‘দেশে যে গণ্ডগোল, সাবধানে থাকিস বাবা’ প্রতিদিন অফিসে আসার সময় কথাটা বলতেন আম্মা। ‘দোয়া করবেন’ এই কথা বলে প্রতিদিন বাসা থেকে বের হতাম জুলাই-আগস্টের অস্থির সময়গুলোতে।
১৫ জুলাই খবর পেলাম, কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগ। অফিস থেকে দুটি ক্যামেরা ইউনিট পাঠালাম দ্রুত। দুই গ্রুপের সংঘর্ষে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস যেন যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে ওঠে। অবস্থা খারাপ দেখে নিজেই স্পটে চলে গেলাম। ততক্ষণে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত। রাজু ভাস্কর্য দখল করে আছে ছাত্রলীগ। রাজু ভাস্কর্য থেকে শাহবাগ মোড় পর্যন্ত বহিরাগতদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রত্যেকের হাতে বাঁশ, কাঠ, রড, স্টিলের পাত। সারি সারি মোটরসাইকেল পার্কিং করে রাখা। শহিদ মিলন স্মৃতি ফলকের সামনে দাঁড়িয়ে পুরো অবস্থাটা দেখতে থাকলাম। একের পর এক মিছিল আসছে। থমথমে অবস্থা। পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন যেন গিজগিজ করছে। রাতে ফিরে এলাম অফিসে।
১৬ জুলাই আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ভিডিওটা আম্মা তার সেলফোনে দেখার পর তার ভয় আরও বেড়ে গেল। তার একটাই কথা, বাসা থেকে অফিসে যাবা আর অফিস থেকে বাসা, আর কোথাও যাওয়ার দরকার নাই বাবা। শেখ হাসিনার উদ্দেশে বলতেন, ‘এত বড়াই ভালো না, হাসিনা আর টিকবে না।’ সকালের নাশতা খেতে খেতে আমি শুধু হাসতাম। আবু সাঈদের গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ার ভিডিওটা দেখে আমারও মনে হয়েছিল, আবু সাঈদ না, যেন হাসিনা সরকারের লুটিয়ে পড়ার দৃশ্যই দেখলাম।
১৭ জুলাই ছিল আশুরা। শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। অন্যদিকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন শিক্ষার্থীরা। পুরো ঢাকা শহরে থমথমে অবস্থা। ঢাবিতে গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিলে পুলিশ লাঠিপেটা, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার শেল নিক্ষেপ করেছে। রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু করে ভিসির বাসভবন এলাকা পর্যন্ত রণক্ষেত্র। কোনো রকমে আমি আর আমার ক্যামেরাপারসন ফয়সাল দেওয়ান নিজেদের রক্ষা করে ফুটেজ সংগ্রহ করতে থাকি। এর মধ্যে খবর পেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সব আবাসিক শিক্ষার্থীকে হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। টিএসসি থেকে ভিসির বাসভবনের দিকে ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকলাম। পুরো ফুটপাত ভরা ছাত্র-ছাত্রীদের জুতা, স্যান্ডেল, কারও কারও ব্যাগ, ছেলেদের মাথার ক্যাপ, মেয়েদের ওড়না, লাঠি, বাঁশ, কফিনের বাক্স, কাফনের কাপড়, টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেডের খোসা, জাতীয় পতাকা। বেশ কিছু টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেডের খোসা টুকিয়ে নিলাম, একটা জাতীয় পতাকাও তুলে নিলাম ধুলো ঝেড়ে, থাকুক না প্রমাণ। রোকেয়া হলের দু-একজন সাধারণ ছাত্রীকে দেখলাম ট্রলি ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে যাচ্ছেন মলিন মুখে। অনেককে অভিভাবক এসে নিয়ে যাচ্ছেন। ভিসির বাসার সামনে গিয়ে দেখা পেলাম সাবেক ডিবিপ্রধান হারুনুর রশিদের। ততদিনে তিনি ‘হাউন আংকেল’। বিশাল দলবল নিয়ে শোডাউন করছেন কালো চশমা পরে। দলে দলে পুলিশ। গাড়ি থেকে নেমে তারা হলে হলে চলে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক বের করতে। আমিও পিছু নিলাম পুলিশের। ভিড়ের মধ্যে ক্যামেরাপারসনকে হারিয়ে ফেলি। নিজের কাছে থাকা মোবাইল ফোনটা বের করে ভিডিও করতে থাকি। শত শত পুলিশ একসঙ্গে বাঁশিতে ফুঁ দিতে দিতে এগিয়ে যায় হলের রুমে রুমে। হ্যান্ড মাইকে শিক্ষকরা দ্রুত হল ছাড়ার ঘোষণা দিচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর দেখলাম, শত শত শিক্ষার্থী বের হয়ে আসছেন। কারও হাতে ব্যাগ, কারও হাত খালি। অধিকাংশের চোখে-মুখে ক্রোধ-ঘৃণা। যেতে যেতে শিক্ষার্থীরা পুলিশ বাহিনীকে গালি দিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ ভিড়ের ভেতর উচ্চস্বরে বলে যাচ্ছেন, ‘হল ছাড়ছি কিন্তু ঢাকা ছাড়ব না। আমাদের লড়াই বন্ধ হবে না’। বিজয় ৭১, মুহসীন হলের সামনে দাঁড়িয়ে খবর পেলাম এফ রহমান হলের দিকে ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হচ্ছে। দৌড়ে চলে গেলাম এফ রহমানের দিকে। ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। একটা পোড়া মোটরসাইকেল পড়ে আছে হলের সামনে।
১৮ জুলাই থেকে বলতে গেলে বেকার হয়ে গেলাম। কারণ ইন্টারনেট বন্ধ। খবরের কাগজে আমার টিমের মূল কাজই হচ্ছে ইন্টারনেটকেন্দ্রিক। নেট না থাকায় কোনো ধরনের ভিজুয়াল স্টোরি আমরা আপলোড করতে পারছিলাম না। কিন্তু তাই বলে কী বসে থাকব? না। ওই দিনগুলোতে প্রতিদিনই আমি একটা ক্যামেরা ইউনিট নিয়ে বের হয়ে পড়তাম। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে আন্দোলনের ফুটেজ, সংঘর্ষের ফুটেজ সংগ্রহ করতে থাকি। খবরের কাগজের প্রিন্ট ভার্সনে সেসব অভিজ্ঞতা নিয়ে সংবাদ দিতে শুরু করি সম্পাদক মোস্তফা কামালের অনুপ্রেরণায়।
আমাদের অফিসটা বাংলামোটর হওয়াতে অফিসের সামনে দিয়েই শত শত অ্যাম্বুলেন্স সাইরেন বাজিয়ে প্রতিদিন দ্রুতগতিতে ছুটে চলে। অ্যাম্বুলেন্সের সূত্র ধরে এক দিন ক্যামেরা ইউনিট নিয়ে চলে গেলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। জরুরি বিভাগের সামনে যেতেই চোখে পড়ল দুটি পুলিশের ভ্যান। হাসপাতাল থেকে যে রোগীরা বের হচ্ছেন, তাদের কাগজপত্র চেক করে ছাড়ছেন তারা। দু-একজনকে গাড়িতে ওঠানো হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে হাসপাতালের ফটকেই। ক্যামেরা নিয়ে হাসপাতালের ভেতর প্রবেশ করতে দেবে না পুলিশ। কী আর করা। ক্যামেরা রেখে নিজেই ঢুকে গেলাম। জরুরি বিভাগ পার হওয়ার সময় দুই পাশের ফ্লোরে সারি সারি আহত মানুষ দেখলাম, যাদের অধিকাংশ তরুণ। শ্রমজীবী মানুষও আছেন। স্বজনদের কান্না, হতাশার দীর্ঘশ্বাস আর চাপা ভয়মাখা মুখগুলো দেখতে দেখতে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের মর্গে পৌঁছে যাই। রক্ত আর মেডিসিনের গন্ধ মিলেমিশে দম বন্ধ করা গন্ধ। পাঁচজন শ্রমিককে দেখলাম বসে আছেন লাশের অপেক্ষায়। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, মহাখালীতে আন্দোলনে নিহত হয়েছেন তাদেরই এক শ্রমিক ভাই। একদিকে লাশের ময়নাতদন্ত চলছে আরেকদিকে চলছে লাশ গোসল করানোর কাজ। স্বজনরা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে একের পর এক লাশ নিয়ে যাচ্ছেন খুব গোপনে। পুলিশের ভয়ে আন্দোলনে আহত অনেকেই লুকিয়ে হাসপাতাল ছাড়ছেন। যাত্রাবাড়ীতে নিহত কিশোর ইমরানের মা এসেছেন সন্তানের লাশ নিতে। সঙ্গে ইমরানের বোন সানজিদা। ছেলের লাশটা পেয়ে মায়ের আর্তচিৎকার আর নিতে পারছিলাম না। নিজের অজান্তেই চোখের কোনো জল চলে আসে। মায়ের সঙ্গে কথা বলি প্রায় ঘণ্টাখানেক। মর্গের আশপাশটা ভিডিও করছিলাম। এর মধ্যে গোয়েন্দা সংস্থার দুজন এসে আমাকে জেরা শুরু করলেন এই বলে যে, কেন আমি ভিডিও করছি। তাদের জানালাম, ভাই আমি সাংবাদিক না, আমি আমার ভাইয়ের লাশের খোঁজে এসেছি, জীবনে প্রথমবার মর্গে আসলাম তাই ভিডিও করছি। তারা মর্গের ভেতরে চলে গেলে বের হয়ে আসি। আসতে আসতে দেখলাম আরও কয়েকজন স্বজন এসেছেন লাশের সন্ধানে। নাকে শুধু লাশের গন্ধ পাচ্ছিলাম।
অফিসের নিচেই বাংলামোটর মোড়ে প্রতিদিনই সকাল-সন্ধ্যা সংঘর্ষ হতো ছাত্রলীগ, যুবলীগ আর শিক্ষার্থীদের মধ্যে। ছাত্ররা আসতেন শাহবাগ থেকে আর ছাত্রলীগ, যুবলীগ আসত বাংলামোটর, মগবাজার, কাঁঠালবাগান এলাকা থেকে। যখনই সংঘর্ষ শুরু হতো আমরা দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে ফুটেজ নেওয়া শুরু করতাম। এভাবে যখন যেভাবে পেরেছি এই আন্দোলনের ফুটেজ সংগ্রহ করেছি, সেগুলো প্রচারের ব্যবস্থা করেছি।
৫ আগস্ট ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে বড় ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে এমন একটা খবর ছিল আমাদের কাছে। সেদিন খুব সকালে অফিসে হাজির হই। টিমের অধিকাংশ তখনো অফিসে আসতে পারেননি সেদিন। সকালেই আমাদের ক্যামেরাপারসন ফয়সাল দেওয়ান আর ড্রাইভার নবী ভাইকে পাঠিয়ে দিলাম ঢাকা রাউন্ড দিতে। এর মধ্যে খবর পেলাম সেনাবাহিনী প্রধান ভাষণ দেবেন। টিভির সামনে আরেকটা ক্যামেরা দাঁড় করিয়ে দিলাম। ১৪ তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ উত্তরের আকাশে একটা হেলিকপ্টার দেখলাম। রুমে ফিরে ঢাকার বাইরের পাঠানো ভিডিওগুলো দেখছিলাম। হঠাৎ কানে এলো স্লোগান, ‘পালাইছে রে পালাইছে, শেখ হাসিনা পালাইছে। বারান্দায় দাঁড়াতেই চোখে পড়ল শাহবাগের দিক থেকে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা, নারী-পুরুষ, নানা বয়সী মানুষ বাংলামোটরের দিকে আসছেন। ক্যামেরা ইউনিট নিয়ে নিচে নেমে পড়লাম দ্রুত। জনসমুদ্র কাকে বলে, তা জীবনে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা হলো। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস সবার মধ্যে। আনন্দে অনেককে কাঁদতে দেখলাম। মিষ্টি বিতরণ চলছে, একজন বৃদ্ধাকে দেখলাম চকলেট বিতরণ করতে। আমি মোবাইলে ফুটেজ নিতে থাকলাম। মানুষের কথা রেকর্ড করতে থাকলাম। এর মধ্যে খেয়াল করলাম, আমাদের অফিসের সামনের পার্কিংয়ে রাখা বাংলাভিশনের একটা গাড়ি ভাঙচুর করছে এক দল কিশোর। আমাদের অফিস ভবনেও তারা হামলা চালিয়েছে। আমার পরনে প্রেস ভেস্ট। জনতার স্রোতে থাকা একজন আমাকে ডেকে বললেন, ভাই ওই দিকে যাইয়েন না, সাংবাদিক পাইলেই পিটাচ্ছে ওরা। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। ভেস্টটা খুলে আমিও জনতার স্রোতে মিশে গেলাম। যে জনতার স্রোত মূলত গণভবন আর সংসদ ভবনের দিকে যাচ্ছিল। পথে একজন জিজ্ঞেস করল, ভাই সংসদ ভবন কোন দিকে? আমি সার্ক ফোয়ারার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে বললাম, ‘একবারে সোজা যাইতে থাকেন, জনতাই আপনাকে সংসদের পথ দেখাবে।’