সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেপ্তার সাখাওয়াত হোসেন (৩৪) ও সাইম হোসেনের (২০) বিলাসী জীবনযাপন নিয়ে সন্দেহ ছিল গ্রামবাসীর। পানির ফিল্টার বিক্রি ও মেরামতের ব্যবসা থেকে হঠাৎ কোটিপতি বনে যাওয়া সাখাওয়াত হোসেন প্রাথমিকের গণ্ডি পার হতে পারেননি। অথচ যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ তার এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেড়ানো এবং ফেসবুক আইডিতে সেই ছবি পোস্ট নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে আলোচনা-সমালোচনাও কম হয়নি।
সাখাওয়াত হোসেন ও সাইম হোসেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার ইচাইল গ্রামের সাহেদ আলীর ছেলে। তিনি ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া বাইপাস এলাকায় ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করছেন। সেখানে ভাগনি কমলা খাতুনের বাসায় বসবাস করেন সাহেদ আলী। অন্তত ৪০ বছর ধরে তিনি এই পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এ পেশায় থাকা সাহেদ আলী এখনো নিজের আধা পাকা ঘরের বারান্দায় প্লাস্টার সম্পন্ন করতে পারেননি।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গত ৮ জুলাই সিআইডির করা মামলায় সাখাওয়াত এজাহারভুক্ত ১৪ নম্বর এবং সাইম ১৫ নম্বর আসামি। সাখাওয়াত দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে বড়। তিনি হাফেজিয়া মাদ্রাসায় কয়েক মাস লেখাপড়া করেন। ১২ বছর আগে তিনি নিজ এলাকায় অটোরিকশার ব্যাটারির ‘অ্যাসিডের ব্যবসা’ করতেন। সেই ব্যবসা তেমন ভালো না চলায় ছেড়ে দেন। পরে রাজধানীর রাজারবাগ এলাকায় নতুন পানির ফিল্টার বিক্রি ও পুরোনো পানির ফিল্টার মেরামতের ব্যবসা শুরু করেন। তার প্রতিষ্ঠানের নাম সাখাওয়াত এন্টারপ্রাইজ। সেটির সিইও হিসেবে পরিচয় দিতেন সাখাওয়াত। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঢাকাতেই থাকতেন সাখাওয়াত। তার সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকত। মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করে সংসার চালাতেন। তবে এখন ঢাকায় একটি ফ্ল্যাটবাড়ি কিনেছেন তিনি। ময়মনসিংহ নগরীর বাইপাসেও তার জমি আছে। দুই বছর আগে প্রাইভেট কার কিনেছেন। রেখেছেন ড্রাইভারও। ২০১৯ সাল থেকে সাখাওয়াত হোসেন হঠাৎ বিদেশ সফর শুরু করেন। লন্ডন, কানাডা ছাড়াও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেড়াতেন। তার ফেসবুক আইডিতে এসব ছবি পোস্ট করতেন।
আর সাইম ২০১৮ সালে স্থানীয় একটি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে কলেজে ভর্তি হলেও আর পড়াশোনা করেননি। দুই বছর আগে সাইম বড় ভাই সাখাওয়াতের সঙ্গে ব্যবসায় যুক্ত হন। তাদের বোন ঢাকায় একটি ব্যাংকে চাকরি করেন। আর ছোট বোন ময়মনসিংহের একটি বেসরকারি নার্সিং কলেজে পড়ছেন। হঠাৎ করে সাখাওয়াত ও সাইম বিলাসী জীবনযাপন করতে থাকেন। এতে গ্রামবাসীর মধ্যে তাকে নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। অল্প সময়ে এত টাকা আয়ের বিষয়ে সন্দেহ হয় সবার। পিএসসির প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর দুই ভাই নতুন করে এলাকায় আলোচনায় আসেন।
আব্দুল হাই নামে এক গ্রামবাসী খবরের কাগজকে বলেন, ‘একসময় সাখাওয়াত অভাব-অনটনে থাকলেও অল্পদিনে অনেক টাকার মালিক হয়েছেন। টাকা আছে বলেই প্রাইভেট কারে চড়ে বাড়িতে আসতেন। শুনেছি, ঢাকায় বিলাসী জীবনযাপন করেন। তিনি অপরাধী হয়ে থাকলে শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।’
সাখাওয়াতের ফুপাতো বোন আছিয়া বেগম বলেন, ‘সাখাওয়াত ও সাইমের মা কিশোয়ারা বেগম ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ১২ বছর আগে মারা যান। সাখাওয়াত গ্রামের বাড়িতে কোনো সম্পত্তি কেনেননি। তিনি প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে টাকা কামিয়েছেন কি না আমার জানা নেই।’
এদিকে সাহেদ আলী বলেন, ‘দুই বছর আগে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ব্র্যাক ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে ১১ লাখ টাকায় প্রাইভেট কার কিনেছে সাখাওয়াত। ব্যবসার ওপর ছেলেদের কোটি টাকার ব্যাংকঋণ আছে। আমার ছেলেদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।’
কে ষড়যন্ত্র করেছে, জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলে কোম্পানির পক্ষ থেকে বিদেশে ঘুরতে যেত।’
তবে ছেলে কোন কোম্পানি থেকে বিদেশে গিয়েছেন, জানতে চাইলে তারও কোনো উত্তর দিতে পারেননি তিনি।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে সাহেদ আলী বলেন, ‘আমার ছেলে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রে জড়িত না। আমার ছেলেরা ব্যবসায় যেহেতু এগিয়ে যাচ্ছে, সে জন্য তাদের দাবিয়ে রাখার জন্য এসব কথা বলা হচ্ছে।’
এ বিষয়ে ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন বাদল খবরের কাগজকে বলেন, ‘সাহেদ আলীর পারিবারিক অবস্থা ভালো না। যদি তার ছেলেরা কোনো অন্যায় কাজের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী শাস্তি হওয়া উচিত।’