গত ১৫ অক্টোবর খবরের কাগজ পত্রিকা তার দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করেছে। তিন বছরে পদার্পণ করেছে পাঠকনন্দিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকাটি। শুরু থেকেই আমি এই পত্রিকার খাগড়াছড়ি জেলা প্রতিনিধি হিসেবে যুক্ত রয়েছি। গত দুই বছরে খাগড়াছড়ির মাটি, মানুষ, অন্যায়-অবিচার ও অনিয়ম নিয়ে আমার করা অসংখ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে এ পত্রিকার পাতায়। এর মধ্যে অনেক প্রতিবেদন পাঠকমহলে যেমন সাড়া ফেলেছে, তেমনি সচেতন মহলেও আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত দুই বছরে খবরের কাগজে প্রকাশিত খাগড়াছড়ির আলোচিত কিছু প্রতিবেদন যেমন- ‘নির্বাচনি হলফনামায় অবৈধ ইটভাটার আয় দেখালেন কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা’, ‘শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ গ্রহণ ও নারী কেলেঙ্কারির অডিও, ভিডিও ফাঁস: বেকায়দায় এমপি কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা’,‘কর্মচারী থেকে হাজার কোটির মালিক কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা’, ‘কারাগারে সেবার নামে বাণিজ্য’, ‘এক কৃষি কর্মকর্তার হাতে জিম্মি লাখো দরিদ্র কৃষক’, ‘বিদ্যুতের প্রকৌশলী ঘুষ নেন কিলো মেপে’, ‘শান্তি পরিবহনে জিম্মি খাগড়াছড়িবাসী’, ‘খাগড়াছড়িতে বছরে ৫০০ কোটি টাকা চাঁদাবাজি’, ‘পাহাড়ি সংগঠনে জিম্মি বিসিক শিল্পনগরী’, ‘জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিলে জরিমানার হুমকি পাহাড়ি সংগঠনের’, ‘দুই প্রকল্পের নামে ৬০ লাখ টাকা লোপাট করলেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জিরুনা ত্রিপুরা’, ‘ভাড়ায় খাটছে বিসিআইসি সার ডিলারদের লাইসেন্স’, ‘দুস্থ নারীদের সঞ্চয়ের ১৭ লাখ টাকা লোপাট করলেন ইউপি চেয়ারম্যানরা’, ‘সনদ জালিয়াতি করে কাজ বাগিয়ে নেন ঠিকাদার’, ‘হাসপাতালের জমির মাটি চুরি ঠিকাদারের’। এসব প্রতিবেদন ছিল পাহাড়ের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা অগণিত অনিয়মের দলিল।
দুই বছরের এই পথচলায় ‘খবরের কাগজ’ খাগড়াছড়ির মানুষের কাছে আস্থাশীল সংবাদপত্র হয়ে উঠেছে। তবে সীমিত দৈর্ঘ্যের হলেও এই পথচলা কিন্তু মোটেও মসৃণ ছিল না। হুমকি, ভয় আর আতঙ্ক উপক্ষো করে পত্রিকাটির একজন কর্মী হিসেবে কলম থামিয়ে রাখিনি। যতদিন এই পথে আছি, লেখার ধারা অব্যাহত থাকবে।...
‘খবরের কাগজ’-এ প্রকাশিত এসব প্রতিবেদনের ফলে যেমন অনেক ভুক্তভোগী মানুষ সুফল পেয়েছে, তেমনি ক্ষমতার অন্ধকার গহ্বরে থাকা কিছু প্রভাবশালী মহলও অস্বস্তিতে পড়েছিল। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার অবৈধ আয়, ঘুষ ও নারী কেলেঙ্কারীসংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের পর আমাকে নানা হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
২০২৩ সালের ৪ ডিসেম্বর খবরের কাগজে প্রকাশিত হয় ‘প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ গ্রহণ ও নারী কেলেঙ্কারীর অডিও, ভিডিও ফাঁস: বেকায়দায় এমপি কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি। এর ঠিক তিন দিন পর ৭ ডিসেম্বর ‘নির্বাচনি হলফনামায় অবৈধ ইটভাটার আয় দেখালেন কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা’ এই শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন দুটি প্রকাশের সময়ে কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা দ্বিতীয় মেয়াদে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। তখন যদিও প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া তিনি জানাননি, কিন্তু দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আমাকে নানাভাবে হয়রানি করতে থাকেন। তার নির্দেশে খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের দিয়ে আমাকে শারীরিক আক্রমণের পরিকল্পনাও করা হয়েছিল, যা গোপন সূত্রে জানতে পেরে কিছুদিন নিজ এলাকায় থাকা বন্ধ করে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হয়েছিল আমাকে।
এ ছাড়া খাগড়াছড়ি জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক কে এম ইসমাইল হোসেনের সার ডিলার সিন্ডিকেট ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ রায় দাশের পরিবহন সিন্ডিকেট নিয়ে খবরের কাগজে প্রতিবেদন করায় নানা ধরনের হুমকি-ধমকিরও সম্মুখীন হয়েছিলাম। তবে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই সেই ভয়ংকর চাপও কেটে গেছে আমার ওপর থেকে।
খবরের কাগজে প্রকাশিত আরও কিছু প্রতিবেদনে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয়েছে জেলাজুড়ে। ২০২৪ সালের ২১ জানুয়ারি প্রকাশিত হয় ‘৬৩৭ দুস্থ নারীর সঞ্চয়ের ১৭ লাখ টাকা লোপাট করলেন ইউপি চেয়ারম্যানরা’। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর তদন্তে সত্যতা মেলে এবং শেষ পর্যন্ত অভিযুক্ত চেয়ারম্যানদের বাধ্য করা হয় লোপাট হওয়া অর্থ দুস্থ নারীদের ফেরত দিতে। তেমনি ২০২৪ সালের ১৫ মার্চ ‘হাসপাতালের জমির মাটি চুরি ঠিকাদারের’ শিরোনামের প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রশাসনের হস্তক্ষেপে হাসপাতালের জমির মাটি পুনরায় ভরাট করে দিতে বাধ্য হন অভিযুক্ত প্রভাবশালী ঠিকাদার।
তবে খবরের কাগজে আগের প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনের সফলতা এসেছে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর। সরকার পতনের প্রায় এক মাস আগে ২০২৪ সালের ৭ জুলাই ‘কারাগারে সেবার নামে বাণিজ্য’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি তখন রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ব্যবস্থা না নিলেও, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের কয়েক মাস পর কারা অধিদপ্তরের তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে অভিযুক্ত খাগড়াছড়ি জেলা কারাগারের জেলার আক্তার হোসেন শেখকে প্রত্যাহার করা হয়।
সবশেষে, চলতি বছরের ১ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদন ‘এক কৃষি কর্মকর্তার হাতে জিম্মি লাখো দরিদ্র কৃষক’ এর সূত্র ধরে দুদক সরেজমিনে গিয়ে তদন্তে নামে। তিন দিনব্যাপী অভিযানে প্রতিবেদনে উল্লিখিত সব অভিযোগের সত্যতা পেয়ে অভিযুক্ত খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ বাছিরুল আলমকে দ্রুত খাগড়াছড়ি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
দুই বছরের এই পথচলায় ‘খবরের কাগজ’ খাগড়াছড়ির মানুষের কাছে আস্থাশীল সংবাদপত্র হয়ে উঠেছে। তবে সীমিত দৈর্ঘ্যের হলেও এই পথ চলা কিন্তু মোটেও মসৃণ ছিল না। হুমকি, ভয় আর আতঙ্ক উপক্ষো করে পত্রিকাটির একজন কর্মী হিসেবে কলম থামিয়ে রাখিনি। যতদিন এই পথে আছি, লেখার ধারা অব্যাহত থাকবে।
লেখক: খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি, খবরের কাগজ