সব পাথর সাদা নয়। তবু নাম ‘সাদাপাথর’! তবে সবই জলের পাথর। জলজীয়। এ জলজীয় কথার সঙ্গে আরেকটি কথার বেশ যোগসাজশ রয়েছে, তা হলো ‘জিয়ল’। জলজীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণে জিয়ল কথাটি আঞ্চলিকতায় বলা হয়। সেদিন জিয়ল থেকে কী বলেছিলাম, ‘যুগ যুগ জিও’?
না, যুগপূর্তি ঘটেনি। অর্ধযুগ পেরিয়েছে বলা যায়। ওপারের ভাষা হিন্দি। তাই হিন্দি শব্দগুচ্ছে বলা অহেতুক ছিল না। হেতু সেই ২০১৭ সালের এক মরা কার্তিক। সেদিন ভোরের ঘোরে ছুটে চলা। সিলেট থেকে ভোলাগঞ্জের পথে তখন কাটা। মানে রাস্তা ভাঙাচোরা। সংস্কার কাজ চলছিল ঢিমেতালে। ৩০ কিংবা ৩২ কিলোমিটারের সড়কপথ যেতে সময় লাগত পাঁচ ঘণ্টা। বিড়ম্বিত পথ এড়িয়ে সহজ চলাচল ছিল নৌকায়। যাত্রাসঙ্গী দর্শনার্থীসহ পরিবেশবাদী-সংবাদকর্মী। জলপথে যেতে যেতে ধলাই পাড়ি দিয়ে সুবিশাল পাহাড়ের পাদদেশ। পাহাড়ের ভাঁজ থেকে নেমে এসেছে ঝরনাধারা। এ জলে পরিপূর্ণ ধলাই নদ। উৎসের খোঁজে মিলল ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ের চেরাপুঞ্জি। পৃথিবীর বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল চেরাপুঞ্জিতটে ভারত সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশের সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ। যেখানে জন্ম নিয়েছে প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র ‘সাদাপাথর’।
হালের সাদাপাথর কিন্তু ২০১৭ সালের আগে অনেকের কাছেই অজানা ছিল। স্থানীয় লোকজন চুপিচুপি ডাকতো ‘ধলাসোনা’। ধলা মানে সাদা। ‘সোনা’ হচ্ছে পাথর। এই সোনাকে আগলে না রেখে লুট থেকে হরিলুট হতো। বছর বছর সুযোগ এনে দিত পাহাড়ি ঢল। শোনা কথা থেকে জানা হয়, সর্বশেষ ১৯৯০ সালে পাহাড়ি ঢলে সাদাপাথরের স্তূপ পড়েছিল। কিন্তু দেখতে দেখতে লুট। সেই দেখার একটি চোখ কৈশোর পেরিয়ে পরিপক্ব হয়। তার নাম শাহ মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন। তখন তিনি সাদাপাথর এলাকার ইউনিয়ন পশ্চিম ইসলামপুরের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। ২০১৭ সালে প্রথমত তার আহ্বানে ধলাসোনায় প্রথম পা পড়েছিল। তার পর সদলবলে জলজীয় হয়ে ফেরা।
সার্বক্ষণিক নজরদারি, সিসি ক্যামেরা, নৌকা চলাচলে বিধিনিষেধ- কত কিছুই তো শোনা যাচ্ছে! এতসব কথকতার মধ্যে প্রকৃতিবিদরা বলছেন, প্রকৃতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ বা প্রতিস্থাপন করা যায় না। প্রকৃতিকে প্রকৃতির মতো রাখা চাই। প্রকৃতির গতিই সুকীর্তি। কিন্তু সুকীর্তি তথা প্রকৃতিকে প্রকৃত করে রাখার পথে হাঁটছে না কেউ! এ পথে হাঁটলে যন্ত্রদুনিয়ায় বিস্ময়কর জলবাহন ‘বারকি নাও’ চলাচলটি প্রাকৃতিক ও ঐতিহ্যের প্রতীক বলে বিবেচিত হতো।…
ফেরার পথে তখনকার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আবুল লাইছ জানালেন উদ্যোগটির কথা। পাহাড়ি ঢলে জমা পাথরে যাতে আর চোরের হাত না লাগে, সেই বন্দোবস্ত করছেন তিনি। ২০১৮ সালের গ্রীষ্মকালকে সামনে রেখে তখনকার জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ারকে পত্র মারফত প্রশাসনিকভাবে অবহিত করা হয়। সম্মতি পেয়ে সাঁটানো হলো একটি সাইন বোর্ড। সেই সূত্রপাতে প্রথম আলো পত্রিকায় রিপোর্ট করেছিলাম পরপর দুটি। একটি বেড়ানোর আহ্বানে ‘ধলাই নদের উৎসমুখে’। আরেকটি তথ্যগত, ‘ধলাইমুখে জমল ধলাসোনা’। সেই থেকে পর্যটকের পদচারণে ‘সাদাপাথর’ হয়ে গেল বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র।
এরপর দুই বছর পর এল করোনকাল। ধলাসোনায় চোখ রাখা সেই জনপ্রতিনিধি মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন উদ্বিগ্ন। জানালেন, সাদাপাথরে চোরের হাত লেগেছে। লুটের শঙ্কা বিরাজ করছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ইউএনও সুমন আচার্য নিজ এলাকার টানে অন্য কৌশল প্রয়োগ করলেন। সাদাপাথর এলাকা মাপজোখ করার ব্যবস্থা করলেন। মাপ-পরিমাপে মিলল এক এক করে সাতটি পাথরের স্তর। সংরক্ষিত আছে কয়েক লাখ ঘনফুট পাথর। শত কোটি টাকার সম্পদ। সেই সম্পদ সম্ভাবনায় করোনা মহামারির পর আরেক প্রতিবেদন, ‘পথ দেখাবে সাদাপাথর’।
পথসন্ধানে স্থপতি রাজন দাশের চোখে চিত্রিত হয়েছিল বারকি-চত্বর, যা মহাপরিকল্পনায় সাদাপাথরের ঘাট ভোলাগঞ্জ ‘১০ নম্বরে’ স্থাপনের কথা ছিল। ‘ভোলাগঞ্জ ট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যানে’ মনোযোগ দিল জেলা প্রশাসনও। ২০১৮ থেকে ২০২২ মেয়াদের জেলা প্রশাসক কাজী এমদাদুল ইসলাম মহাপরিকল্পনাটি অনুমোদনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সময়ে ঘটে বদলি। ঝুলে পড়ে মহাপরিকল্পনা। সাদাপাথর থাকল প্রাকৃতিক হয়ে, সাদামাটা সুরক্ষার মধ্যে।
এভাবে ‘জিয়ল’ সাদাপাথরে প্রথম লুটের আঁচড় পড়ে রাজনৈতিক পাহাড়ের দিন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাতে। এভাবে দিনকয়েক দেখে রিপোর্ট করলাম। কিন্তু লুটের হাত লুটোপুটো। বন্ধ হচ্ছিল না। সাদাপাথরের পাশেই বাংলাদেশ রেলওয়ের আরেক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। বাংলাদেশের একমাত্র রোপওয়ে (রজ্জুপথ) স্টেশন। বলা হয় ‘বাঙ্কার’। সেখানকার লুটপাট অবস্থা নিয়ে একটি সরেজমিন রিপোর্টের পর নড়েচড়ে বসে রেল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সাদাপাথর যথারীতি জিয়ল থাকে। ৫ আগস্ট পরবর্তী বাস্তবতার এক বছর পূর্তিতে কেমন আছে সাদাপাথর? দেখতে গত ৫ আগস্ট খবরের কাগজের ফটোসাংবাদিক মামুন হোসেন ঘুরে এসে জানালেন সেখানে ক্যামেরা নিয়ে যাওয়া ঝুঁকির। ৬ আগস্ট রিপোর্ট করতে গিয়ে ‘মব সহিংসতার ভয়ে’ ফিরে এলেন সিলেট প্রতিনিধি শাকিলা ববিও। যত না শঙ্কা, তার চেয়ে বেশি কৌতূহল! কারা করছে এমন? কী চায় তারা?
পাহাড়ি ঢল নামল। শুরু হলো লুটতরাজ। ৮ আগস্ট বিকেলে পর্যটকের বেশে সাদাপাথর ঘুরে এসে প্রথম রিপোর্ট, ‘মব মচ্ছবে সাদাপাথরের সর্বনাশ!’ খবরের কাগজের প্রিন্ট ও অনলাইন সংস্করণে এ রিপোর্টের সঙ্গে ছিল মামুন হোসেনের একটি ভিডিও স্টোরি। ‘মব’ ও ‘মচ্ছব’ কথাটি যেন লুটেরাদের শিরোশ্ছেদ করার মতো করে জ্বলে ওঠে। খবরের কাগজে ৯ আগস্ট এ রিপোর্ট প্রকাশের পর সব গণমাধ্যমের মাসাধিককালের আইটেম ছিল সাদাপাথর। এরপর অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রে লুটপাটের ঘটনা ব্যবচ্ছেদ হতে থাকে। এ যেন সেই চিনিকাণ্ডের মতো ঘটনা। ‘দিনে মিলন খান, রাতে চিনি খান!’ অথবা ‘চোরাই চিনির পথে সব সাক্ষীগোপাল!’ অনুসন্ধানে গুহার মুখ খুলতে চিচিং ফাঁক অবস্থা। যদি গুহার গহিন মুখটি না খুলত, তাহলে পরিণতির নিয়তি লেখাই ছিল। হয় দোসর তকমা, না হয় মামলা অথবা মব-মচ্ছবে হামলা!
তা আর হয়নি। সাদাপাথরের সঙ্গে জাফলং-রাংপানি-লোভাছড়া-উৎমা সবই মিডিয়ার ফোকাসে এল। লুটের পাথর ফিরিয়ে দেওয়া, প্রশাসনে রদবদল, লুটেরা চিহ্নিত করতে দুর্নীতি দমন কমিশনের তালিকায় রাজনৈতিক নেতাদের স্বরূপ অতঃপর পাথর লুটের হোতার ধরপাকড়ে সাদাপাথর রীতিমতো খবরখাদ্যে রূপ নেয়। সেই ধারায় সংবাদের ফলোআপ এখনো আছে।
আমার সাংবাদিকতা গৎবাঁধা নয়। সুপ্ত একটি ধারা রয়েছে। তা হচ্ছে ইস্যুভিত্তিক লেগে থাকা, লেগে থেকে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা। সেই প্রশ্ন কখনো কখনো নিজের দিকে তাক করাও থাকে। নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করছি, সাদাপাথরের ভবিষ্যৎ তাহলে কী?
সার্বক্ষণিক নজরদারি, সিসি ক্যামেরা, নৌকা চলাচলে বিধিনিষেধ- কত কিছুই তো শোনা যাচ্ছে! এতসব কথকতার মধ্যে প্রকৃতিবিদরা বলছেন, প্রকৃতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ বা প্রতিস্থাপন করা যায় না। প্রকৃতিকে প্রকৃতির মতো রাখা চাই। প্রকৃতির গতিই সুকীর্তি। কিন্তু সুকীর্তি তথা প্রকৃতিকে প্রকৃত করে রাখার পথে হাঁটছে না কেউ! এ পথে হাঁটলে যন্ত্রদুনিয়ায় বিস্ময়কর জলবাহন ‘বারকি নাও’ চলাচলটি প্রাকৃতিক ও ঐতিহ্যের প্রতীক বলে বিবেচিত হতো।
বারকি বিস্ময়কর জলজীয় একটি বাহন। ব্রিটিশ আমলে উদ্ভাবনকালেই বলা হয়েছে জলের ঘোড়া। জলজীবিকার এ পেশায় বংশ পরম্পরায় নিয়োজিত শ্রমিকদের বলা হয় ‘বারকিশ্রমিক’ যা বাংলাদেশের আর কোথাও নেই। বিশেষায়িত শ্রমিক শ্রেণিকে কাছে টেনে এনে বলা যেত, পৃথিবীর বুকে যন্ত্রবিহীন হাতে বাওয়া একটি অবলম্বন এই সিলেটের জলতল্লাটে ঠিকঠাক টিকে আছে। যেখানে যন্ত্র নয়, মানুষের বলমন্ত্রই ভরসা। সেই ভরসার ইতিহাস প্রায় আড়াই শ বছরের পুরোনো।
না, তা হয়নি! যদি হতো, তাহলে ইতিহাস-ঐতিহ্য সতেজ থাকত।
লেখক: ব্যুরোপ্রধান; সিলেট, খবরের কাগজ