নারীর প্রতি সম্মান- এটি কেবল ভদ্র আচরণ বা সামাজিক সৌজন্যের বিষয় নয়; বরং নারীর অধিকার ও মর্যাদার স্বীকৃতি। অর্থাৎ নারীকে একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে দেখা, তার সিদ্ধান্তকে মূল্য দেওয়া এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই প্রকৃত সম্মানবোধের প্রকাশ। একটি সমাজের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার এবং সামগ্রিক উন্নয়নের মানদণ্ডও অনেকাংশে নির্ভর করে নারীর প্রতি সেই সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। অথচ বাস্তবতা হলো, এখনো দেশের বহু পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পুরুষের মতামতই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়।
নারী অধিকার কর্মীদের মতে, সমাজে নারীর সম্মানকে প্রায়ই ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে নারীর স্বাধীনতা সীমিত করাকেই ‘সম্মান রক্ষা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু প্রকৃত সম্মান হলো– নারী নিজের জীবন, শিক্ষা ও পেশা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে মতামত দিতে পারবেন এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। অর্থাৎ তার ব্যক্তিসত্তা, অধিকার ও মর্যাদাকে স্বীকৃতি দেওয়া।
বিভিন্ন জরিপের তথ্য বলছে, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে বেশির ভাগ নারী পরিবার ও সামাজিক-অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে সরাসরি মতামত দেওয়ার সুযোগ পান না। শুধু তাই নয়; পরিবার, সমাজ, কর্মক্ষেত্র কিংবা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দায়িত্বে থাকা অনেক নারীকেও জীবনের কোনো না কোনো সময় অসম্মান, কটূক্তি কিংবা সহিংসতার শিকার হতে হয়। নারীদের পাশাপাশি মেয়ে শিশুদের প্রতিও সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশে ৫ হাজারের বেশি শিশু ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী ও সমাজকর্মী খুশী কবির মনে করেন, নারীর প্রতি সম্মান মানে প্রধানত তাকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। তার ভাষায়, “নারীর অধিকারকে স্বীকার করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরে তাকে অংশীদার হিসেবে দেখা– এটিই প্রকৃত সম্মানবোধের পরিচয়।” তিনি বলেন, পুরুষের মানসিকতায় সমতার চর্চা না বাড়লে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ সমাজে নারীর প্রতি যে সহিংসতা ও বৈষম্য দেখা যায়, তার বড় কারণ সংকীর্ণ মানসিকতা। তাই নারীর প্রতি সম্মানবোধ গড়ে না উঠলে শুধু আইন করেও পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে গত দুই দশকে নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের ভর্তির হার এখন ছেলেদের সমপর্যায়ে, অনেক ক্ষেত্রে বেশি। উচ্চশিক্ষায়ও নারীর অংশগ্রহণ প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। তবুও শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ এখনো প্রায় ৩৬ থেকে ৩৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যেখানে পুরুষের অংশগ্রহণ ৮০ শতাংশেরও বেশি।
এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক বাস্তবতার ফল নয়; এর পেছনে রয়েছে সামাজিক মানসিকতা, ক্ষমতার কাঠামো এবং নারীর প্রতি সম্মানবোধের ঘাটতি। ফলে শিক্ষায় নারীর অগ্রগতি হলেও পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এখনো অনেক সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লিঙ্গসমতার সংগ্রাম কেবল নারীর একার নয়; এটি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সামগ্রিক সামাজিক রূপান্তরের প্রক্রিয়া।
নারীর প্রতি সম্মানবোধের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় কর্মক্ষেত্র ও রাজনীতিতে। দেশের প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের অর্ধেক নারী হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন তালিকায় নারী এখনও খুবই কম। সাম্প্রতিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে নারীর অবস্থান নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা নতুন করে এই প্রশ্ন সামনে এনেছে– সমাজ ও রাজনীতিতে নারীর প্রতি সম্মানবোধ আসলে কতটা বাস্তব, আর কতটা প্রতীকী।
কর্মক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪৪ শতাংশ নারী। তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে নারীর শ্রম দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তারা মজুরি বৈষম্য, পদোন্নতিতে বাধা কিংবা কর্মক্ষেত্রে হয়রানির মুখোমুখি হন।
খুশী কবির বলেন, সমাজে এখনো অনেক পুরুষ মনে করেন নারীর প্রধান ভূমিকা ঘরের ভেতর সীমাবদ্ধ। তাদের ধারণা, নারী কেবল সন্তান জন্ম দেবে, সন্তান লালনপালন করবে এবং পরিবারের কাজ সামলাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো– নারী শিক্ষা, অর্থনীতি ও রাজনীতিসহ সমাজের প্রায় সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রে নারীর অধিকারকে স্বীকার করা হয় না, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তরে তাকে অংশীদার করা হয় না।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই পরিস্থিতির পরিবর্তনের জন্য পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। কারণ সমাজের অধিকাংশ ক্ষমতার জায়গায় এখনো পুরুষের প্রভাব বেশি। লিঙ্গসমতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা সামাজিক মানসিকতা ও সমতার মূল্যবোধের অভাব। ফলে নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়লেও পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামো সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, নারীর প্রতি সম্মান ও সমতার মূল্যবোধের চর্চা শুরু করতে হবে পরিবার থেকেই। ছেলেশিশুরা যদি ছোটবেলা থেকেই দেখে যে মা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, কাজ করছেন এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা তাকে সম্মান করছেন– তাহলে ভবিষ্যতে তারাও সেই মূল্যবোধ নিয়ে বড় হবে। গবেষণায়ও দেখা গেছে, যে পরিবারে ছেলেশিশুরা মায়ের কর্মজীবন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্রিয়তা দেখে বড় হয়, তারা ভবিষ্যতে নারীর প্রতি বেশি সম্মানশীল ও সহনশীল হয়।
পরিবর্তনের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে লিঙ্গসমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ধারণা আগের তুলনায় অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হচ্ছে। শহরাঞ্চলে গৃহস্থালির কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ, কর্মজীবী নারীদের প্রতি সমর্থন এবং নারী অধিকার বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা– এসব পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীর প্রতি সম্মানবোধ গড়ে তুলতে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক নীতিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাঠ্যবইয়ে লিঙ্গসমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মূল্যবোধ অন্তর্ভুক্ত করা, গণমাধ্যমে ইতিবাচক উপস্থাপন এবং পরিবারে দায়িত্বের সমবণ্টন– এসব উদ্যোগ দীর্ঘ মেয়াদে সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি ও মানব উন্নয়ন সূচকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই অগ্রগতিকে টেকসই করতে হলে নারীর প্রতি সম্মানবোধকে সামাজিক সংস্কৃতির অংশে পরিণত করতে হবে। কারণ নারীর প্রতি সম্মান মানে কেবল সৌজন্য নয়– এটি অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার স্বীকৃতি।