দেশ-বিদেশ সর্বত্রই অনস্বীকার্য যে, ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত যে অভ্যুত্থান তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। বিশিষ্ট চিন্তাবিদ সদ্যপ্রয়াত বদরুদ্দীন ওমরের মতে, ভাষা আন্দোলন-পরবর্তী এমন জনবিস্ফোরণ আর দেখা যায়নি। যা অভূতপূর্ব তা হলো এই যে, এ গণ-অভ্যুত্থান কোনো রাজনৈতিক দল বা বিশিষ্ট গোষ্ঠীর নেতৃত্ব ছাড়াই ছাত্র-জনতা সম্মিলিতভাবে দুই যুগ ধরে চলা এক ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে অকাতরে জীবন দিয়েছে, দলে দলে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। প্রশ্ন হলো- কেন সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ এমনভাবে অকুতোভয়ে বুলেটের সামনে দুই হাত ছড়িয়ে বুক পেতে দিয়েছিল? কারণ অতি সংক্ষেপে বলা যায় যে, তারা স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত হতে দেখেনি। দেখেছে শাসকগোষ্ঠী শুধু নিজেদের স্বার্থে দেশ ও দেশের সম্পদকে লুণ্ঠন ও ব্যবহার করেছে, সিংহভাগ মানুষকে রেখেছে মানবেতর জীবনে। সেই দেশকে নতুন করে গড়ার অপেক্ষায় জীবনকে তুচ্ছ করে লাখো আমজনতা মরণপণ লড়াই করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল তৃণমূলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আশায়। যেখানে প্রতিষ্ঠিত হবে সাম্য, সামাজিক মর্যাদা ও আইনের শাসন। নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে তাই তিনটি মূল দাবি: ১. কোনোভাবেই যেন বাংলাদেশে আর ফ্যাসিবাদ ফিরে না আসে; ২. ভারতীয় আধিপত্য থেকে যুক্তি ও ৩. তৃণমূল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। এই প্রাণের আকাঙ্ক্ষা পূরণের কাজটি কঠিন ও দুরূহ। প্রায় দুই যুগ ধরে দুঃশাসনে বাংলাদেশ এখন একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র। সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান অকার্যকর। বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা হয়েছে লঙ্ঘিত। গণতন্ত্র, সুশাসন আর আইনের শাসনের অভাবে জনজীবন হয়েছে বিপর্যস্ত। কিন্তু উদ্দেশ্য সাফল্যের জন্য সম্মিলিতভাবে করতে হবে তিনটি মূল কাজ। তিনটি মূল আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য দরকার হবে সংবিধান সংস্কার, বৈচিত্র্যময় বৈদেশিক নীতি ও তৃণমূল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও সর্বদলীয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি নির্বাচন। যে নির্বাচনে ভোটাররা শঙ্কাহীনচিত্তে ভোট দিয়ে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে জয়যুক্ত করবে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেই উদ্দেশ্যেই কাজ করে যাচ্ছেন। যেকোনো অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য যেসব উপাদান প্রয়োজন হয় তা হলো ১. একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন। যে কমিশনের কার্যকলাপে সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না; ২. সরকার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবে এবং নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন কার্যকলাপে সাহায্য করবে, ৩. একটি নির্ভুল ভোটার তালিকা, ৪. খুব কার্যকরী নির্বাচনি বিধিমালা, ৫. মুক্ত স্বাধীন গণমাধ্যম ও সবচেয়ে প্রয়োজন হলো রাজনৈতিক দলগুলোর গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। প্রধান উপদেষ্টা তাই ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মোট ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছেন। মূল পাঁচটি কমিশন হলো- ১. সংবিধান সংস্কার, ২. নির্বাচন কমিশন, ৩. জনপ্রশাসন, ৪. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা পুলিশ/আনসার ইত্যাদি, ৫. বিচার বিভাগ। এসব সংস্কার ও জুলাই অভ্যুত্থানের দোষী ব্যক্তিদের বিচার শেষে নির্বাচন করা।
একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের জন্য দরকার একটি মুক্ত, স্বাধীন গণমাধ্যম- যাদের প্রধান কাজ হবে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহার নৈর্ব্যক্তিক প্রচার করা এবং Exit poll-গুলো নৈর্ব্যক্তিকভাবে রিপোর্ট করা। দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো এখনো অলিগার্কদের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে।...
কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, আগামী নির্বাচন যা নতুন বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তি স্থাপন করবে, তা নিয়ে নানারূপ আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন সব আশঙ্কা অমূলক নয়। কারণ ১৯৭১ সাল থেকেই বাংলাদেশের নির্বাচন সমস্যাসংকুল। প্রধান বাধা তথা সমস্যা ছিল সরকারের পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ। নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে পুলিশ, রিটার্নিং অফিসার, পোলিং অফিসার সবাই সচেষ্ট থাকায় সরকারপক্ষকে জেতানোয় জনগণ কখনোই প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করার পরও কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। ২০০৮ সালের পর থেকে তো ইতিহাসের অন্য মোড়। ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪-এর নির্বাচন এমন প্রহসনমূলক ছিল যে, এ জাতীয় প্রহসন দেশ ও বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছে। শেখ হাসিনা তার ১৫ বছরের শাসনে যে ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থা চালু করেছিল তাতে করে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান প্রায় ধ্বংপ্রাপ্ত। সুতরাং বর্তমান পরিস্থিতিতে জন-আকাঙ্ক্ষার নির্বাচন যা প্রধান উপদেষ্টা একটি অনুকরণীয় নির্বাচন হিসেবে দেখতে চান, তা কতটুকু সম্ভব হবে, নিম্নে সেটাই আলোচনা করার চেষ্টা করা হবে। প্রথমত, আগামী নির্বাচন যা ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর দ্বিতীয় সপ্তাহে হওয়ার কথা আছে, তা কোন সরকার পরিচালিত করবে এর কোনো সুস্পষ্ট ধারণা এখনো নেই। যদিও সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানে সংযোজনের অনুমতি মিলেছে কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় স্থাপিত হবে তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। এদিকে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে নয়। দল-মতনির্বিশেষে এ জাতীয় দ্বন্দ্ব দুঃখজনক। দ্বিতীয়ত, যে সরকারের অধীনেই নির্বাচন হোক না কেন, সে সরকারে অধীনে জনপ্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ থাকবে কি না তা নিয়েও যথেষ্ট উদ্বেগ রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো যে শুধু ফ্যাসিস্ট হাসিনার ভুক্তভোগী কর্মচারী যারা এখনো স্ব স্ব পদে অধিষ্ঠিত আছেন, যেমন- রিটার্নিং অফিসাররা যারা ভোট গণনার সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন, তাদের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়ে শুধু উদ্বিগ্নই নয়, প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যেও রয়েছে উদ্বেগ, সরকারের প্রতি অবিশ্বাস ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাব।
তৃতীয়ত, একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের জন্য দরকার একটি মুক্ত, স্বাধীন গণমাধ্যম- যাদের প্রধান কাজ হবে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহার নৈর্ব্যক্তিক প্রচার করা এবং Exit poll-গুলো নৈর্ব্যক্তিকভাবে রিপোর্ট করা। দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো এখনো অলিগার্কদের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে। এ ছাড়া জনগণ সন্দেহ করে যে, গণমাধ্যম এখনো পুরোপুরি মুক্ত নয় এবং তথাকথিত DGFI দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হবে নির্বাচনের প্রচারে AI-এর প্রভাব। মনে রাখা দরকার যে, বর্তমানে IT-এর interfercnce এমনকি উন্নত বিশ্বেও নির্বাচনের ফলাফলকে বদলে দেওয়া যায়। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে কি যথেস্ট IT এবং AI প্রশিক্ষিত লোকবল আছে, যারা এ অত্যাধুনিক টেকনোলজির নেতিবাচক প্রভাবকে মোকাবিলা করতে পারবে? চতুর্থত, বাংলাদেশের যেকোনো নির্বাচনে টাকা ও পেশিশক্তির খেলা নতুন কিছু নয়। পতিত ফ্যাসিস্টের অনুসারীদের দেশে ও বিদেশে কী পরিমাণ অর্থ আছে তা কারও অজানা নয়। এ ছাড়া তাদের কাছে রয়েছে অস্ত্রের ভান্ডার। যে অস্ত্রের ঝনঝনানি গোপালগঞ্জে এনসিপি নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা ও পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে পেশিশক্তি প্রদর্শিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন কি এই টাকা ও পেশিশক্তি সম্পূর্ণভাবে প্রভাবমুক্ত করতে পারবে?
পরিশেষে, এই বললে অত্যুক্তি হবে না যে, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠান করার আগে অনেক জটিল সমস্যার সমাধান করা দরকার। এ ছাড়া নির্বাচন করা জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে। রাজনৈতিক অংশীদারদের উচিত দল-মত, স্বার্থ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ইত্যাদির ঊর্ধ্বে উঠে দেশকে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাওয়া। নতুবা জন-আকাঙ্ক্ষার নির্বাচনের পরিবর্তে আমরা দুঃখজনকভাবে অতীতের পুনরাবৃত্তি দেখতে পারি। যা হবে দেশ ও জাতির জন্য আত্মহত্যার শামিল।
লেখক: সাবেক অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।