স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হলেও আমাদের দেশে নারীর চলার পথ এখনো মসৃণ নয়। সরকার আসে, সরকার যায়। নারীর এগিয়ে চলার প্রতিবন্ধকতা কিন্তু দূর হয় না। তবে কোনো বাধাই অনেক নারীকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তারা এখন সফলতার শিখরে। দিন দিন এসব নারীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে তার সংখ্যা পুরুষের তুলনায় অনেক কম। এবারের নারী দিবসকে সামনে রেখে নতুন সরকার দীর্ঘ মেয়াদে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় ও ন্যায়বিচারে জোর দিয়েছে।
সরকারের সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে নারীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নে জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নারীর এগিয়ে চলার পথে বাধা কমলেও এখনো দূর হয়নি।
নতুন সরকার গঠনের পর এবার প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপিত হচ্ছে। বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার নির্বাচনি প্রচারে বারবার নারীর ক্ষমতায়ন, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিতের কথা বলেছেন। অথনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। তারেক রহমানের সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করা সরকার এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য নির্বারণ করেছে ‘আজকের পদক্ষেপ আগামীর ন্যায় বিচার: সুরক্ষিত হোক কন্যা ও নারীর অধিকার।’ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এবারে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হচ্ছে।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, আন্তর্জাতিক নারী দিবস, এটি কেবল একটি দিন নয়, এটি দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীক এবং এক নীরব বিপ্লবের নাম। সময়ের পরিক্রমায় এই দিনটি এখন নারীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিকসহ সব ধরনের অর্জন উদযাপনের একটি বৈশ্বিক দিন। দিবসটি লৈঙ্গিক সমতার বিষয়টিও তুলে ধরে। নারীর অধিকার নিশ্চিত এবং নারীর উন্নয়ন-অগ্রযাত্রাকে আরও এগিয়ে নিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের ডাক দেয়।
আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন আরও বলেন, ‘এবারের আন্তর্জাতিক দিবসের প্রতিপাদ্য বিশ্লেষণ করলে দেখবেন, আমরা নারীর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতায়ন, মর্যাদা, অধিকার ও অর্থনৈতিক সক্ষমতায় জোর দিয়েছি। বাহবা পাওয়ার জন্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না।’
১৯৭৫ সাল থেকে জাতিসংঘ ৮ মার্চকে নারী দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। ১৯০৮ সালে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের প্রতিবাদে এবং ন্যায়সংগত দাবি আদায়ে রাজপথে নেমেছিলেন নিউইয়র্কের নারী শ্রমিকরা। এই শ্রম আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ পথপরিক্রমায় চালু হয় ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’।
নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে জানা যায়, ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মূল ভাবনা হলো ‘অধিকার, ন্যায়বিচার এবং সবার জন্য পদক্ষেপ’। প্রতিপাদ্য ও মূল ভাবনা দিয়ে নারী ও কন্যাশিশুদের সমান অধিকার নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সহিংসতা রোধে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, নারীরা আমাদের সমাজের অর্ধেক শক্তি, অর্ধেক মেধা ও অর্ধেক স্বপ্ন। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে এই প্রতিপাদ্য অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ। নারীর উন্নয়ন মানেই সমাজ তথা দেশের উন্নয়ন। নারীর নিরাপত্তা, শিক্ষা ও আত্মমর্যাদা নিশ্চিত না হলে টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। সে লক্ষ্যেই সব ক্ষেত্রে নারীর ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য কাজ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়ে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। সরকারপ্রধানের এই নির্দেশে, ‘নারীদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে সমতা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করার কথা বলেছেন। শুধু আলোচনা নয়, কর্মক্ষেত্রে ও সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য নিরসনে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ায় জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নারীর স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে টেকসই বিনিয়োগ ও সমসুযোগ তৈরি করতে কাজ করতে বলেছেন। ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতা দূর করে নারী ও কন্যাশিশুদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণে গুরুত্ব দিয়েছেন। সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর অবদানকে স্বীকৃতি, তাদের মতামত ও অংশগ্রহণকে প্রাধান্য দিয়েছেন।’
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালিকা ড. ফাহমিদা খাতুন খবরের কাগজকে বলেন, আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নারীর সাহসিকতা ও অবদানের প্রতি সম্মান জানিয়ে, তাদের সম-অধিকারের জন্য লড়াইকে এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়। দিবসটি অত্যন্ত গুরিত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু এ দিবসকেন্দ্রিক প্রতিপাদ্য আর ভাবনা নারীর অধিকার নিশ্চিত করবে না। নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে হলে দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা করে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতকেও ভূমিকা রাখতে হবে।
নারীকে ঘরে আটকে রাখার ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো না। বাংলার অসংখ্য মুসলিম নারী যখন সামাজিক বঞ্চনা ও অবিচারকে মেনে নিয়ে কঠোর পর্দার আড়ালে ঘরের চার দেয়ালকেই আপন ভুবন মনে করেছেন, তখন জ্ঞান সাধনায় মগ্ন ছিলেন বেগম রোকেয়া। নিজেকে প্রস্তুত করে নারী জাগরণের অগ্রদূত হয়ে উঠেন।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালিকা রাশেদা কে চৌধূরী খবরের কাগজকে বলেন, সরকার আসে সরকার যায়, আমার প্রশ্ন নারী জাগরণের যে স্বপ্ন বেগম রোকেয়া দেখেছিলেন, তা কতটা পূরণ হয়েছে? এখনো যখন দেখি বাড়ির কন্যাশিশুটিকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, শিশু ধর্ষণের পরও বিচার নিয়ে বিভিন্ন অজুহাত দেওয়া হচ্ছে। পারিবারিক সম্পত্তি থেকে কন্যা ও নারীকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তখন মনে প্রশ্ন আসে, কবে হবে নারীর মুক্তি, কবে মিলবে মর্যাদা? নতুন সরকার এবারের নারী দিবসে যে প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে, তা যেন মূল্যায়ন করে পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এগিয়ে চলেছেন নারী। অনেক নারী আকাশে বিমান উড়াচ্ছেন। কেউ কেউ হিমালয়ের চূড়ায় উঠেছেন। বন্দুক কাঁধে যুদ্ধেও গেছেন। নিয়োগের অনেক পরীক্ষায় নারীকে পিছিয়ে রাখা যাচ্ছে না, নিজের মেধা ও যোগ্যতার প্রমাণ রাখছেন সরকারি-বেসরকারি চাকরিতেও। ছোট-বড় ব্যবসায়ও নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। শিক্ষায় বাড়ছে নারীর অংশগ্রহণ। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে রপ্তানি আয়ের চাকা পর্যন্ত ঘোরাচ্ছেন নারীরা। রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরতদের ৮০ শতাংশের বেশি নারী।
নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন ওয়েবের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী নাসরিন ফাতেমা আউয়াল মিন্টু খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ দেশে নারীর অগ্রযাত্রা মসৃণ নয়। অনেক বাধার পাহাড় ডিঙাতে হচ্ছে তাদের। ভয়কে জয় করে, বাধাকে ডিঙিয়ে, সব প্রতিবন্ধকতাকে ‘না’ বলেই নারীকে পথ চলতে হচ্ছে। কেউ তার আসার বা এগোনোর পথ তৈরি করে দেয়নি। এ পর্যায়ে আসতে এবং টিকে থাকতে নারীকে সাহস দেখাতে হয়েছে। কিন্তু এখনো অনেক জায়গায় নারীকে আটকে দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে। পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজে নারীকে টিকে থাকতে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। সরকারের কাছে দাবি ভোটারের অর্ধেক নারী। নারীর অধিকার রক্ষায় জোর দেওয়া হোক।
বার্জার পেইন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশে শিক্ষিত নারীর চাকরি মানে স্কুল-কলেজের শিক্ষিকা বা হালকা পরিশ্রমের কিছু। স্বামী-সন্তান-সংসার সামলে যদি সময় মেলে তবেই পরিবার থেকে তা করার অনুমতি জোটে। সরকারি চাকরিতে দু-চারজনকে দেখা গেলেও বেসরকারি চাকরিতে নারীর উপস্থিতি এখনো কম। নিজস্ব উদ্যোগে ব্যবসা করছেন, এমন নারীর সংখ্যা এখনো কম। দেশকে এগিয়ে নিতে করপোরেট হাউস, মোবাইল কোম্পানি, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক, কলকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ফ্যাশন হাউস ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
তিনি আরও বলেন, নারীর উপার্জনে পরিবারে সচ্ছলতা এলেও এখনো নারীরা বৈষম্যের শিকার। কর্মক্ষেত্রে মজুরি কম পাচ্ছেন নারী। নানা সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। এখনো এ দেশে সংসার এবং পরিবারের জন্য নারীর কাজ শ্রম হিসেবে বিবেচিত হয় না। কর্মক্ষেত্রে একই কাজ করেও একজন পুরুষের তুলনায় অনেক সময় কম বেতন ও পারিশ্রমিক পান নারী। সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের গবেষণায় পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, কর্মক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীর কাজে মনোযোগ বেশি। অথচ একজন নারীর তুলনায় পুরুষ বেতন পান অনেক বেশি। দীর্ঘ মেয়াদে নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।