছায়ানটের অনুষ্ঠান এখনো চলছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু একবার বন্ধ ছিল।’
চন্দন লক্ষ করে শমীক যখন কথা বলছে, তার চোখ এদিকে-ওদিকে কাকে যেন খুঁজছে। বোঝা গেল শমীকের চোখ খুঁজছে চৈতিকে। চন্দন চুপ করে থাকে, কিছু বলার তো নেই। যে করেই হোক আজ চৈতিকে খুঁজে বের করতেই হবে। 
হঠাৎ চন্দনের সামনে এসে দাঁড়ায় ওদের সহপাঠী অপর্ণা বড়ুয়া। অপর্ণা হেসে বলে, ‘শুভ নববর্ষ। তা তোমরা দুজন কেন, আরেকজন কোথায়?’
‘কার কথা বলছ অপর্ণা?’ শমীক জানতে চায়।
‘ন্যাকা। কিছুই বোঝ না? চৈতি কোথায়? তোমাদের সঙ্গে নেই কেন?’
‘চৈতি এখনো আসেনি, আসবে।’
‘আসবে বলছ কেন? ও তো এসে গেছে। বটমূলে অনুষ্ঠানের ডানদিকে দাঁড়িয়ে গান শুনছে। লালপাড়, সাদা শাড়ি, কপালে লালটিপ, ওকে কী সুন্দরই না লাগছে। বেচারা একা দাঁড়িয়ে আছে। তোমরা ওর কাছে যাও।’
চন্দন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। শমীকের হাত ধরে বলে, ‘চলো দোস্ত বটমূলে যাই। চৈতি তোর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।’
‘তুই যা। ওকে আমার কাছে আসতে বল।’
‘ঢং করিস না তো। ওটা মেয়েদের মানায়, পুরুষদের নয়। চল আমার সঙ্গে।’ 
শমীকের হাত ধরে চন্দন এগিয়ে যায় বটমূলের দিকে। তখন সকাল ৮টা বাজতে কিছু সময় বাকি। বহু মানুষ বিশাল বটগাছের ছায়ায় বসে গান শুনছে-বর্ষবরণের গান। বটমূলে নিচ থেকে ওপরে, সারি সারি কাঠের বেঞ্চ দিয়ে তৈরি বিরাট মঞ্চে বসে ছায়ানটের শিল্পীরা গান গাইছে। শিল্পীদের মধ্যে কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, সবাই আছে। এরা সবাই ছায়ানটের শিক্ষার্থী। একই রঙের পোশাক পরেছে। 
বটমূলে মঞ্চের ঠিক বিপরীত দিকে এসে দাঁড়ায় শমীক ও চন্দন। ওদের সামনেই বিপুল সংখ্যক শ্রোতা মাঠে বসে গান উপভোগ করছে। মাঠের একপাশে উঁচু প্লাটফর্মে বিটিভির ক্যামেরা দিয়ে অনুষ্ঠানের সরাসরি সম্প্রচার চলছে। 
চন্দনের চোখ হঠাৎ গেল ডানদিকে। সে দেখে চৈতি দাঁড়িয়ে আছে আরও অনেক মানুষের সঙ্গে। তাকিয়ে আছে এই দিকে। লালপাড় সাদা শাড়িতে ওকে অপূর্ব লাগছে। 
‘শমীক, ওই দ্যাখ তোর চৈতি, এদিকেই তাকিয়ে আছে। যা ওর কাছে।’
শমীক যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই বিকট শব্দে একটা বিস্ফোরণ। একটি শক্তিশালী বোমা ফেটেছে বসে থাকা শ্রোতাদের মাঝখানে। ধোঁয়া, বারুদের গন্ধ, আহত মানুষের আর্তনাদ। শিল্পীদের গান থেমে গেছে। মানুষের হুড়োহুড়ি, সবাই ছুটে যাচ্ছে যে যেদিকে পারে। পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবী, সবাই যাচ্ছে আহতদের উদ্ধার করতে। 
কিছুক্ষণ পরেই আর একটি বোমা ফাটল একই জায়গায়। শমীক যখন কোনোদিকে যাবে ভাবছে, ঠিক তখনই তাকে কেউ জড়িয়ে ধরল সামনের দিক থেকে। শমীক দেখে একজন নারী তাকে জড়িয়ে ধরেছে। তার চুলের গন্ধ আর দেহের স্পর্শে শমীক বুঝতে পারে এ তার হারিয়ে যাওয়া প্রিয়বান্ধবী চৈতি। ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। শমীক ওকে শক্ত করে ধরে রাখে। 
‘ভয় নেই চৈতি। আমি তো আছি তোমার সঙ্গে। চলো আমরা এখান থেকে অন্যদিকে যাই।’

নববর্ষের উৎসব: উৎস থেকে নিরন্তর

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৭ পিএম
নববর্ষের উৎসব: উৎস থেকে নিরন্তর
ছবি: খবরের কাগজ

বাঙালির উৎসবের আয়োজনে সামর্থ্যের চেয়ে অতিশয়োক্তি থাকে বৈকি। জাতি হিসেবে এ ধারা আমাদের উৎসবমুখর বললে বাড়িয়ে বলা হবে না বোধকরি।

উৎসব মানেই আনন্দ, হইহুল্লোর, খাওয়াদাওয়া, বেড়ানো- কত কী। বাঙালির জীবনে ঈদ, পূজা ও বাংলা নববর্ষ বড় উৎসব। ঈদ ও পূজা ধর্মীয় উৎসব হলেও বাংলা নববর্ষ সব ধর্মের মানুষ উদ্‌যাপন করে এ জন্য এ উৎসব সর্বজনীন। একসময় গ্রাম বাংলায় নববর্ষকে ঘিরে গ্রামের মেলা, লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ, ঘুড়ি ওড়ানোসহ নানা আয়োজনে নববর্ষকে কেন্দ্র করে আনন্দের ধুম পড়ে যেত। স্মৃতির খাতার পাতা উল্টিয়ে আজও উঁকি দেয় ছোটবেলার গ্রামের মেলার কাঁচাগোল্লা, গরমজিলিপি, খাজা, মাটির পুতুল, ঘোড়াসহ হরেক রকম জিনিস। নাগরদোলার দোল যেন আজও মনে দোলা দেয়। নববর্ষের মেলার মাটির খেলনা ছোটবেলায় যজ্ঞের ধন মনে হতো। সময় বদলে নববর্ষের উৎসব ভিন্ন আঙ্গিকে রূপ নিয়েছে। সরকার বাংলা নববর্ষে সরকারি কর্মচারীদের বাড়তি একটি উৎসব ভাতা প্রদান করায় বাংলা নববর্ষের আয়োজনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। 

প্রতি বর্ষের সমাপ্তে বাংলা নববর্ষ হাজির হচ্ছে বৃহৎ পরিসরে বাঙালির জীবনে। বাংলা নববর্ষ দিনদিন পরিসর বৃদ্ধি করে রং ছড়াচ্ছে। মানুষের গায়ের জামা থেকে শুরু করে মঙ্গল শোভাযাত্রার পাপেটের রং ও বৈচিত্র্যে ভরপুর। উৎসবের আমেজে বাঙালি নববর্ষে সাজায় নিজেকে নতুন কাপড়ের মোড়কে। নববর্ষকে কেন্দ্র করে বাঙালিয়ানাকে ধারণ করে আমরা জীবনের চলার পথের নতুন আনন্দ খুঁজে পাই। যদিও সারা বছরে নববর্ষের বাঙালিয়ানার রক্ষক আমরা থাকি না। তবু নববর্ষ জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে এক সর্বজনীন উৎসব। বাঙালির মহামিলনের একটি উপলক্ষ। 

বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস পাঠ মত-মতান্তরে ভরপুর। বাংলা নববর্ষের প্রচলন- এমনকি ছায়ানটের নববর্ষের উদ্‌যাপনের সূচনার ইতিহাস নিয়েও মত-মতান্তর রয়েছে। কবে, কোথায়, কে বা কারা করেছিলেন এরূপ প্রশ্ন ছুড়লে বাংলা নববর্ষের উৎপত্তির ইতিহাস তর্কের বেড়াজালে জড়িয়ে যায়। আর যারা এসব বিষয় নিয়ে চর্চা করেন তারা সমাধানে পৌঁছনোর চেয়ে নিজের শক্ত বা নরম-যুক্তি যাই হোক না কেন- সেই অবস্থানেই থিতু হয়ে থাকতে চান। বাংলা নববর্ষের প্রবর্তনের ইতিহাসে অনেকের নাম এলেও সবচেয়ে আলোচিত ও প্রচলিত নামটি হচ্ছে মুঘল সম্রাট জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ আকবরের। মুঘলরা মুসলিম হিসেবে রাজ্য শাসন অনুসরণ করত হিজরি সন অনুযায়ী। হিজরি সন চান্দ্র সন। সমস্যা হচ্ছে হিজরি সন সৌরবর্ষের চেয়ে ১০-১১ দিন ছোট। ফলে গাণিতিক হিসেবে তিন বছর অন্তর সৌর সনের চেয়ে হিজরি সন এক মাস এগিয়ে আসে, এভাবে আকবরের সিংহাসন আরহণের সময় ১৫৫৬ খ্রি. থেকে শুরু করে মোট ২৯ বছর রাজত্বকালে প্রচলিত শতাব্দের সঙ্গে হিজরি সনের সময় তারতম্য ঘটেছিল ৯ মাসের।

আরেকটি বড় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল খাজনা আদায় নিয়ে। কারণ মুঘলরা হিজরি সনের অনুসারী হয়ে রাজ্য পরিচালনা করলেও হিজরি সনের মাসগুলো মৌসুম ঋতুকেন্দ্রিক ছিল না। এ পরিপ্রেক্ষিতে ফসল কাটার সময় নির্দিষ্ট করে খজনা আদায়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। সাধারণ মানুষের অর্থনীতি ছিল কৃষিভিত্তিক। তখনকার জনজীবন মূলত কৃষির আবহে চলত। কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ে সুবিধার জন্য আকবর তারিখ-ই-ইলাহি সন বলে নতুন সন চালু করেছিলেন। মূলত আকবরের আদেশে দরবারের সেরা পণ্ডিত জ্যোতিষ শাস্ত্রবিদ আমির ফাতেহ উল্লাহ্ সিরাজি বাংলা সনের উদ্ভাবন করেন। ফাতেহ উল্লাহ সিরাজি আকবরের সিংহাসনে আরোহণের তারিখ, ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৫৫৬ খ্রি.-কে ভিত্তি ধরে সন গণনা শুরু করেন। সেই থেকে বাংলা সনের পথচলা। একটি বিষয় বলে রাখা উচিত আকবরের প্রচলিত সর্বজনীন নতুন ধর্ম ‘দ্বিন-ই-ইলাহি’ ও তারিখ-ই-ইলাহির সময়কাল অভিন্ন। কালের আবর্তে দীন-ই-ইলাহি পথ চলতে না পারলেও আকবরের নির্দেশে ফতেহ উল্লাহ্ সিরাজি প্রবর্তিত বাংলা সনকে কার্যকর করেছিলেন আকবরের সজ্ঞা ও প্রজ্ঞায় ঋদ্ধ অর্থ উপদেষ্টা টোডরমল। তিনি ১৫৮৫ খ্রি. ১০ মার্চ ইলাহি সনের কার্যকরণ ঘটান। এ সময় থেকে বাংলায় খাজনা আদায়ে বাংলা সন গণনা করা হয়। উল্লেখ্য, বাংলা সন প্রবর্তনের আগে হিসাব সমন্বয়ের কাজটি জটিল ছিল। কারণ উপমহাদেশে শতাব্দসহ হিসাব ছিল সৌর বর্ষ। কিন্তু হিন্দু-মুসলিম বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি চন্দ্র মাসের হিসাবে মান্য করা হতো। সৌরবর্ষ যেহেতু হিসাবের নিক্তিতে তিন বছর অন্তর এক মাস এগিয়ে যেত তাই হিসাবের সুবিধার্থে প্রতি তিন বছর অন্তর প্রাচীন আরবি রীতির মতো এক মাস নামমন্ত্র হিসাবে সংযোগ করে বাদ দেওয়া হতো। গোঁজামিলের এ পদ্ধতির নাম ছিল ‘সাবনমিতি’। 

চন্দ্রমাস ও সৌরবর্ষের ব্যবহারের প্রাচীন রীতির একটি সমন্বয় ও সরলীকরণের মানসেই আকবর বাংলা সনের প্রচলন করেছিলেন। সৌরবর্ষ ও চন্দ্রবর্ষের সমন্বয়ে বাংলা সন ও মাসে সৌর ও চন্দ্রের রেশ বয়ে যায়। যেমন বিশাখা নক্ষত্রের আদলে নাম বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠা নক্ষত্রের আদলে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়া নক্ষত্রের আদলে আষাঢ়, শ্রবণা নক্ষত্রের আদলে শ্রাবণ, ভাদ্রপদা নক্ষত্রের নামের আদলে ভাদ্র, অশ্বিনী নক্ষত্রের আদলে আশ্বিন, কৃত্তিকা নক্ষত্র থেকে কার্তিক, আমন থেকে অগ্রহায়ণ, পুষ্য নক্ষত্র থেকে পৌষ, মঘা নক্ষত্রের আদলে মাঘ, ফাগুনী নক্ষত্র থেকে ফাগুন এবং চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র।

ওপরের বর্ণনা তো গেল আকবর অখ্যান। কিন্তু বাংলা সনের ব্যুৎপত্তির উৎসে আকবরের নাম ছাড়া তো আরও কিছু নাম, স্থান ও সময়ের সংযোগ রয়েছে। বাংলা সনের হিসাবের সূত্রপাতে আকবরের পাশে পেরেক ঠুকে নাম আছে- রাজা শশাঙ্ক তিব্বতের রাজা রিস্প্রভ-সন, বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্, মুর্শিদ কুলি খাঁসহ আরও অনেকের নাম। তবে বাংলা সন প্রবর্তক হিসেবে মহামতি আকবরের পাল্লাই ভারী। আকবর ছিলেন সুন্নি মুসলিম। তার জাতিসত্তার ঐতিহ্য ছিল তুর্কি আতর মাখা। জাতিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারে মুঘলরা ছিল ইন্দো-পারসিক। শাসক হিসেবে আকবর বিচক্ষণ ছিলেন। তার আমলেই মুঘল রাজ্য সর্বাধিক বিস্তৃত হয়েছিল। তিনি সৌর ও চন্দ্রবর্ষের সমন্বয় করে প্রজাদের ফসল তোলার সময় বর্ষের গণনা শুরু করেছিলেন সুদূরপ্রসারী ধ্যান ও ধারণা থেকে। তিনি দিব্যদৃষ্টিতে বুঝেছিলেন প্রজাদের আর্থিক সচ্ছলতার সময় খাজনা আদায় সুবিধাজনক। আকবরের বাংলা সনে প্রজাদের খাজনা নবায়নের পাশাপাশি বাংলায় বাংলা সনের শুরুতে ব্যবসায়ীদের হালখাতা প্রচলন ধীরে ধীরে রেওয়াজে পরিণত হয়। তবে বাঙালি সমাজে নববর্ষকে নাগরিক মোড়কে নানা রঙে উৎসবের ডামাডোলে গ্রহণের রেওয়াজ সাম্প্রতিক। বাঙালির জীবনের বিশেষত ঢাকার নাগরিক সমাজে নববর্ষ বরণের প্রসঙ্গ এলেই প্রভাতে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ সংগীতের কথা আসে। ছায়ানটের বর্ষবরণে শুরুর সময়ে ১৯৬৪, ১৯৬৫, ১৯৬৭ সালের দাবি আছে। তবে ড. সন্জিদা খাতুনের লেখার তথ্য হলো, ‘১৯৬৭ সালের ১৫ এপ্রিল শনিবার ছিল পয়লা বৈশাখ। অবজারভার ১৪ তারিখের কাগজে নতুন বছরকে আবাহন করেছে- welcome pahela Baishakh শিরোনামে। সে বছর দেশের নানা অঞ্চল থেকে বর্ষবরণের খবর আসে ঢাকায়। প্রত্যুষে ছায়ানটের অনুষ্ঠান, এ বছরেই প্রথম রমনার বটমূলে। 

অবজারভার পত্রিকা পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপনের ছবি ছাপে। এতে দেখা যায় হার্মোনিয়ামে আছে শাহীন আক্তার, তানপুরা বাজিয়ে গান গাইছেন মাহমুদুর রহমান মাহমুদ (বেনু)। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ১৯৬৭ সালের নববর্ষে শহিদ মিনার থেকে প্রভাতফেরি শুরু করেছিল।’

পয়লা বৈশাখে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎসবের আয়োজন নগরের গণ্ডি পেরিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে নববর্ষে যে বাঙালিয়ানা পরিচয়ে প্রকাশিত- আমরা সারা বছর সেই ভাবনা ও চর্চা থেকে দূরে থাকি। ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটের মঙ্গল শোভাযাত্রার মঙ্গল কামনায় মানুষের ঢল আমাকেও তাড়িত করে। কিন্তু প্রতিদিন আটপৌঢ়ে বাঙালি জীবনচর্চার মেলবন্ধন থেকে আমাদের সরে যাওয়া কাঙ্ক্ষিত নয়। মাঝে মাঝে সর্বস্তরে বাংলার প্রচলনে সরকার কিছু নির্দেশনাও জারি করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা অনেকটাই দূরে থাকে। আমরা বাংলা দিন তারিখ এমনকি অনেক সময় মাসের নামও মনে রাখি না। 

শুধুই নববর্ষে বাঙালির হাজার বছরের লৌকিক আচারকে প্রতীকীরূপে ধারণ ও পালন করা নববর্ষের তাৎপর্য হতে পারে না। নববর্ষের নানা রঙের সঙ্গে মিশে আছে অসাম্প্রদায়িক বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য। ধর্ম ও সংস্কৃতিভেদে আমাদের জাতিগত ইতিহাসের পথ পরিক্রমণের সমন্বয়সূত্র। নববর্ষের নব আভায় আমাদের প্রাচীন ইতিহাসের শিকড়ের অনুসন্ধান প্রয়োজন।

বাংলা নববর্ষের উৎসবের পরিবর্তনে আমাদের গ্রামবাংলার নববর্ষের মেলাগুলোর রূপান্তর সবচেয়ে বেশি। গ্রাম্য নববর্ষের মেলায় কিছুদিন আগেও বাতাসা, কদমা, চিনির সাজ, জিলাপি, তিলের খাজা, গজা, ঝুরি, ইত্যাদি ছিল অন্যতম উপকরণ। এ ছাড়া গ্রামীণ জীবনের প্রয়োজনীয় সব উপকরণ যেমন- চাষের লাঙল, জোঁয়াল, মই, ডালা, ঢেঁকি, চালুন, কুলা, শীতলপাটি ইত্যাদি পাওয়া যেত। এখন গ্রাম্য মেলায় শহরের জিনিসপত্র বেশি দেখা যায়। লোকজ বাংলার গ্রাম্য মেলার উপকরণগুলো আস্তে আস্তে উধাও হয়ে যাচ্ছে।

গ্রাম্য মেলাগুলোর চিরায়ত রূপ পরিবর্তন বৈশাখী নববর্ষের রূপের সঙ্গে বড়ই অপরিচিত। বাঙালির বর্ষবরণের অসাম্প্রদায়িক চেতনার খবর ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। এখন শুধু চর্চা ও চেতনায় প্রয়োজন বাঙালিয়ানা ধারণ ও লালন করার বছরব্যাপী প্রত্যয়ের। তবেই আমাদের পথচলায় প্রকাশ পাবে নববর্ষের বাঙালির জাতিসত্তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের।

নববর্ষের উৎসবের শেকড়ের সন্ধান যেমন ছিল একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতির নবায়ন ও নিরন্তর যাত্রার উপলক্ষ ছিল আজ নববর্ষের উৎসবের মোড়কি রূপ আরও ঝকমকে হয়েছে- কিন্তু কমেছে ভূমিজ সংস্কৃতির কর্ষণের উত্তাপ। তাই আজও মনোজমিনে হারিয়ে খুঁজি শৈশবের নববর্ষের ‘মদনার মার’ মেলার কাঁচাগোল্লা ও মাটির খেলনা।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক

রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০৩ পিএম
রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

বাংলাদেশ অপূর্ব ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ দেশের প্রকৃতির রূপ-রসের বদল ঘটে। হাজার বছর ধরে চক্রাকারে এ বদল ঘটে আসছে। কীভাবে এবং কেমন করে এ বদল ঘটে- তার স্বরূপটি ধরা আছে আমাদের হাজার বছরের সাহিত্য ও সংগীতে। বাংলা সাহিত্যের পাঠক মাত্রই তা জানেন। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে প্রকৃতির চালচিত্র ছিটাফোঁটা থাকলেও মধ্যযুগের সাহিত্যে বিধৃত হয়েছে। কালকেতু উপাখ্যানে ফুল্লরার বারোমাস্যায় সব ঋতুরই বিবরণ আছে। বৈষ্ণব-পদাবলিতে ঋতুবদলের সঙ্গে প্রকৃতির রূপের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। রাধার প্রেমানুভূতির নানামাত্রিক প্রকাশও অনেকটা ঋতুসাপেক্ষ। বাংলা আধুনিক সাহিত্যে মানব জীবনের অনুষঙ্গে এ দেশের ঋতু ও প্রকৃতির উপস্থিতি কোনো কোনো সাহিত্যিক অবিস্মরণীয় করে রেখেছেন; এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, জসীম উদদীন, বন্দে আলী মিয়া প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায়। এমনকি তিরিশোত্তর আধুনিক কবিদের মুখ্যজন জীবনানন্দ দাশ হেমন্ত ঋতুকে বাংলা সাহিত্যে চিরস্থায়ী করে গেছেন।

রবীন্দ্রনাথ তার নানাবিধ সৃজনকর্মে- বিশেষত কাব্য, নাটক, ছোটগল্প, সংগীত, চিঠিপত্র ইত্যাদি রচনায় বাংলার ঋতুভিত্তিক প্রকৃতির রূপ-সৌন্দর্য চিত্রিত রেখেছেন। তিনি গীতবিতানের গানগুলোর বিষয়ভিত্তিক যে বিন্যাস করেছেন তাতে প্রকৃতি পর্যায়ের ২৮৩টি গান আছে। এ ছাড়া গীতবিতানের প্রেম ও প্রকৃতি পর্যায়ের গান এবং  গীতিনাট্যের কিছু গানেও প্রকৃতির প্রসঙ্গ লক্ষণীয়। 

রবীন্দ্রনাথ রচিত, আমাদের বাল্যকালে স্কুলপাঠ্য, সেই অবিস্মরণীয় (সহজপাঠ, প্রথম ভাগ, প্রকাশকাল: বৈশাখ ১৩৩৭) কবিতা ‘আমাদের ছোট নদী’। এর প্রথম দুটি পঙ্‌ক্তি বাঙালি-পড়ুয়া মাত্রই স্মরণ করতে পারেন: ‘আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে,/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে।’ কবিতাটির দ্বিতীয় পঙ্‌ক্তিতেই ‘বৈশাখ’ মাসের উল্লেখ আছে। এ কবিতায় বৈশাখের প্রকৃতি-পরিবেশ কবি পঙ্‌ক্তিবদ্ধ করেছেন। বৈশাখের রুক্ষতা, দাবদাহ, প্রায় জলশূন্য হাঁটুজলের নদী এবং এরকম অনুষঙ্গে যে জঙ্গম মানবজীবন তারই চালচিত্র রয়েছে রচনাটিতে। বাঙালি কিশোর-কিশোরীর চিরকালীন দুরন্ত ছেলেবেলার চিত্র পাই বৈশাখের হাঁটুজলের নদীর বিবরণে: ‘তীরে তীরে ছেলেমেয়ে নাহিবার কালে/ গামছায় জল ভরি গায়ে তারা ঢালে।/ সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে/ আঁচলে ছাঁকিয়া তারা ছোটো মাছ ধরে।’

বাংলা নববর্ষ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতা ‘নববর্ষে’। কবিতাটি চিত্রা কাব্যের অন্তর্ভুক্ত। এর রচনাকাল পয়লা বৈশাখ ১৩০১। প্রত্যক্ষভাবে বৈশাখের কথা উল্লেখ না করলেও মূলত বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে (বৈশাখের প্রথম দিন) কবির উপলব্ধি কী তা অভিব্যক্ত হয়েছে এভাবে: ‘আমি আজি ধূলিতলে এ জীর্ণ জীবন/ করিলাম নত।/ বন্ধু হও, শত্রু হও,/ যেখানে যে কেহ রও,/ ক্ষমা করো আজিকার মতো/ পুরাতন বর্ষের সাথে/ পুরাতন অপরাধ যত।’ কিন্তু নববর্ষের শুভলগ্নটি কবির কাছে আনন্দবেদনা মিশ্রিত: ‘এসো এসো নতুন দিবস/ ভরিলাম পুণ্য অশ্রুজলে/ আজিকার মঙ্গলকলস।’ 

রবীন্দ্রনাথের কল্পনা কাব্যের অন্তর্ভুক্ত ‘বৈশাখ’ শিরোনামের কবিতাটি বেশ জনপ্রিয়। রচনাকাল ১৩০৬। বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান এ কবিতাপাঠ ছাড়া যেন সম্পন্ন হয় না। বাংলা মাসগুলোর মধ্যে বৈশাখ মাসের যে স্বতন্ত্রতা রয়েছে তা এ কবিতা পাঠে সুস্পষ্ট হয়। বৈশাখ দিয়ে বাংলা নববর্ষের সূচনা। এ মাসটির বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন: ‘হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ।/ ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল,/ তপ্তঃক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষাণ ভয়াল/ কারে দাও ডাক/ হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ।’ বৈশাখ যে রুদ্র কালবৈশাখী নিয়ে আসে তার ভয়ংকর রুদ্ররূপ রবীন্দ্রনাথ তুলে ধরেন: ‘কী ভীষ্ম অদৃশ্য নৃত্যে মাতি উঠে মধ্যাহ্ন-আকাশে/ নিঃশব্দ প্রখর/ ছায়ামূর্তি তব অনুচর!’ কেবল তো ঝড়ঝঞ্ঝা নয়, বৈশাখের তীব্র দাবদাহও রয়েছে। কবি বৈশাখের মধ্যে প্রবল শক্তির উন্মত্ততাও প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তাকে আবাহন করছেন: ‘দুঃখ সুখ আশা ও নৈরাশ/ তোমার ফুৎকারক্ষুব্ধ ধুলা-সম উড়ুক গগনে...।’ বৈশাখের শুধু শক্তিমত্ততা প্রত্যক্ষণ নয়, কবির প্রত্যাশা: ‘হে বৈরাগী করো শান্তি পাঠ/ উদার উদাস কণ্ঠ যাক ছুটে দক্ষিণে ও বামে,/... পূর্ণ করি মাঠ।/ হে বৈরাগী করো শান্তি পাঠ।’

বৈশাখ কেবল ‘ভৈরব’ ও ‘রুদ্র’ রূপের জন্য কবির কাছে আগ্রহের মাস নয়। এ মাসেই তার জন্মের শুভক্ষণ। তাই পঁচিশে বৈশাখ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যেমন কবিতা লিখেছেন তেমনি অবিস্মরণীয় গানও রচনা করেন। কবিতাটি পূরবী কাব্যের অন্তর্ভুক্ত ‘পঁচিশে বৈশাখ’ (রচনা ২৫ বৈশাখ ১৩২৯)। জন্মদিন নিয়ে কবির উচ্ছ্বাস-আনন্দ এবং কৌতূহল: ‘রাত্রি হল ভোর।/ আজি মোর/ জন্মের স্মরণপূর্ণ বাণী,/ প্রভাতের রৌদ্রে-লেখা লিপিখানি/ হাতে করে আনি/ দ্বারে আসি দিল ডাক/ পঁচিশে বৈশাখ।’  কবি উপলব্ধি করেন তার জন্ম দিবসটি ‘নানা বেশে ফিরে আসে ধরণীর পরে’। তাই দিবসটির একটিমাত্র তাৎপর্য নয়। প্রতি বছর ফিরে আসা ‘পঁচিশে বৈশাখ’ চির এক নতুনকে নিয়ে এসে কবির জন্মদিনকে ভিন্নতর তাৎপর্য দেয়। তিনি লক্ষ করেন: ‘এই দিন এলো আজ প্রাতে/ যে অনন্ত সমুদ্রের শঙ্খ নিয়ে হাতে,/ তাহার নির্ঘোষ বাজে/ ঘন ঘন মোর বক্ষোমাঝে।/ জন্ম-মরণের দিগ্বলয়-চক্ররেখা জীবনেরে দিয়েছিল ঘের,/ সে আজি মিলাল।’ জন্ম-মৃত্যুর অনিবার্যতা জীবনকে রুদ্ধ করেছিল- তা নতুন জন্মদিনের কাছে পরাভূত হলো। আর তখন নতুন এক পঁচিশে বৈশাখ ‘শুভ্র আলো/ কালের বাঁশরি হতে উচ্ছ্বসি যেন রে/ শূন্য দিল ভরে।’ প্রতিবার পঁচিশে বৈশাখ কবির কাছে ফিরে এসে কেবল তার শূন্যতা দূর করে তা নয়, পূর্ণতাও দান করে ‘শুভ্র আলো’ দিয়ে। জন্মদিনে কবির উপলব্ধি: ‘আলোকের অসীম সঙ্গীতে/ চিত্ত মোর ঝংকারিছে সুরে সুরে রণিত তন্ত্রীতে।’

বৈশাখ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বেশকিছু গানও রচনা করেছেন। সবচেয়ে জনপ্রিয় গানটি হলো: ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো।’ বৈশাখকে আবাহন করে এ গান রচনা করেন ২০ ফাল্গুন ১৩৩৩ শান্তিনিকেতনে। মূলত শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই কবি ঋতুভিত্তিক আনুষ্ঠানিক-সংগীত রচনা শুরু করেন। সারা বছরজুড়ে শান্তিনিকেতনে ঋতুভিত্তিক উৎসবের সূচনা হয়। এর মধ্যে নববর্ষবরণ, বর্ষামঙ্গল, পৌষ মেলা ও উৎসব, শারদোৎসব এবং বসন্ত উৎসব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া বৃক্ষরোপণ ও হলকর্ষণ উৎসব এবং কবির জন্মদিন উপলক্ষে পঁচিশে বৈশাখ উদ্‌যাপনও ছিল। ঋতু-অনুষ্ঠানের জন্যই রবীন্দ্রনাথ বৈশাখ নিয়ে কিছু গান রচনা করেন। ‘এসো হে বৈশাখ’ গানে বৈশাখকে মঙ্গলসূচক বার্তা নিয়ে আসার আহ্বান কবির: ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো/ তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।’ বৈশাখের যে রুদ্রতা, রুক্ষতা এবং শক্তির উগ্রতা- তার মধ্যেও কবি কল্যাণ লক্ষ করেন: ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জ্বরা,/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ বৈশাখ প্রলয়ের শাঁখ বাজিয়ে জীবনের ‘মায়ার কুজ্ঝটিজাল’কে ছিন্ন করবে- তবেই তো আসবে জীবনে নতুন ও শুভ বার্তা।

বৈশাখ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের আরও কয়েকটি গান যেমন: ‘ওই বুঝি কালবৈশাখী’, ‘বৈশাখ হে মৌনী তাপস কোন অতলের বাণী’, ‘নমো নমো হে বৈরাগী’, ‘হৃদয় আমার, ওই বুঝি তোর বৈশাখী ঝড় আসে’, ‘বৈশাখের এই ভোরের হাওয়া আসে মৃদুমন্দ’, ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো, তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে’ ইত্যাদি। এ ছাড়া বৈশাখ বা গ্রীষ্ম ঋতুর বিশেষত্ব নিয়ে কিছু গান রচিত হয়েছে; এতে বৈশাখের প্রখরতা, শুষ্কতা, ‘দুঃসহ তাপ বহ্নি’, ‘রুদ্রবাণী’ ইত্যাদি প্রকাশ পেয়েছে। ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো, তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে’ গানটিতে কবি নিজেকে ‘বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন’-এর সঙ্গে উপমায়িত করেন। এরকম আরেকটি গান: ‘প্রখর তপনতাপে, আকাশ তৃষায় কাঁপে, বায়ু করে হাহাকার।’ প্রকৃতির মধ্যে আকাশের তৃষ্ণা, বায়ুর হাহাকার ইত্যাদি বিদ্যমান। কিন্তু এই তৃষ্ণা ও হাহাকার কবির নিজেরই- তা তিনি প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে তবেই উপলব্ধি করতে পারেন।

রবীন্দ্রনাথ যেমনটি নিজের জন্মদিন ‘পঁচিশে বৈশাখ’ উপলক্ষে কবিতা রচনা করেন, তেমনই নিজের জন্মদিনের গানও লিখেছেন। বিখ্যাত গানটি: ‘হে নূতন,/ দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।’ কবির মৃত্যুর কয়েক মাস আগে ২৩ বৈশাখ ১৩৪৮-এ গানটি রচিত। তার জীবদ্দশায় শেষ জন্মদিনে গানটি গাওয়া হয়। দেশ-বিদেশে উদ্‌যাপিত রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন এ গান ছাড়া সম্পূর্ণতা পায় না। এ গানের অবিস্মরণীয় ভাবৈশ্বর্য লক্ষণীয়। নিজের জন্মদিনের প্রসঙ্গ গানটিতে উল্লেখ থাকলেও তা রচনাকৌশলের কারণে ব্যক্তি প্রসঙ্গ ছাপিয়ে নৈর্ব্যক্তিক হয়ে উঠেছে: ‘ব্যক্ত হোক জীবনের জয়/ ব্যক্ত হোক তোমামাঝে অসীমের চিরবিস্ময়।... চির নূতনেরে দিল ডাক/ পঁচিশে বৈশাখ।’ এ গানে প্রতিটি মানবশিশুর জন্মকে স্বাগত জানানো হয়েছে। এভাবে সসীম জীবনের মধ্যে অসীমের প্রকাশঘটান কবি। নিজের জন্মদিনের শুভক্ষণের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ প্রতিটি মানবশিশুর জন্মের চির নতুনত্ব খুঁজে পেয়েছেন। 

রবীন্দ্রনাথ বাংলার ষড়ঋতু ও বারো মাসের অনুষঙ্গ নিয়ে কিছু না কিছু লিখেছেন। সঙ্গত কারণেই বৈশাখ নিয়েও কবির সবিশেষ কৌতূহল ছিল। মানবচরিত্র এবং মানস গঠনে প্রকৃতি-প্রতিবেশ ও পরিবেশের ভূমিকা প্রশ্নাতীত। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেশ ও পরিবেশের যে পরিবর্তন ঘটে তার প্রভাব কোনো সংবেদনশীল মানুষ এড়িয়ে যেতে পারে না। রবীন্দ্রনাথও তা এড়াতে পারেননি। আমরা তার বিবিধ রচনায় প্রতিবেশ-পরিবেশের অনুষঙ্গে নানা তাৎপর্যে ঋতুকথন লক্ষ করি। তেমনি ‘বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন’ অথবা ‘বৈশাখ হে মৌন তাপস’ এমন শিল্পিত করে বৈশাখ-বন্দনা আমাদের প্রকৃতির আরও নৈকট্যে নিয়ে যায়।

লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

ফিরে আসে বৈশাখ

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪৪ এএম
আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৩ পিএম
ফিরে আসে বৈশাখ
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

‘হ্যালো পুকি, তোমাকে তো সেই লাগতেছে। পুরাই মাথা নষ্ট! ঘটনা কী?’ বলে রিমেল লাফ দিয়ে উঠল।
আজ পযলা বৈশাখ। চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে নববর্ষের শোভাযাত্রা বের হবে। রিমেল, নাইরা, নাহিয়ান, রুনটি, বিনি দাঁড়িয়ে আছে চারুকলার গেটে। তারা এই শোভাযাত্রা সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ করবে।
মাথায় বেলিফুলের কুঁড়ির গাজরা একপাশে সরিয়ে নাইরা বলল, ‘নো ক্যাপ! ভুলভাল বলবে না। আমি ফ্লেক্স করতেছি না। অতিরিক্ত কিছুই করিনি। এইটা বৈশাখের ট্রাডিশনাল সাজ।’
বিনি কনুই দিয়ে রিমেলকে ধাক্কা দিয়ে নাইরাকে বলল, ‘বেসড। কুল ড্রিপ! কোত্থেকে কিনেছ এটা?’
বিনির কথার উত্তর দিতে না দিয়ে রিমেল নাইরার চারপাশে এক পাক ঘুরে এসে বলল, ‘তোমার গ্লো-আপে আমি মুগ্ধ! যত যাই বলো, তুমি হইতেছ গোট।’
হাতের ভিডিও ক্যামেরার লম্বা স্টিট এগিয়ে রিমেলকে গোঁতা দিয়ে নাইরা বলল, ‘পুরাই স্কিবিডি। কী সব বোকাবোকা কথা বলতেছিস!’
রিমেলের কাঁধে চাপড় দিয়ে নাহিয়ান বলল, ‘এইটা কী করলা, ব্রাহ! ব্যাপার বুঝতেছি না। তুই আজ নাইরার জন্য এত সিম্পিং দিতেছিস! নাইরা তো তোরে পাত্তাই দেয় না!’
বলে নাইরার দিকে ঘুরে বলল, ‘ইফ ইউ নো, ইউ নো, তোকে সাস লাগতেছে।’
নাইরা মনে হলো নাহিয়ানের কথায় খানিক লজ্জা পেয়েছে। চোখ সরিয়ে বলল, ‘সর সর। ওপাশে সরে দাঁড়া। শোভাযাত্রা আসতেছে।’
চারুকলা থেকে নববর্ষের শোভাযাত্রা শুরু হয়েছে। বাংলা সংস্কৃতির পরিচয় নিয়ে নানা প্রতীকী ফেস্টুন, সঙ্গে বিভিন্ন রঙের মুখোশ আর প্রাণীর প্রতিকৃতি নিয়ে হাজার হাজার মানুষ আনন্দ করতে করতে এগিয়ে আসছে। ঢোল বাঁশি করতাল বাজিয়ে কেউ গান গাইছে, কেউ নাচছে। এ এক অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য!
ছোট্ট ভিডিও ক্যামেরা ওপরে তুলে নাইরা বলল, ‘হ্যাপি পয়লা বৈশাখ ফ্রম ঢাকা।’
নাইরার বয়স বাইশ বছর। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিডিয়া স্টাডিজের স্টুডেন্ট। কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে বেশ নাম করেছে। বিশেষ করে বাংলা সংস্কৃতি, ঋতু, উৎসব নিয়ে তার রিল, শর্ট ভিডিও, লাইভ সবকিছুতে এক ধরনের কাব্যিক সততা আছে। বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে সে আবেগের আন্তরিকতা আর অকৃত্রিমতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। যা গ্লোবাল ইয়াং অডিয়েন্সের কাছে দারুণ জনপ্রিয়।
ক্যামেরা ঘুরিয়ে নাইরা বিশাল শোভাযাত্রার বাঘের মুখোশ, রঙিন পেঁচা, মাছ, সূর্য, মুখে আলপনা আঁকা তরুণ-তরুণীদের দেখাতে দেখাতে বলল, ‘টুডে উই ডোন্ট জাস্ট সেলিব্রেট এ নিউইয়ার। উই ট্রাই টু রিমেম্বার হু উই আর।’
লাইভ শেষ হয়েছে। নাইরাকে বিস্মিত করে দিয়ে ঘণ্টাখানেকের ভেতর লাইভ ভাইরাল হয়ে গেল। লাইভ ভাইরাল হওয়ার বিশেষ কারণ আছে। লিও নাকামুরা লাইভে যুক্ত হয়ে মন্তব্য করেছে। লিও নাকামুরা হচ্ছে বিশ্বে আলোচিত তরুণ লেখক-সংগীতশিল্পী। বয়স সাতাশ বছর। তার মা জাপানি আর বাবা ব্রাজিলিয়ান। সে বড় হয়েছে লন্ডনে। লিও-র লেখা উপন্যাস আর ইন্ডি মিউজিক তরুণ প্রজন্মের কাছে নিঃসঙ্গতা আর কিছু না বলা প্রেমের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
নাইরার লাইভে মন্তব্য করে লিও লিখেছে, ‘হাউ ডু ইউ রিমেম্বার হু ইউ আর, ইফ দ্য ওয়ার্ল্ড কিপস টার্নিং ইউ ইনটু কনটেন্ট?’
অনেকখানি সময় নিয়ে নাইরা তাকিয়ে ছিল স্ক্রিনের দিকে। তার কাছে মনে হলো পুরো পৃথিবী যেন থমকে গেছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই। দীর্ঘ নিস্তব্ধতার ভেতর দিয়ে সে গহিন কুয়ায় নেমে যাচ্ছে। কেউ একজন তার একান্ত ভেতর থেকে কথাগুলো বলে উঠেছে। নাইরা উত্তরে লিখল, ‘মেবি বাই ফাইন্ডিং ওয়ান পারসন হু সিজ ইউ বিহাইন্ড দ্য স্ক্রিন।’
সেই শুরু। নাইরাকে অবাক করে দিয়ে লিও ইনবক্সে লিখল, ‘তোমাদের নববর্ষের শোভাযাত্রা নিয়ে তোমার কাছ থেকে আরও কিছু জানতে চাই।’
যতটুকু লিখবে ভেবেছিল নাইরা তার কিছুই সে লিখতে পারছে না। লিখতে গিয়ে তার হাত কাঁপছে। সে যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না বিশ্বখ্যাত একজন মানুষ লিও নাকামুরা তার সঙ্গে চ্যাট করছে। এটা লিও-র ভেরিফায়েড পেজ। তাছাড়া এর ভেতর সে দুবার ভিডিও কলে এসেছে নাইরার সঙ্গে কথা বলতে।

নাইরা তাকে লিখল, ‘আমাদের দেশ একসময় স্বৈরশাসকের কবলে আটকে ছিল। তখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ স্বৈরশাসন হটানোর অঙ্গীকার নিয়ে আর শান্তির বিজয় প্রত্যাশায় চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বৈশাখের শোভাযাত্রা শুরু করে।’
লিও বলল, ‘তুমি শোভাযাত্রার কালারফুল দিক নিয়ে বলো। এই যে নানা ধরনের মুখোশ, সাজসজ্জা।’
নাইরা বুঝতে পারল লিও খুব সচেতনভাবে শোভাযাত্রার পলিটিক্যাল ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতে চাইছে। নাইরা লিখল, ‘আমাদের বর্ষবরণের শোভাযাত্রায় ট্যাপা পুতুল, নকশি পাখি, হাতি, বাঘ, কুমির, লক্ষ্মী পেঁচা, ঘোড়াসহ অনেক ধরনের মুখোশ থাকে। এগুলো সবই অপশক্তির বিনাশ আর শুভকামনার প্রতীক।’

লিও লিখল, ‘অপশক্তির বিনাশ মানে তো অপদেবতা থেকে মুক্ত থাকা!’
নাইরা খুব স্পষ্টভাবে বলল, ‘আমাদের নববর্ষের শোভাযাত্রা হচ্ছে অগণতান্ত্রিক শক্তির বিনাশের প্রতিজ্ঞা।’
লিও খানিক থমকে গেছে। সে কথা ঘুরিয়ে বলল, ‘বাংলাদেশ অনেক সুন্দর শুনেছি। সবচেয়ে সুন্দর বাংলাদেশের মানুষ। তারা নরম মনের। নরম মাটি দিয়ে বানানো।’
নাইরার হাসি পাচ্ছে। কিশোর বয়সে প্রেমে পড়লে ছেলেরা যেভাবে প্রেমিকাকে ইমপ্রেস করতে চায়, লিও সেরকম কথা বলছে। নাইরা বলল, ‘তুমি বাংলাদেশে এসো। মুগ্ধ হয়ে যাবে। চারপাশে কেবল সবুজ। তাকালে চোখে আরাম লাগে। সবকিছু ন্যাচারাল। আর্টিফিশিয়াল কিছু নেই।’
লিও বলল, ‘যাব নিশ্চয়। তবে কি জানো, আমার কাছে পৃথিবীর সব শহর একইরকম লাগে। এয়ারপোর্ট, হোটেল, স্টেজ, ইন্টারভিউ। একটা দেশের সকাল, আরেকটা দেশের রাতের সঙ্গে মিশে যায়।’
নাইরা সতর্কভাবে লিও-র কথা বোঝার চেষ্টা করছে। দেশ নিয়ে কোনো কথা বলার সময় নাইরা বিশেষ সতর্ক থাকে। সে কখনো চায় না ভুলভাবে বাংলাদেশ কোথাও উপস্থাপিত হোক। নাইরা বলল, ‘তবে এখানে প্রতিদিনের সকাল কখনো একরকম হয় না। প্রত্যেকটা দিন, প্রত্যেক বছর আমাদের কাছে নতুন কোনো সম্ভাবনা নিয়ে আসে।’
তার পর নদীর ঢেউয়ের মতো কথার পিঠে কথা ভেসে আসতে থাকল। দেশ থেকে শহর। শহর থেকে ঘর। ঘর থেকে একে একে নিজেদের কথার ভেতরের কথা চলে এল। সেই সময় লিও লেখক মনের কল্পনা মিশিয়ে নাইরাকে বড় এক ম্যাসেজ পাঠিয়েছে। লিও লিখেছে, ‘নাইরা, তোমাকে ঠিক কতটা পছন্দ করি জানো? বসন্তের এক সকালে চেরিফুলের বাগান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখন তোমাকে দেখলাম। মনে হলো, আমার বুকের ভেতর একটা ছোট ঘড়ি ছিল, যা এতকাল বন্ধ হয়ে পড়ে ছিল- আচমকা তোমার হাসির শব্দে সেই ঘড়ি আবার টিকটিক করে চলতে শুরু করেছে।
তুমি যখন আমার হাত ধরলে, তখন মনে হলো আমার চারপাশের বিশৃঙ্খল পৃথিবীটা অমনি ভীষণ শান্ত আর পরিপাটি হয়ে গেল। আমি হিমালয় জয়ের কথা বলছি না। আমি বলছি সেই সহজ আনন্দের কথা- যখন আমরা পাশাপাশি বসে কফি খাই আর কোনো কথা না বলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে পারি।
ভালোবাসার সংজ্ঞা আবিষ্কার করেছি। আমার কাছে ভালোবাসা মানে হলো তোমার গভীর দুই চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারা, আমি ঘরে ফিরে এসেছি। তুমি আছ বলেই সকালের রোদ এত মিষ্টি লাগে, আর রাতের আকাশ এত বেশি রহস্যময় মনে হয়। তোমাকে ভালোবাসা মানে কোনো বড় উৎসব নয়, বরং প্রতিদিন একটু একটু করে তোমার মাঝে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়া।’
নাইরার মনে হচ্ছে দম বন্ধ হয়ে আসছে। তার গলার ভেতর কিছু আটকে গেছে। সেখানে ব্যথা করছে। ঝুম ভালোবাসার স্পর্শে ভেসে যেতে যেতে নাইরা থমকে দাঁড়াল। এখন অনেক কাজ। লিও এক ইন্টারন্যাশনাল স্ট্রিমিং প্লাটফর্মের জন্য সিরিজ লিখছে। সেখানে সে দক্ষিণ-এশিয়ার উৎসব আর তরুণদের প্রেমকে মুখ্য করে এনেছে। নাইরার কাজ হচ্ছে বাংলার সংস্কৃতি, উৎসব, লোককথা মিলিয়ে ভিডিও ক্লিপস পাঠানো।
খুবই এক্সাইটেড নাইরা। তার মনে হচ্ছে বাংলা সংস্কৃতিকে সে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিচ্ছে ভীষণ যত্ন করে।
নাহিয়ান এসেছে। তাকেও ভীষণ অস্থির দেখাচ্ছে। সে খানিক রাগি গলায় বলল, ‘তুই কি জানিস নেট দুনিয়ায় তোকে কীভাবে পচানো হচ্ছে! লিও একজন গ্লোবাল সেলিব্রেটি। তার সঙ্গে তুই পেঁচিয়েছিস!’
নাইরা কিছু জানে না। লিও তাকে কিছু বলেনি। কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। নাহিয়ান বলল, ‘তোর ছবি দিয়ে লিখেছে, লিও’স নিউ গার্ল? হু ইজ দ্য বেঙ্গলি ক্রিয়েটর? ইজ শি ক্লাউট চেজিং? তুই কি সত্যি তোর সস্তা পাবলিসিটি পেতে এটা করছিস?’
নাহিয়ানের কথা পাত্তা দিল না নাইরা। জরুরি কাজ সব গুছিয়ে সময়মতো লিওকে পাঠিয়েছে। লিও বলল, ‘দেখো নাইরা, গ্লোবাল অডিয়েন্স বৈশাখের পলিটিক্যাল হিস্ট্রি, অসাম্প্রদায়িকতা বলো বা ধর্মনিরপেক্ষতার লড়াই, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ঠিক খাবে না। এগুলো বাদ দিয়ে ভিডিও বানাও।’
পুরোপুরি হতবাক হয়ে গেছে নাইরা। সে বলল, ‘নববর্ষের শোভাযাত্রা কোনো খাবার নয় যে পাবলিক খাবে। তাছাড়া নববর্ষের শোভাযাত্রা থাকবে, তাতে প্রতীকী প্রতিবাদ থাকবে না, রবীন্দ্রসংগীত থাকবে না, ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার থাকবে না, লাল-সাদার ইতিহাস থাকবে না। শোভাযাত্রা দেখানো হবে শুধু বৈশাখের কালারফুল এক্সোটিক ফেস্টিভ্যাল বানিয়ে- তা সম্ভব নয়। আমি সেটা করব না। তুমি বুঝতে পারছ, এটা শুধু আমাদের উৎসব নয়, আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস!’
লিও লিখল, ‘বুঝতে পারছি। কিন্তু এটাকে যদি সহজ না করি কেউ দেখবে না।’
নাইরা বুঝতে পারল সে ভুল মানুষকে পছন্দ করেছে। লিও-র সঙ্গে সব রকমের যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। অনেকদিন পর লিও-র এক ম্যাসেজের রিপ্লাই দিয়েছে নাইরা। লিও লিখেছে, ‘কখনো কখনো টিকে থাকতে সত্যকে বদলে ফেলতে হয়।’ 
নাইরা লিখল, ‘যে মানুষ সত্য বদলে টিকে থাকে, সে আর মানুষ থাকে না।’

সেদিন থেকে তাদের আর কখনো যোগাযোগ হয়নি।
অনেকদিন বাদে লিও ম্যাসেজ পাঠিয়েছিল, ‘তুমি বলেছিলে আমাদের একে অপরকে মনে রাখা উচিত। কথা দিচ্ছি, তোমাকে কখনো ভুলে যাব না। এমনকি পুরো পৃথিবী যদি আমাদের ভুলে যায়, তবুও তোমার হাত ধরে থাকব। নিজের খেয়াল রেখো। তোমার জন্য আমার ভালোবাসা সবসময় একইরকম থাকবে।’
নাইরা সে ম্যাসেজের কোনো উত্তর দেয়নি।
পরের বৈশাখের শোভাযাত্রায় নাইরা লাইভ করল না। সে বসে আছে চারুকলার পুকুরপাড়ে। তার মন প্রচণ্ড ভার হয়ে আছে। আজ কেন তার এত বেশি খারাপ লাগছে বুঝতে পারছে না। 
লিও বাংলাদেশে এসেছে। এই খবর নাইরা জানে না। লিও ঠিক নাইরাকে খুঁজে বের করেছে। চারুকলার পুকুরপাড়ে লিও-র সামনে নাইরা দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কথা বলতে পারছে না। তার সব কথা যেন গলার ভেতর আটকে গেছে।
লিও বলল, ‘ভেবেছিলাম ভালোবাসা মানে তোমাকে না হারানো। পরে বুঝেছি ভালোবাসা মানে তোমার সেই ভাবনাগুলোকে হারিয়ে যেতে না দেওয়া, যা তোমাকে ‘তুমি’ করে গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের সংগ্রামের ইতিহাস আর সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের কথা দিয়েই নতুন সিরিজ লিখেছি। সেটা স্ট্রিমিং হবে।’
কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়েছে নাইরার ভেতর। কী বলবে বুঝতে পারছে না। তার সব এলোমেলো বোধ হচ্ছে। অস্পষ্ট গলায় বলল, ‘তুমি এসেছ!’
লিও বলল, ‘সব কাহিনি হাটে তোলার জন্য নয়, যে বিক্রি করব। কিছু ঘটনা কেবল সত্যভাবে বলার জন্য টিকে থাকে। বাংলাদেশের নববর্ষের শোভাযাত্রার মতো।’
বাতাস ছেড়েছে। তুমুল বাতাসে নাইরার লালপাড়ের সাদা শাড়ির আঁচল উড়ছে। সেই আঁচল ধরবে বলে লিও শিশুর মতো লাফিয়ে যাচ্ছে। বাতাসে শীতলভাব। কোথাও আকাশভাঙা বৃষ্টি নেমেছে।

শোভাযাত্রা

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৩ এএম
শোভাযাত্রা

ক্যালেন্ডারের পাতা বদলায়, বৃক্ষের রঙ বদলায়
শোভাযাত্রার নাম বদলায় 
জীবন বদলায় না। অন্ধকারে পেঁচা ও বাঁদুরেরা 
ঢের বেশি উৎপাত করে। 
 
শোভাযাত্রার নাম কী হবে- মঙ্গল না আনন্দ, না বৈশাখী
এই অহেতুক বিতর্কে মাতেন
সংস্কৃতির স্বঘোষিত মহাজনেরা। কিন্তু তারা জানেন না 
সেদিন অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে হাতের তুলিকে হাতিয়ার করেছিলেন কারা। 
কারা কলম ও সংগীতকে বানিয়েছিলেন অব্যর্থ মারণাস্ত্র। 
আর রমনার বটমূলে বর্ষবরণের আয়োজন কাদের হাতে
খুনের দরিয়া হয়েছিল? 
যুগে যুগে মানুষ যখন স্বৈরশাসক আর 
অন্ধকারের জীবদের ভয়ে নির্বাক ও নিশ্চল থাকে
তখন মাটির হাতি-ঘোড়া, শালিখ-ময়না সদর্পে মিছিলে হাঁটে
কথা বলে, বজ্রমুষ্ঠিতে কাঁপিয়ে তোলে আকাশ।
 
ক্ষমতার রঙ বদলায়, ক্যালেন্ডারের পাতা বদলায় 
জীবন বদলায় না।