‘দারিদ্র্য’ কবিতায় দারিদ্র্যের ব্যাপক-গভীর সংজ্ঞায়ন ঘটেছে। এ সংজ্ঞায়নটা জরুরি ছিল। তার লক্ষ্য দারিদ্র্যকে একটি সর্বমানবিক অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণনা করা। কেবল ব্যক্তি বা সমষ্টির অবস্থা নয়, দারিদ্র্য এখানে বিশ্ববিধানের অন্তর্গত-অন্তরঙ্গ উপাদান হিসেবেই উপস্থাপিত হয়েছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে তত্ত্বে অনূদিত করার জন্যই নতুন সংজ্ঞার দরকার হয়েছে।...
সিন্ধু-হিন্দোল (১৯২৭) কাব্যের ‘দারিদ্র্য’ কবিতাটি যে নজরুলের ব্যক্তিগত দারিদ্র্যের প্রত্যক্ষ পীড়নে রচিত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কবিতাটি রচিত হয়েছিল ২৪ আশ্বিন ১৩৩৩ বাংলা সন মোতাবেক ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বরে। তিনি তখন কৃষ্ণনগরবাসী। মুজফ্ফর আহমদ জানাচ্ছেন, কল্লোল পত্রিকার সম্পাদক দীনেশরঞ্জন দাস তার পত্রিকার জন্য কবিতা প্রার্থনা করে মানি-অর্ডারযোগে নজরুলের কাছে দশ টাকা পাঠিয়েছিলেন। নজরুল ‘দারিদ্র্য’ লিখে পাঠান। কল্লোলের অগ্রহায়ণ ১৩৩৩ সংখ্যায় কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ওই বছর ৮ সেপ্টেম্বর নজরুলের দ্বিতীয় ছেলে বুলবুল ওরফে অরিন্দম খালেদ জন্মগ্রহণ করে। কৃষ্ণনগরে বসবাসকালে বিশেষত বুলবুলের জন্মকালে নজরুলের গরিবি কী ভয়ানক হয়ে উঠেছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় তার অন্যতম প্রকাশক বর্মণ পাবলিশিং হাউসের ব্রজবিহারী বর্মণকে লেখা একটি পত্র থেকে: ‘স্নেহের ব্রজ! আজ সকাল ছয়টায় আমার একটি পুত্র সন্তান হয়েছে। তোমার বৌদি আপাততঃ ভাল আছে। আমিও আজ সকালে ফিরে এলাম যশোহর, খুলনা, বাগেরহাট, দৌলতপুর প্রভৃতি ঘুরে। টাকার বড্ড দরকার। যেমন করে পার পঁচিশটি টাকা আজই টেলিগ্রাফ মনি-অর্ডার করে পাঠাও। তুমি ত সব অবস্থা জান। বলেও এসেছি তোমায়। ভুলো না যেন। টাকা কর্জ করে পাঠাও।’ সাধারণভাবে জীবনীকারেরা কৃষ্ণনগরপর্বে নজরুলের আর্থিক সংকটের বিবরণ দিয়েছেন।
দেখা যাচ্ছে, আর্থিক গরিবির সাধারণ রূপ এবং স্ত্রী ও শিশুপুত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত বিশেষ রূপ ‘দারিদ্র্য’ কবিতায় প্রায় হুবহু ব্যবহৃত হয়েছে:
পারি নাই বাছা মোর, হে প্রিয় আমার,
দুই বিন্দু দুগ্ধ দিতে! -মোর অধিকার
আনন্দের নাহি নাহি! দারিদ্র্য অসহ
পুত্র হয়ে জায়া হয়ে কাঁদে অহরহ
আমার দুয়ার ধরি!
প্রবহমান অক্ষরবৃত্তের গতি আর নিখুঁত অন্তমিলের কার্যকর স্থিতির বিলাসিতার মধ্যেও এখানকার তথ্যটি খুব স্পষ্ট: সদ্যোজাত শিশুর জন্য দুধ কেনার পয়সা নেই। পরের পঙ্ক্তিতে নজরুল তার স্বভাবসুলভ অলঙ্কার-চাঞ্চল্যে স্ত্রী-পুত্রের অবস্থান পাল্টে দেন। খুব স্বাভাবিক কিন্তু কার্যকর এক ছবিতে খোদ দারিদ্র্যকে নিত্য আবিষ্কার করেন ঘরের দুয়ারে- স্ত্রী-পুত্র বেশে। এ হলো ‘দারিদ্র্য’ কবিতার আত্মজৈবনিক প্রেক্ষাপট।
‘দারিদ্র্য’ কবিতায় দারিদ্র্যের ব্যাপক-গভীর সংজ্ঞায়ন ঘটেছে। এ সংজ্ঞায়নটা জরুরি ছিল। তার লক্ষ্য দারিদ্র্যকে একটি সর্বমানবিক অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণনা করা। কেবল ব্যক্তি বা সমষ্টির অবস্থা নয়, দারিদ্র্য এখানে বিশ্ববিধানের অন্তর্গত-অন্তরঙ্গ উপাদান হিসেবেই উপস্থাপিত হয়েছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে তত্ত্বে অনূদিত করার জন্যই নতুন সংজ্ঞার দরকার হয়েছে।
দারিদ্র্যকে কবি তুলনা করেছেন অহঙ্কারী তপস্বীর সঙ্গে। এই রূপে তার কাজ রূপ-রস-প্রাণ হরণ করে অকালে শুকিয়ে ফেলা। সব সুন্দর হরণ করে শূন্য মরুভূমির বিকট অবয়ব চোখের সামনে তুলে ধরা। অনুভূত সুন্দরকে উপভোগের বা রূপায়ণের সম্ভাবনা এভাবে উধাও হয়ে যায়। তখন ‘আমার নয়ন/ আমারি সুন্দরে করে অগ্নি বরিষণ!’ দ্বিতীয় রূপে দারিদ্র্য কাঠুরিয়া হয়ে বিকাশমান কল্পলোকের ডালপালা নির্মমভাবে ভেঙে ফেলে। প্রকৃতির স্নিগ্ধ শিশিরবিন্দুর মতো যে করুণার উদয় হয় কবির অন্তরে, দারিদ্র্য ‘রবি’ হয়ে হরণ করে নেয় সেই ‘করুণা-নীহার-বিন্দু’। এই যে কাঠুরিয়ার কাজ আর ‘রবি’র কাজ- অহঙ্কারী তপস্বীর বৈশিষ্ট্য হিসেবেই দারিদ্র্য সে কাজগুলো করে। এই রূপে দারিদ্র্যের প্রভাব ব্যক্তিগত, যদিও সেই ব্যক্তি কবিই বটে। এই ব্যক্তি যা কিছু দেখতে চায়, যা কিছু হারায় বলে বা দেখতে-করতে পারে না বলে চাপা হাহাকারে ফেটে পড়ে, তার কোনো কিছুই আর্থিক বা বস্তুগত নয়। আকাক্ষাটা নির্ভেজাল কাব্যিক। যদিও প্রত্যক্ষত কবিতা লেখে না, এমন ব্যক্তিরও এ ধরনের ভাবনা-বোধি থাকা অসম্ভব নয়। কিন্তু কবি এ ব্যাপারে দ্বিধার কোনো অবকাশ রাখেন না। হারানোর পর বা পেয়েও হারানোর পর তার জন্য যে কাজ নির্ধারিত থাকে, তা কাব্য-রচনাই বটে:
কাঁটা-কুঞ্জে বসি তুই গাঁথিবি মালিকা,
দিয়া গেনু ভালে তোর বেদনার টীকা!
দারিদ্র্যের পরবর্তী রূপ কিন্তু মোটেই ব্যক্তিক নয়। এখানকার সম্বোধন ‘ক্ষমাহীন হে দুর্বাসা’। ভিক্ষা-ঝুলি নিয়ে সে দ্বারে দ্বারে ফেরে। যেন জগতের সুখী মানুষদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বিলাস-কুঞ্জই জগতের একমাত্র সত্য নয়। এখানে দুঃখ আছে, সুখ-স্বর্গের নিকটেই বেদনার কালরাত্রি আছে। দারিদ্র্যের এই দুর্বাসা-রূপই যেন জগতের যাবতীয় দুঃখের আকর। কিন্তু এ কেবল ক্ষ্যাপা স্বভাবের পাগলামি নয়। যে অগ্নিবাণে ধেয়ে আসে দুর্ভিক্ষ-মহামারি-তুফান, পুড়ে যায় প্রমোদ-কানন, উড়ে যায় অট্টালিকা, সেই অগ্নিবাণের উৎস তো অতি স্পষ্ট:
চল-পথে অনশন-ক্লিষ্ট ক্ষীণ তনু,
কী দেখি বাঁকিয়া ওঠে সহসা ভ্রু-ধনু,
নিশ্চিতভাবেই ভ্রু-ধনু বেঁকে ওঠে চোখে-পড়া অসংগতির কারণে। বিলাস-কুঞ্জের পাশে গরিবির বীভৎস হাজিরাজনিত অসংগতি। এখানে দারিদ্র্য বর্ণিত হয়েছে এক ধরনের পাপ হিসেবে। এই অসাম্য আর অন্যায্যতার দুনিয়া যেন পাপেরই প্রতিমূর্তি। দারিদ্র্য স্বয়ং পাপ, আবার সে-ই পাপের শাস্তি-বিধানকারী। যেন বিশ্ব-সংসারের কোনো সুদূর ভারসাম্য রক্ষিত হয় এভাবে- এ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে। বিশ্ববিধানের এই অনিবার্যতায় কবির ভূমিকা কী? এখানে তার উচ্চারণ খানিকটা নিয়তিবাদীর মতো:
বীণা-তারে করাঘাত হানি
সারদার, কী সুর বাজাতে চাহ গুণী?
যত সুর আর্তনাদ হয়ে ওঠে শুনি!
কাব্যসুর-সংক্রান্ত এ উচ্চারণ অবশ্য দ্ব্যর্থক। একদিকে যে কোনো কবির ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য। যে বাস্তবতাকে পৃথিবীর সারসত্য হিসেবে বর্ণনা করলেন তিনি, তার সাপেক্ষে যেকোনো গানই আর্তনাদ হয়ে উঠতে বাধ্য, যদি বাস্তবকে এড়িয়ে না যায় কেউ। অন্যদিকে আবার এ উচ্চারণ তার নিজের কাব্যসত্যেরও নির্ণায়ক। হয়তো নানা সুরই তিনি তুলতে চান বীণায়। কিন্তু বাস্তবতার প্রচণ্ড চাপে সব সুরই হাহাকার হয়ে বাজে। সে ক্ষেত্রে এ নিয়তি মোটেই আসমানি বালাই নয়; দুনিয়াদারির গভীর বাস্তবতারই উপজাত।
কবিতার তৃতীয় ও শেষাংশে দারিদ্র্যের রূপ আরও প্রসারিত হয়ে মানুষের সামষ্টিক মনস্তত্ত্বের দিকে গেছে। এখানে সানাইয়ের করুণ সুরের আবহে আগমনী-বিসর্জনের রূপকে মানব-অস্তিত্বের এক চিরন্তন দ্বন্দ্ব উপস্থাপিত হয়েছে। আনন্দ-বেদনা, পাওয়া-হারানো, আগমন-তিরোধান- এই ছকে আবর্তিত মানুষের যে জীবন, তাতে প্রাপ্তিকে তো অপ্রাপ্তি থেকে আলাদা করা যায় না। বরং প্রাপ্তির মধ্যেই অপ্রাপ্তির সম্ভাবনা সুপ্ত থাকে বলে করুণ সুরেরই প্রাধান্য। ঠিক যেমন আগমনীর মধ্যে থাকে বিসর্জনের বেদনা। কবিতার বেদনাসিক্ত এ অংশটি প্রকৃতির কোমল উপাদানের ছায়ায় শান্তরসে বর্ণিত হয়েছে। সেখানে ম্লানমুখী’ শেফালির ঝরে পড়াও আছে, আবার পুষ্প-প্রগলভ প্রজাপতি-ভ্রমরের প্রাণবন্ততাও আছে। কবি সেই শান্তশ্রী পান করতে চান। প্রকৃতিও উদার:
পুষ্পাঞ্জলি ভরি দু’টি মাটি-মাখা হাতে
ধরণী এগিয়ে আসে দেয় উপহার।
ও যেন কনিষ্ঠা মেয়ে দুলালী আমার!
কিন্তু এই প্রাকৃতিক শিশু মানবশিশুর সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে না। দুইয়ের সমঝোতা হয় না। শিশুর ক্ষুধাজনিত কান্না কবিকে মনে করিয়ে দেয় দারিদ্র্য তার জীবনের এক অমোঘ বাস্তবতা। এর সুরে তাল না মিলিয়ে তার কোনো উপায় নেই।
শুরুর ছয় পঙ্ক্তির স্তবকেই দারিদ্র্যের পূর্ণ মহিমা ঘোষিত হয়েছে। কিন্তু ভাষার বিদ্যমান অর্থ-ব্যঞ্জনায় শব্দটি নেতিবাচক হওয়ায় শুরু থেকেই দারিদ্র্যকে মহিমাময় অবস্থা হিসেবে পাঠ করা সহজ নয়। শেষ পর্যন্ত বিপুল অর্থ-বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে শব্দটি নতুন সব অর্থে ভারি হয়ে উঠলেই কেবল প্রথমাংশের মহিমায়ন শনাক্ত করা সম্ভব হয়। কবিতায় শব্দের নতুন অর্থ প্রতিষ্ঠিত হয়, কিংবা অর্থের আমূল বিপর্যয়ে ‘অপরিচিতিকরণ’ সম্পন্ন হয় ইত্যাদি যেসব কথা কাব্যের বাজারে চালু আছে, তার ধ্রুপদী উদাহরণ ‘দারিদ্র্য’। পরিবর্তিত অর্থ মাথায় রেখে পড়লে পরিষ্কার ধরা পড়বে, এ কবিতায় দারিদ্র্যকে সম্বোধন করা হয়েছে প্রধানত ‘তাপস’ নামে। ঋষি দুর্বাসাও তপস্বীই বটে। ‘কাঠুরিয়া’ বা ‘রবি’ সম্বোধন নয়, পরিচয়জ্ঞাপক লক্ষণ মাত্র। এই দারিদ্র্য কবিকে যা দিয়েছে বলে শুরুতেই দাবি করা হয়েছে, প্রথম পাঠে তাকে ‘আইরনি’ মনে হতে পারে; কিন্তু সংজ্ঞায়ন-প্রক্রিয়া অনুসরণের পর ফের পড়লে বোঝা যাবে, শুরুর ছয় পঙ্ক্তি পুরো কবিতার একদিকে তাৎপর্যজ্ঞাপক সারসংক্ষেপ, অন্যদিকে কবিতাটি পড়ার প্রধান সূত্র। বলা হয়েছে, দারিদ্র্য তাকে মহান করেছে। দিয়েছে সম্মান, সেই খ্রিষ্টের মতো যিনি জন্ম-বর্ণ-গোত্রজনিত গরিবির মধ্য দিয়েই হয়ে উঠেছেন যিশুখ্রিষ্ট। দারিদ্র্য তাঁকে মুকুটের শোভাও দিয়েছে- নিশ্চয়ই কবির খেতাব, যদিও সেই মুকুট কণ্টকাকীর্ণ। দারিদ্র্যের চাপে তার দৃষ্টি হয়েছে উলঙ্গ আর উদ্ধত, বাণী হয়েছে ক্ষুরধার। তার গানের বীণা দারিদ্র্যের অভিশাপে তরবারিতে রূপান্তরিত হয়েছে। আরও একটা ঘটনা ঘটেছে। হয়তো এগুলোর সঙ্গেই যুক্ত; কিন্তু কাব্যতত্ত্বের দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: দারিদ্র্য তাকে দিয়েছে ‘অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস’।
যে ‘বিষ-জ্বালা’ বুকে নিয়ে কবি লিখছিলেন তার ‘রক্ত-লেখা’গুলো, তার বহুমাত্রিক পটভূমি নির্মিত হয়েছে এ কবিতায়। সেই পটভূমিতে ‘সমকালীনতা’র প্রবল প্রতাপ। মানবিক অস্তিত্বের গুরুতর দ্বন্দ্বগুলো ব্রিটিশ ভারতের প্রেক্ষাপটে বিশেষ বাস্তবতার প্রশ্রয়ে প্রকাশিত হয়েছে। এ বাস্তবতাকেই কবি যখন ‘দারিদ্র্য’ কবিতায় দুনিয়ার বিধি হিসেবে উপস্থাপন করলেন, তখন তার ‘কালজ’ দাবি রূপান্তরিত হলো ‘কালোত্তর’ মহিমায়। তিনি ক্ষুরধার বাণী চান। তরবারির ধার চান। নজরুল বলেছেন, এই ক্ষুরধার ভাষা তার সহজাত। কারণ, দারিদ্র্য তার সহজাত সম্পদ।
নিজের দৃষ্টিভঙ্গির চরিত্র সম্পর্কেও তার কোনো অনিশ্চয়তা নেই। এই দৃষ্টি উদ্ধত এবং উলঙ্গ। বলা দরকার, উলঙ্গ বলেই উদ্ধত। ‘উলঙ্গ দৃষ্টি’ শব্দযুগলে আমরা বিশেষভাবে জোর দিতে চাই। ওই কবিতাতেই পরে তিনি দারিদ্র্যের অন্তর্গত উপাদান হিসেবে এ বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন:
বিনয়ের ব্যভিচার নাহি তব পাশ,
তুমি চাহ নগ্নতার উলঙ্গ প্রকাশ।
বিনয় তাঁর কাছে ব্যভিচারই বটে। বিনয় কী? সামাজিক স্থিতাবস্থার বিশেষ প্রকাশ ও স্বীকৃতি নয় কি? যে দারিদ্র্য দুনিয়ার অন্যায্য স্থিতাবস্থার জন্য এক মূর্তিমান ত্রাস, বিনয়ের বদলে তার তো ঔদ্ধত্যেরই জয়গান করার কথা। সামাজিক স্থিতাবস্থা আসলে স্বীকৃত নানা মত আর কর্ম-তৎপরতার সমষ্টি। যদি কেউ বেছে নেয় বিশেষ মত, যদি মেনে নেয় নির্দিষ্ট তৎপরতা, তাহলে সেই মত বা তৎপরতার অধীনেই সে বিনীত থাকবে। বাক্য বা সুর উৎপাদন করবে। তার রচনায় সেই দৃষ্টিভঙ্গির নিরুপদ্রব শৃঙ্খলায় জগৎ বর্ণিত হবে। নজরুল চেয়েছেন খোলা দৃষ্টি। চেয়েছেন, বিশেষ মত বা দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা তার বাস্তব নিয়ন্ত্রিত না হোক। বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি বা শৃঙ্খলা আবশ্যিকভাবে খারাপ, তা নয়। কিন্তু নজরুলের ক্ষেত্রে ‘উলঙ্গ দৃষ্টি’ বিশেষ ধরনের কাব্যবৈশিষ্ট্য আর কাব্যস্বাতন্ত্র্য তৈরি করেছে।
খোলা দৃষ্টিই তাকে দিয়েছে ‘অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস’। এককভাবে এই পঙ্ক্তি নজরুলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাব্য-ইশতেহার। তাকে পড়বার-বুঝবার সবচেয়ে কার্যকর চাবি। চিহ্নজগতের যে শৃঙ্খলায় আমাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা, সে শৃঙ্খলা আসলে অসংখ্য শৃঙ্খলের সমষ্টি। এসব শৃঙ্খলের প্রশ্রয়ে এবং আরমেই মানুষ জন্মে, বেড়ে ওঠে, দিনযাপন করে। জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে প্রভাবশালী ডিসকোর্সের অধীনেই মানুষ নির্মাণ-পুনর্নির্মাণের তৎপরতা চালায়, এমনকি বিদ্রোহ-বিপ্লব করে। ভালো-মন্দ বা উন্নতি-অবনতির ধারণাও এর অধীনেই তৈরি হয়। গভীর স্তরের এ নিয়ন্ত্রক কাঠামোগুলো মানুষকে সংকোচে বিহ্বল করে রাখে।
মানববৃত্তির দিক থেকে কথাটার অন্য আরেক তাৎপর্য আছে। নিটশে গ্রিক চিন্তাচেতনার দ্বিধারার কথা বলেছিলেন। একটি হলো অ্যাপোলোর নিয়ম এবং অন্যটি ডায়োনিসুসের নিয়ম। অ্যাপোলো প্রশান্তি, স্বচ্ছতা, পরিমিতি, যুক্তিনিষ্ঠতা এবং গ্রিক ধ্রুপদী আদর্শের প্রতীক; অন্যদিকে ডায়োনিসুস হলেন আবেগধর্মিতা, আতিশয্য, নিয়ন্ত্রণাভাব ও প্রাণের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতীক। এ দ্বৈরথ ব্যবহার করে বলতে পারি, নজরুল ডায়োনিসুসীয় জীবনবোধের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু তিনি কবি। এবং কবি শব্দটির যাবতীয় তাৎপর্যেই। তাই নিজের কাব্যপ্রকৃতি যখন বর্ণনা করেছেন ‘দারিদ্র্য’ কবিতায়, তখন তা অক্ষরবৃত্তের প্রবহমানতা, অন্তমিল, আলঙ্কারিকতা এবং স্থিরতার আড়ালেই করেছেন।
প্রকৃতপক্ষে বাংলা কাব্যতত্ত্বের প্রভাবশালী ময়দানে ‘দারিদ্র্য’ এক গঠনমূলক অন্তর্ঘাত।
লেখক: সভাপতি, বাংলা একাডেমি ও অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়