ঢাকা ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংকট মনপুরায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে কেন্দ্র করে মামলা, ছাত্রলীগ নেতা কারাগারে বাজেট বাস্তবায়নে ছলচাতুরি চলবে না: চরমোনাই পীর আকাশসীমা পুনরায় খুলে দিয়েছে ইরাক ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে: মাহদী আমিন যেকোনো সাফল্যে যে দোয়া পড়তেন বিশ্বনবি (সা.) রৌমারীতে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে নারীর মৃত্যু ইন্টার্ন ও ট্রেইনি চিকিৎসকদের কর্মবিরতি প্রত্যাহার ইসরায়েলবিরোধী সামরিক অভিযান স্থগিতের ঘোষণা ইরানের শেরপুরে ১২ দিনে পাঁচ শিক্ষার্থী নিখোঁজ, অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ জঙ্গল সলিমপুরে সড়ক নির্মাণকাজ শুরু করেছে সেনাবাহিনী ভাঙ্গায় বিয়েবাড়িতে খাবার নিয়ে সংঘর্ষে আহত ৭ হালুয়াঘাটে ছুরিকাঘাতে প্রাণ গেল যুবকের কালিহাতীতে ট্রেনে কাটা পড়ে গৃহবধূর মৃত্যু, পাশে মিলল আরেক নারীর মরদেহ ঝিনাইদহে ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল জাতীয় মুট কোর্ট প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন ঢাবি পবিপ্রবিতে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম হেমায়েত জাহান পঞ্চগড় সীমান্তে পুশইনের চেষ্টায় ১০ জনকে ফিরিয়ে নিলো বিএসএফ গাজীপুরে চাঁদাবাজির অভিযোগে জনতার হাতে যুবদল নেতা আটক বাউফলে জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে এসিল্যান্ডের স্বাক্ষর নকলের অভিযোগ চমেকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দ্বিতীয় দিনের কর্মবিরতি সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে সাপাহারে মতবিনিময় সভা বছরে ৮ বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ রুমিন ফারহানার উচ্চশিক্ষা নয়, নৈতিক শিক্ষায় বড় হও জবানের যে ছোট্ট কথায় অফুরন্ত সওয়াব মেলে সমুদ্র বাঁচলে পৃথিবী বাঁচবে ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু বরগুনায় নিখোঁজ ব্যবসায়ীর মাথাবিহীন মরদেহ উদ্ধার মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ট্রেড ফাইন্যান্স অ্যানালিটিক্স সফটওয়্যার উদ্বোধন শাওমি নিয়ে এল ৯.৭ ইঞ্চির নতুন রেডমি প্যাড ২
Nagad desktop

থমকে আছে আবাসন শিল্প

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৪, ০২:১৯ পিএম
আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৪, ০৩:৪৬ পিএম
থমকে আছে আবাসন শিল্প
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

ঢাকাকে বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তুলতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) নতুন ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান বা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা তৈরি করেছে, যা ‘ড্যাপ’ নামে পরিচিত। গত বছরের আগস্ট থেকে এটি কার্যকর করা হয়। কিন্তু শুরু থেকে ড্যাপ (২০২২-৩৫) নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা চলছে।

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) নেতারা বলেছেন, নতুন ড্যাপ বৈষম্যমূলক। বর্তমানে আবাসনশিল্পে যে সংকট চলছে তাতে প্রধান সমস্যা এই ড্যাপ। এটি আবাসন খাতের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা ড্যাপ সংশোধনের দাবি জানিয়ে বলেন, এটি সংশোধন না করা হলে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে দেশের কর্মসংস্থানে অবদান রাখা আবাসন খাত।

কী আছে নতুন ড্যাপে

খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ড্যাপের খসড়া পরিকল্পনায় ফ্লোর এরিয়া রেশিওর (এফএআর) ভিত্তিতে ভবনের আয়তন নির্ধারণের সুপারিশ করে রাজউক। এতে গুলশান, বনানী কিংবা ধানমন্ডির মতো পরিকল্পিত এলাকার তুলনায় মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, বাসাবোসহ অপরিকল্পিত এলাকায় ভবনের আয়তন কম নির্ধারণ করা হয়। এ কারণে বেশির ভাগ এলাকায় আগে ফ্ল্যাট তৈরির জন্য যে আয়তন বা জায়গা পাওয়া যেত, সে তুলনায় এখন ৬০ শতাংশ পাওয়া যাবে। এতে জমির মালিক, ডেভেলপার কোম্পানি ও ক্রেতা সবাই ক্ষতির মুখে পড়বেন। 

নতুন ড্যাপ অনুযায়ী, আবাসন খাতের জন্য ভবন নির্মাণে পরিকল্পিত এলাকা যেমন- গুলশানে পাঁচ কাঠা জায়গায় ফ্লোর এরিয়া রেশিও বেশি ধরা হয়। ফলে গুলশানে উঁচু ভবন করা যাবে। ফ্ল্যাটসংখ্যা বেশি হবে। পক্ষান্তরে অপরিকল্পিত এলাকা যেমন- বাসাবোতে পাঁচ কাঠা জায়গায় ফ্লোর এরিয়া রেশিও কম থাকায় বাসাবোতে সবোর্চ্চ চার থেকে পাঁচ তলার বেশি ভবন করা যাবে না। ফলে ফ্ল্যাটসংখ্যাও কম হবে। অর্থাৎ যেসব এলাকায় যত বেশি এফএআর, সেখানে ভবনের আয়তন তত বেশি পাওয়া যায়। ফলে ফ্ল্যাটসংখ্যাও বেশি হবে।

রিহ্যাব নেতারা বলেন, ড্যাপে পরিকল্পিত ও অপরিকল্পিত এলাকার জন্য পৃথকভাবে ভবন নির্মাণের যে ফ্লোর এরিয়া রেশিও বা এফএআর নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি বৈষম্যমূলক। নির্দিষ্ট কিছু সুবিধাভোগী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় এমনটি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। 

নতুন ড্যাপের কারণে আবাসন ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে দাবি করছেন আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা। তারা বলেছেন, ড্যাপ কার্যকর হওয়ার পর থেকে জমির মালিকরা ভবন করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। নতুন প্রকল্পও নেওয়ার হার কমেছে। ড্যাপ সংশোধন না হলে ফ্ল্যাটের দাম বেড়ে যাবে। এমনিতেই এই ব্যবসায় মন্দা চলছে। নতুন ড্যাপের কারণে মন্দা আরও গভীর হয়েছে। 

রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী তানভীরুল হক প্রবাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘ড্যাপের সমস্যা নিরসন হচ্ছে না বলে ডেভেলপাররা নতুন প্রজেক্ট নিতে পারছে না। বসুন্ধরা, ধানমন্ডিসহ পরিকল্পিত এলাকায় ফ্লোর এরিয়া রেশিও বেশি ধরা হয়েছে নতুন ড্যাপে। এটি যত বেশি হবে, তত বেশি উচ্চ ভবন করা যাবে। কিন্তু মিরপুর, বাড্ডাসহ অপরিকল্পিত এলাকায় ফ্লোর এরিয়া রেশিও কম। ফলে এসব এলাকায় পাঁচতলার বেশি উঁচু ভবন করা যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরে পরিকল্পিত এলাকা খুবই কম। ৯০ শতাংশই অপরিকল্পিত এলাকা। নতুন ড্যাপে পরিকল্পিত ও অপরিকল্পিত এলাকায় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে জমির মালিক, ডেভেলপার কোম্পানি ও ফ্ল্যাটের ক্রেতা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’

রাজউক বলেছে, শহরের জনসংখ্যার ঘনত্ব কমানোর জন্য অপরিকল্পিত এলাকায় ফ্লোর এরিয়া রেশিও কমানো হয়েছে। এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে রিহ্যাবের সাবেক এই নেতা বলেন, ‘এ ধারণা ঠিক নয়। আমি মনে করি, ভবনের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ করে জনসংখ্যার ঘনত্ব কমানো যাবে না। সারা দুনিয়ায় এখন উঁচু ভবন হচ্ছে।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘ড্যাপ সংশোধন করলে আবাসন খাত চাঙা হবে। এটি করা হলে জমির মালিক, ডেভেলপার ও ক্রেতা সবাই উপকৃত হবেন।’

রিহ্যাব অপরিকল্পিত এলাকায় ভবনের আয়তন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রস্তাবিত বিধিমালা সংশোধনের একগুচ্ছ প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে রাজউককে দিয়েছে। রাজউক বলেছে, তারা প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করবে। রিহ্যাবের সহসভাপতি আবদুল লতিফ খবরের কাগজকে বলেন, ‘২০ অক্টোবর রাজউকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে। রাজউক চেয়ারম্যান আমাদের দাবিগুলো মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।’ তিনি বলেন, ড্যাপের কারণে পুরো সেক্টরই স্থবির হয়ে গেছে। নতুন নিয়মে জমির মালিকরা ভবন নির্মাণে উৎসাহিত হচ্ছেন না। আবার ডেভেলপারদেরও পোষাচ্ছে না। যার জন্য এই সেক্টরে একটা কৃত্রিম শূন্যতা তৈরি হয়েছে। দুই বছর ধরে এই শূন্যতা চলছে বলে জানান তিনি। ড্যাপ সংশোধন হলে এই সেক্টর আবার চাঙা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

রাজউক ২০২০ সালে দ্বিতীয় ড্যাপের (২০২২-৩৫) খসড়া প্রকাশ করে। গত বছরের আগস্টে পাস হওয়া এই ড্যাপ ছয়টি স্বতন্ত্র অঞ্চলে বিভক্ত। সেগুলো হচ্ছে কেন্দ্রীয় অঞ্চল: ঢাকা শহর, উত্তর অঞ্চল: গাজীপুর সিটি করপোরেশন, পূর্ব অঞ্চল: কালীগঞ্জ ও রূপগঞ্জ উপজেলা, দক্ষিণ অঞ্চল: নারায়ণগঞ্জ, দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল: কেরানীগঞ্জ উপজেলা এবং পশ্চিম অঞ্চল: সাভার উপজেলা।

রিহ্যাবের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘ড্যাপের সমস্যার সমাধান না হলে আবাসনশিল্প কোনো দিন ভালো হবে না। ঢাকা শহরের ৯০ শতাংশই অপরিকল্পিত এলাকা। নতুন ড্যাপের ফলে ওই সব এলাকায় পাঁচতলার ওপরে ভবন করতে দিচ্ছে না রাজউক। ফলে ওই সব এলাকায় নতুন কোনো ভবন তৈরি হচ্ছে না। আমরা ড্যাপের সংশোধনী চাই। আগের নিয়মে ফিরে যেতে চাই। যেখানে ভবন নির্মাণে এলাকাভেদে কোনো পার্থক্য থাকবে না।’ এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের সব দেশেই সুউচ্চ ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ভবনের বেশি আয়তন বা

উচ্চতা দিলে ঢাকা আরও বেশি বাসযোগ্য হবে।’ 
রিহ্যাবের সভাপতি ওয়াহিদুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ মুহূর্তে আবাসন খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা ড্যাপ। এ সংকটের সমাধান না হলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে আবাসন খাত।’

নির্মাণসামগ্রীর দাম আকাশছোঁয়া

ডলারসংকট, কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতাসহ নির্মাণশিল্পের অন্যতম উপকরণ রড, সিমেন্টসহ প্রায় সব ধরনের উপকরণের দাম বেড়ে গেছে অস্বাভাবিকভাবে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে এখনো প্রতি টন রড গ্রেডভেদে ৯০ থেকে ৯২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঢাকার বাইরে দাম আরও বেশি। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, ‘বড় বড় আবাসন কোম্পানি থেকে শুরু করে ব্যক্তিপর্যায়ে অনেকে নির্মাণকাজ করলেও সরকার পরিবর্তনের ফলে উন্নয়নের কাজে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। তাই রডের চাহিদা কমে গেছে। তবে চাহিদা কমলেও দাম কমেনি।’ 

রিহ্যাব নেতারা বলেন, ঢাকায় ফ্ল্যাটের দাম আগে থেকেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। বিভিন্ন কারণে নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ায় মধ্যবিত্তের ফ্ল্যাট কেনা এখন দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনিতেই আবাসন খাত এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। এর মধ্যে নির্মাণসামগ্রীর দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এতে ফ্ল্যাট বিক্রি তলানিতে পৌঁছেছে।

রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি বিল্ডিং ফর ফিউচার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীরুল হক প্রবাল বলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে ভোক্তারা এখন আগের মতো ফ্ল্যাট ক্রয়ে উৎসাহী নয়। অনেক দিন ধরে আবাসন ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে। ড্যাপের কারণে মন্দা আরও বেশি হয়েছে।’

বিএনপির ১৩ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:২৪ এএম
বিএনপির ১৩ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

দেশের অর্থনীতি সংকটে আছে। রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি নেই। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সর্বনিম্ন। এমন প্রেক্ষাপটেও আগামী অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বিএনপির ১৩ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা থাকছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেটবিষয়ক প্রতিবেদন থেকে এসব জানা যায়। 

প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, বাজটে বক্তৃতায় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচির কথা থাকছে। এলাকাভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এভাবে একগুচ্ছ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। 

সূত্র জানায়, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের বাজেট দিতে যাচ্ছে তারেক রহমানের সরকার। গতকাল পর্যন্ত এ বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে হিসাব কষা হয়েছে। ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলেছেন, সরকার বিভিন্ন সংকটে আছে। আর তাই আগামী বাজেটে বিএনপি সরকারের নির্বাচনি সব প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব না হলেও বেশির ভাগই থাকছে। এসব প্রতিশ্রুতির বেশির ভাগই সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের পরিবর্তে পাইলট প্রকল্প হিসেবে আনা হবে। 

অর্থনীতির সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েই রেকর্ড ঘাটতির বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। বাজেটে অর্থায়নে যে সূত্র আঁকা হয়েছে, তা সফল না হলে সমগ্র অর্থনীতি চাপে পড়বে। 

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের সরকার। বিএনপি নির্বাচনের আগে যেসব অঙ্গীকার করেছে, আগামী বাজেটে তার বেশির ভাগই থাকবে। অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন আগামী বাজেট থেকে শুরু করা হবে। পরে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ বাস্তবায়নে যাবে। 

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, দেশের অর্থনীতি এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে সংকটে আছে। বিগত দুই সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছি। এমন পরিস্থিতিতেও বড় অঙ্কের বাজেট দেওয়া হবে। এই বাজেট বাস্তবায়নে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে আয়ের খাত বাড়ানো হয়েছে। 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বড় অঙ্কের বাজেটে অর্থায়ন করতে হলে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। কিন্তু আমরা জানি চলতি অর্থবছরের গত ১১ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রেকর্ড রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। আগামীতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে তা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছি। এতে অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে।’ 

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেছেন, দেশের অর্থনীতি সংকটে ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনীতির সংকট বেড়েছে। সরকার ও ব্যক্তি খাত–দুই খাতই ভালো নেই। এমন পরিস্থিতিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন, উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে। তবে সরকার যত সংকটেই থাকুক না কেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ দিতে হবে। নির্বাচনের আগে বিএনপি যেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা বলেছে, তার বেশির ভাগ আগামী বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও সব বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। আগামী অর্থবছরে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো প্রতিশ্রুতি পাইলট প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। 

আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার, কোন খাতে কত ব্যয় ধরা হবে, কোন খাত থেকে কত আয় করা হবে, এনবিআর ও এনবিআরবহির্ভূত খাত থেকে আয় নির্ধারণসহ বাজেটের বিভিন্ন হিসাব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কয়েক দফা বৈঠক করেন। অনেক বিষয় নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকেও আলোচনা হয়। এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানসহ বাজেট প্রস্তুত কমিটির কর্মকর্তাদের সঙ্গেও পৃথকভাবে প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করেন। সবার মত নিয়ে যাচাই-বাছাই করে প্রস্তাবিত বাজেটের সারসংক্ষেপ প্রণয়ন করা হয়েছে। 

আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের পর ৩০ জুন পর্যন্ত আলোচনা হবে। এরপর তা চূড়ান্ত করে ১ জুলাই থেকে বাস্তবায়ন করা হবে। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি। আসন্ন অর্থবছরের বাজেট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে চলতি বাজেটের তুলনায় ১৮.৭৩ শতাংশ বেশি, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড বৃদ্ধি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে মোট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা ভাবা হচ্ছে, যা আগের বছরের তুলনায় অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি। উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর হিসাব পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বাজেটে সরকারের পরিচালন ও অন্যান্য ব্যয় ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের এনবিআর থেকে ৬ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা, নন-এনবিআর ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং এনটিআর খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা ধার্য করা হয়েছে। অর্থায়নের ক্ষেত্রে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে ১৫ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। 

প্রতিষ্ঠিত সন্তানের বাবা-মায়ের শেষ ঠিকানা কেন বৃদ্ধাশ্রম?

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৮:৪৯ এএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:০৭ এএম
প্রতিষ্ঠিত সন্তানের বাবা-মায়ের শেষ ঠিকানা কেন বৃদ্ধাশ্রম?
ছবি: খবরের কাগজ

মিরপুরের ৭৫ বছর বয়সী নূরজান বেগম। মৃত্যুর পর কয়েক দিন তার মরদেহ পড়ে ছিল ঘরের ভেতর। কয়েক দিন পর একই এলাকায় ৫৫ বছর বয়সী আফরোজা নামের আরেক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের সন্তানরা কেউ রাষ্ট্রের উচ্চপদে কর্মরত, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত জীবন গড়েছেন।

অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমানও দীর্ঘদিন উত্তরার নিজ ফ্ল্যাটে একা থাকতেন। স্ত্রী ও একমাত্র মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতেন। শিক্ষক, গবেষক ও বিশ্লেষক হিসেবে তিনি ছিলেন দেশের পরিচিত মুখ। অথচ জীবনের শেষ মুহূর্তে তিনিও ছিলেন নিঃসঙ্গ। এই ঘটনাগুলো শুধু কয়েকজন মানুষের মৃত্যুর গল্প নয়। এগুলো এমন এক সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে, জীবনযাত্রার মান বাড়ছে, কিন্তু পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। 

দ্রুত বাড়ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৪ লাখেরও বেশি, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬.১৪ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক দশকে এই সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়বে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সাড়ে তিন থেকে চার কোটির বেশি হবে। তখন দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ থেকে ২২ শতাংশই হবেন প্রবীণ।

অর্থাৎ আগামী বাংলাদেশ হবে অনেক বেশি বয়স্ক মানুষের বাংলাদেশ। কিন্তু সেই মানুষের জন্য কি দেশ প্রস্তুত?

সাবেক উপদেষ্টা ও সমাজকর্মী ফরিদা আখতার মনে করেন, আলোচনায় আসা ঘটনাগুলো কেবল দৃশ্যমান অংশ। তিনি বলেন, ‘মিরপুরের ঘটনাটি সামনে এসেছে, তাই আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু সারা দেশে এমন অনেক ঘটনা ঘটছে, যা আমাদের সামনে আসে না। অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা একাকিত্বে জীবন কাটাচ্ছেন। কেউ তাদের খোঁজ রাখছেন না।’

তার মতে, যৌথ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, পরিবার ছোট হচ্ছে, ছেলেমেয়েরা বিয়ের পর আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ফলে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে। ‘বাবা-মা সন্তানকে আদর-যত্ন করে বড় করলেন, লেখাপড়া শিখিয়ে প্রতিষ্ঠিত করলেন। অথচ সেই সন্তান যদি বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের খোঁজ না রাখে, সেটি শুধু অমানবিক নয়, সামাজিক অন্যায়ও’ বলেন তিনি।

তার মতে, যেসব সন্তান সচেতনভাবে বাবা-মায়ের দায়িত্ব এড়িয়ে যান, তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও আইনগত জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিষয়টিকে শুধু সামাজিক অবক্ষয় বলে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। একদিকে রয়েছে বিশ্বায়ন, কর্মসংস্থানের জন্য দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়া, নগরজীবনের ব্যস্ততা, ছোট পরিবার ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন। অন্যদিকে রয়েছে দায়িত্ববোধের ঘাটতি, সম্পর্কের দূরত্ব এবং প্রবীণদের মানসিক চাহিদাকে অবহেলা করার প্রবণতা।

বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই বাবা-মায়ের জন্য অর্থ পাঠান, চিকিৎসার খরচ বহন করেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃদ্ধ বয়সে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কেবল অর্থ নয়, সঙ্গ-কথা বলার মানুষ এবং মানসিক নিরাপত্তা।

ঢাকার একাধিক বৃদ্ধাশ্রমের দায়িত্বশীলরা জানান, সেখানে বসবাসকারী অনেক প্রবীণের সন্তান দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু নিয়মিত যোগাযোগ করেন না। কেউ কেউ মাসের পর মাস বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতেও আসেন না।

বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রমকে এখনো অনেকেই নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন। কিন্তু বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আনজুমান আরা মনে করেন, আধুনিক সমাজে বৃদ্ধাশ্রমের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘জাপান, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশে ওল্ড হোম বা বৃদ্ধাশ্রম খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যবস্থা। আমাদের দেশেও এখন অনেক আধুনিক বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠছে। সেখানে সাবেক সচিব, শিক্ষক, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ থাকছেন।’

তার মতে, সন্তানরা কর্মজীবন বা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতেই পারেন, সেটি অপরাধ নয়। তবে বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, ‘যাদের সামর্থ্য আছে, তারা চাকরিজীবনের শুরু থেকেই ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করতে পারেন। পেনশন বা আয়ের একটি অংশ প্রবীণ বয়সের নিরাপদ আবাসনের জন্য সঞ্চয় করা যেতে পারে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। একাকিত্ব হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, স্মৃতিভ্রংশ এবং অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

প্রবীণদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগ, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানো এবং কমিউনিটি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ প্রবীণদের সুস্থ জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ রয়েছে। এই আইনে বলা হয়েছে, সক্ষম সন্তানদের বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতে হবে। দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে শাস্তির বিধানও রয়েছে।

তবে বাস্তবে খুব কম মানুষই আইনের আশ্রয় নেন। কারণ অধিকাংশ বাবা-মা সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা করতে চান না। তারা শাস্তি নয়, সন্তানের ভালোবাসা ও উপস্থিতি চান।

বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে। মাথাপিছু আয় বাড়ছে, শিক্ষার হার বাড়ছে, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম। কিন্তু একই সঙ্গে একটি প্রশ্নও সামনে আসছে, আমরা কি সম্পর্কের বিনিময়ে উন্নয়ন কিনছি?

যে মা রাত জেগে সন্তানের জ্বর দেখেছেন, যে বাবা নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়েছেন, তাদের জীবনের শেষ সময় কি একটি নীরব ফ্ল্যাটে একা কাটার কথা?

কর্মজীবনের ব্যস্ততা, বিদেশে বসবাস কিংবা ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাবা-মায়ের নিরাপত্তা ও সঙ্গ নিশ্চিত করার দায়িত্ব থেকে সন্তানরা মুক্ত নন। মৃত্যুর পর কয়েক দিন ধরে বন্ধ ঘরে পড়ে থাকা কোনো বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার মরদেহ শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের সমাজ, মূল্যবোধ ও মানবিকতার জন্যও এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন।

যে বাবা-মা এক দিন সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন, তাদের জীবনের শেষ আলোটুকু যেন নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে নিভে না যায়। সন্তানের কাছেই হোক তাদের শেষ আশ্রয়। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে অন্তত এমন নিরাপদ ও মানবিক ব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যেখানে কোনো মা-বাবাকে আর একা, নিভৃতে, অযত্নে মৃত্যুবরণ করতে না হয়। কারণ একটি সভ্য সমাজের প্রকৃত পরিচয় তার আকাশচুম্বী ভবনে নয়, বরং সে তার প্রবীণ মানুষকে কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা দিতে পারে সেখানেই।

আনোয়ারা: দল বদলায়, রক্ষাকবচে অত্যাচার থামে না

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৮:৩৯ এএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:০২ এএম
আনোয়ারা: দল বদলায়, রক্ষাকবচে অত্যাচার থামে না
চট্টগ্রামের আনোয়ারার উপকূলীয় গহিরা প্যারাবন কেটে প্রথমে মাঠ বানানো হয় (বায়ে)। পরে মাটি কেটে মাছের ঘের তৈরি করা হয়। ছবি: খবরের কাগজ

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল। জলোচ্ছ্বাস আর ঘূর্ণিঝড় কেড়ে নিয়েছিল লাখো প্রাণ। লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূলের গহিরা, রায়পুরসহ বিস্তীর্ণ জনপদ। সেই মহাবিপর্যয়ের পর উপকূলবাসীকে রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বন বিভাগের পক্ষ থেকে ‘সবুজ দেওয়াল’ গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রায় ২৫০ একর এলাকাজুড়ে রোপণ করা হয় কেওড়া, গেওয়া, বাইনসহ বিভিন্ন প্রজাতির লাখো গাছ। তিন দশকে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা সেই গহিরা প্যারাবনই এখন আনোয়ারা উপকূলের রক্ষাকবচ। অথচ এই বনকেই ধীরে ধীরে সাবাড় করা হচ্ছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ আমলে এই বনের গাছ কাটা হয়েছে। বর্তমানে কাটা হচ্ছে মাটি। দল বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল হয়, অথচ বনের ওপর অত্যাচার থামে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজনদের থাবায় বনের প্রায় ১৫ একর এলাকার গাছ কেটে সাবাড় করা হয়। আর বর্তমানে স্থানীয় বিএনপির নামধারী একশ্রেণির প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রকাশ্যে ভেকু মেশিন (মাটি কাটার যন্ত্র) বসিয়ে বনের মাটি কেটে বিক্রি করছে। ফলে উপকূলের রক্ষাকবচ এই প্যারাবন এখন নিজেই নিঃশেষের পথে। 

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গহিরা প্যারাবনের ওপর নির্যাতনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে তৎকালীন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আমিন শরীফের সরাসরি আশ্রয়ে জকু মাঝি নামের এক ব্যক্তি বনের ভেতরে তাণ্ডব চালান। সাগরের গুরুত্বপূর্ণ মোহনায় ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা বনের ভেতরের গাছ কেটে, চারপাশে মাটির বাঁধ দিয়ে পানি আটকে বিশাল ঘের তৈরি করেন।
সরেজমিনে গহিরা উপকূলে গিয়ে দেখা যায়, ওই মাছের ঘেরগুলোর ভেতরে এখনো কেটে ফেলা শত শত কেওড়া ও বাইন গাছের গোড়া (অবশিষ্টাংশ) পানির ওপর জেগে আছে। প্রায় ১৫ একর বনভূমির সবুজবেষ্টনী সম্পূর্ণ উজাড় করা হয়েছে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাদের অনুসারীরা একজোট হয়ে এই সংরক্ষিত প্যারাবনের মাটি কেটে বিক্রি করছেন। বনের ভেতর ও সংলগ্ন এলাকার মাটি কেটে নেওয়ার কারণে সেখানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে।
গহিরা এলাকার সত্তরোর্ধ্ব বাসিন্দা ইদ্রিস আলী বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয়ে এসে বনের গাছ কাটল, মাছের ঘের বানাইল। ভাবছিলাম সরকার বদলালে বনটা বাঁচবে। এখন দেখি বিএনপির নাম দিয়ে আরেক দল এসে দিন-রাত মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। বনটা শেষ হয়ে গেলে সাগরের পানি আমাদের ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নেবে।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে আনোয়ারার গহিরা এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অধীনে একটি উপকূলীয় বেড়িবাঁধের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এই কাজের ঠিকাদার ‘মেসার্স শেখ এমদাদুল হক মামুন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। জানা গেছে, এই ঠিকাদারের কাছ থেকে স্থানীয় বিএনপি নেতা সাহেদ, আব্দুল মজিদসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সাব-কন্ট্রাক্ট (উপ-ঠিকাদার) হিসেবে কাজ নিয়েছেন।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য দূরবর্তী কোনো স্থান বা ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গা থেকে মাটি কিনে বাঁধে দেওয়ার কথা। অথচ খরচ বাঁচিয়ে শতভাগ লাভ তুলে নিতে উপ-ঠিকাদার সংরক্ষিত প্যারাবনকে বেছে নিয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বনের ভেতরে বিশাল আকৃতির ভেকু দিয়ে দিন-রাত মাটি কাটা হচ্ছে। ডাম্প ট্রাকে করে সেই মাটি বেড়িবাঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মাটি কাটার ফলে বনের ভেতরের জোয়ার-ভাটার প্রাকৃতিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক গাছের শিকড় উপড়ে গেছে।
বনের বর্তমান অবস্থা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা নূরনাহার বেগম (৪৫) বলেন, ‘চোখের সামনে বনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমরা বাধা দিলে মামলা-হামলার ভয় দেখানো হয়।’

অভিযোগের বিষয়ে উপ-ঠিকাদার ও মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত স্থানীয় বিএনপি নেতা সাহেদ (উপজেলা বিএনপির আহ্বায়কের ছেলে) মোবাইলফোনে বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমি জড়িত নই। দায়িত্বপ্রাপ্ত মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই বনের মাটি কেটে বেড়িবাঁধে দিচ্ছে। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলুন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আমাদের জড়িয়ে এসব ছড়ানো হচ্ছে।’
তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শেখ এমদাদুল হকের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তার মোবাইলফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এসএমএস পাঠিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িতরা বর্তমানে পলাতক থাকায় তাদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ‘ম্যানগ্রোভ বা প্যারাবন উপকূলীয় এলাকার জন্য প্রাকৃতিক সুরক্ষাপ্রাচীর। এই বন শুধু সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের গতি কমায় না, বরং মাটিকে ধরে রাখে।’
তিনি বলেন, ‘বিগত সময়ে মাছ চাষের নামে এখানে যে গাছ কাটা হয়েছে, তা পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি। আর এখন বনের ভেতর থেকে মাটি কেটে নিয়ে পুরো এলাকাকে যদি খালে রূপান্তর করা হয়, তবে সমুদ্রের জোয়ার ও ঢেউয়ের আঘাতে অবশিষ্ট বনও ধসে পড়বে। ফলে পুরো উপকূলীয় অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী ঝুঁকিতে পড়বে।’

সংরক্ষিত বনাঞ্চল কেটে বেড়িবাঁধের কাজ চললেও এর দায় নিতে নারাজ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। সংস্থাটির নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে শহীদ বলেন, ‘আমরা মূল প্রকল্পের নকশা এবং কাজের গুণগত মান তদারকি করি। ঠিকাদার কোথা থেকে মাটি আনছেন, সেই বিষয়টি আমাদের সব সময় লিখিতভাবে জানানো হয় না। তবে স্থানীয়দের কিছু আপত্তির কথা আমরা শুনেছি। ঠিকাদারকে নির্দেশ দিয়েছি, যাতে তারা সংরক্ষিত বন বা উপকূলীয় এলাকা থেকে মাটি না কেটে দূরবর্তী স্থান থেকে এনে সরবরাহ করেন।’ 

বাঁশখালী রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার খায়রুল আলম বলেন, ‘আমি এই রেঞ্জে নতুন এসেছি। মাটি কাটার বিষয়টি লোকমুখে শুনে একবার পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। বিষয়টির বিস্তারিত আমার জানা নেই। নথিপত্র দেখে বলতে হবে, ওটা বন বিভাগের গেজেটভুক্ত জায়গা কি না।’

চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এম এ হাসান বলেন, ‘বিষয়টি আমার বিস্তারিত জানা নেই। আমি দ্রুত তদন্ত টিম পাঠাচ্ছি। বিন্দুমাত্র প্রমাণ মিললে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনানুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

আলোচিত না হলেই তদন্ত ও বিচারে ধীরগতি

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৮:১৩ এএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৮:১৭ এএম
আলোচিত না হলেই তদন্ত ও বিচারে ধীরগতি
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

আলোচিত না হলেই ধর্ষণ ও শিশুহত্যার মতো বর্বরোচিত ঘটনাগুলোর তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া যেন থমকে যায়। বিশেষ করে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের যেসব ঘটনা ব্যাপক আলোচিত বা ‘ভাইরাল’ হয়, সেসব ঘটনায় করা মামলার ক্ষেত্রে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া তুলনামূলক অনেক বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু যেসব ঘটনা তেমন আলোচনায় নেই সেগুলোর মামলার ক্ষেত্রে তেমন একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না বলে নানা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে।

  • মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণ হচ্ছে দক্ষ জনবলের অভাব: সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক
  • বিচারব্যবস্থায় এমন বৈষম্য থাকলে একে সুষ্ঠু বিচারব্যবস্থা বলে না: আইনজীবী মনজিল মোরসেদ
  • প্রচারের মাত্রায় নয়, অপরাধের গুরুত্বের ভিত্তিতেই সব মামলায় সমান অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি: মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
  • রাষ্ট্রের দায়িত্ব সব নাগরিককে সমানভাবে দেখা, সমান গুরুত্ব দেওয়া: অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক
  • শিশুহত্যা মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই: এআইজি (মিডিয়া), পুলিশ সদর দপ্তর

রবিবার (৭ জুন) আলোচিত শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও বীভৎসভাবে হত্যার মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ড ঘটার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় গতকাল আদালত অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। এর মধ্য দিয়ে দ্রুত বিচারের একটি অনন্য নজির স্থাপন করা গেল। 

কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ ধরনের প্রতিটি ঘটনা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছে সমান কষ্টের ও বেদনার। ফলে সবার ক্ষেত্রেই দ্রুততম সময়ে বিচার সম্পন্ন হোক–সেটাই কাম্য। অথচ গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি না হলে একই ধরনের অপরাধ বা হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে সে তুলনায় গুরুত্ব দেওয়া হয় না। শুধু আলোচিত বা চাঞ্চল্যের ওপর ভিত্তি করে একই ধরনের জঘন্য অপরাধমূলক ঘটনার মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছে অনেক ভুক্তভোগী পরিবার। ফলে ব্যক্তি, স্থান বা প্রচারের মাত্রায় নয়, অপরাধের গুরুত্বের ভিত্তিতেই সব মামলায় সমান অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে মাগুরায় ঘটা আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দেওয়া হয়েছিল এক মাসের মধ্যেই। অভিযোগ গঠনের পর মাত্র ২৪ দিনের মাথায় সংশ্লিষ্ট আদালত এই ঘটনায় ঐতিহাসিক রায় দেন। যদিও বর্তমানে রায়-পরবর্তী আপিলের ধাপটি হাইকোর্টে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে গত ২১ মে চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া থানা এলাকায় গুদাম কক্ষে চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয় এবং মাত্র ১৩ দিনের মাথায় (গত ৪ জুন) একমাত্র আসামি মনির হোসেনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। এ ছাড়া সর্বশেষ গত ১৯ মে পল্লবীতে ঘটা শিশু স্কুলছাত্রী রামিসা ধর্ষণ-হত্যার ওই মামলায় চার্জশিট জমা দেওয়ার পর মাত্র পাঁচ কর্মদিবসে শুনানি শেষ হয় এবং ষষ্ঠ কর্মদিবসে গতকাল রায় ঘোষণা করেন বিচারক। এর আগে সরকারপ্রধান তথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও আলোচিত এই হত্যা মামলার রায় মাত্র এক মাসের মধ্যেই ঘোষণা করা হবে বলে এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে বলেছিলেন। 

বিশ্লেষকরা মনে করেন, শিশু আছিয়া বা রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করার পক্ষে প্রায় সবাই। কিন্তু এমন অসংখ্য আছিয়া-রামিসা, যারা সমাজের মানুষরূপী হায়নাদের বর্বরতার শিকার হয়ে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারগুলো তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন কি না, তা সংশ্লিষ্টদের খতিয়ে দেখা দরকার বলে মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। 

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে (২০২১ থেকে ২০২৫) সারা দেশে বিভিন্নভাবে ২ হাজার ৫৮১ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৬৭ জনকে ধর্ষণের পর খুন করা হয়। এর মধ্যে ২০২৫ সালে খুন হয় ৪১০ শিশু, যাদের মধ্যে ধর্ষণসহ হত্যার শিকার হয় ৩২ জন। তার আগে ২০২৪ সালে ৫৭৪ শিশু, ২০২৩ সালে ৪৮৫ জন, ২০২২ সালে ৫১৬ জন এবং ২০২১ সালে ৫৯৬ শিশু খুন হয়েছে।

 অন্যদিকে বিভিন্ন সূত্রমতে, চলতি বছরের মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত অন্তত ১২০ শিশু খুন হয়েছে, যাদের মধ্যে প্রায় অর্ধশত শিশু ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়। ফলে যে হারে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে, সে অনুসারে সমান গুরুত্ব দিয়ে এসব ঘটনার দ্রুত তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়া শেষ করার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই কারও কাছেই। 

এ প্রসঙ্গে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক ও মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির গত সোমবার খবরের কাগজকে বলেন, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের মৌলিক নীতি হলো, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং প্রতিটি ভুক্তভোগী সমান গুরুত্ব পাওয়ার অধিকার রাখে। কোনো ঘটনা বেশি আলোচিত হওয়ায় দ্রুত বিচার হবে, আর একই ধরনের ঘটনায় দুর্বলের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা থাকবে– এটি ন্যায়বিচারের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কাজেই আমাদের এমন ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে যেন দ্রুততম সময়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়।
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির আরও বলেন, ‘যেকোনো আলোচিত ঘটনার পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চল বা কম আলোচিত এলাকায় সংঘটিত শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যা মামলাগুলোর ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত ও বিচার করতে হবে। ব্যক্তি, স্থান বা প্রচারের মাত্রায় নয়, অপরাধের গুরুত্বের ভিত্তিতেই সব মামলায় সমান অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা রামিসাসহ সব সহিংসতার শিকার শিশুর জন্য ন্যায়বিচার দেখতে চাই।’

বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ না করার ক্ষেত্রে বিচারকের স্বল্পতাসহ বেশ কিছু কারণকে চিহ্নিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক। তিনি গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণ হচ্ছে দক্ষ জনবলের অভাব। লাখ লাখ মামলার মধ্যে কয়টা আর মিডিয়াতে আসে। জনবহুল এই দেশে বিচারক আছেন মাত্র ১৮০০ থেকে ১৯০০ জন। বিচার বিভাগের জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ হয় এক শতাংশেরও কম। তা ছাড়া মামলা নিষ্পত্তি করা তো শুধু আদালতের বিষয় না। মামলার তদন্ত করে পুলিশ। এসব সমস্যা সেখানেও আছে।’

একই প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে আইনের শাসনের এটি একটি দুর্বলতা। যেই মামলার বিষয়ে মিডিয়াতে খুব হইচই পড়ে যায়, দেশের প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করেন, তখন সেটি ফার্স্ট ট্র্যাকে কয়েক দিনের মধ্যে বিচার হয়ে যায়। আর এমন অনেক অসহায় বা অন উল্লেখ্য লোক আছেন, যাদের তেমন কোনো লোকজন নেই, তখন মিডিয়াতে তেমন হইচই পড়ে না, প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করেন না–তাদের মামলার নিষ্পত্তি কবে হবে কেউ বলতে পারেন না। এটা এক ধরনের বৈষম্য। বিচারব্যবস্থায় এমন বৈষম্য থাকলে একে সুষ্ঠু বিচারব্যবস্থা বলে না। আইনের শাসন সুনিশ্চিত করতে গেলে অবশ্যই সব মামলা নিষ্পত্তির ধারাবাহিকতা একই হতে হবে। তাই সরকারের উচিত, সব মামলাই যেন দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়, সুবিচার নিশ্চিত করা যায়, সে জন্য মহাপরিকল্পনা নেওয়া।’

গতকাল শিশু স্কুলছাত্রী রামিসা হত্যার রায় ঘোষণা করার পর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানান আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে এই মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন করে রায় দেওয়া হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুততম সময়ে রায় ঘোষণার রেকর্ড।’

তবে অতীতের আলোচিত বা এই ধরনের অন্য মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মন্ত্রী বলেন, ‘বিচারব্যবস্থার একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি বলেন, অন্য মামলাগুলো যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়, সে জন্য ইতোমধ্যেই প্রয়োজনীয় আলোচনা শুরু হয়েছে।’

এ বিষয়ে সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘বর্তমান সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মিডিয়া বা গণমাধ্যমের এক ধরনের প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে, যা শিশুহত্যার মতো ঘটনার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও এক ধরনের ভূমিকা রাখছে। মিডিয়া ক্ষেত্রবিশেষে কোনো কোনো ঘটনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে বা দিতেই পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব সব নাগরিককে সমানভাবে দেখা, সমান গুরুত্ব দিয়ে আইনি সুরক্ষা ও সেবা দেওয়া। কিন্তু বাস্তবতায় আমরা তেমনটা দেখতে পাই না। প্রতিটি ভুক্তভোগী পরিবারের কাছেই তাদের সন্তান ছিল অত্যন্ত প্রিয়। ফলে কোনো হত্যার বিচার কয়েক দিনেই হবে। আবার কোনো হত্যার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে–সেটা হলে নাগরিকের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হবে। এখান থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।’

এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, ‘শিশুহত্যা মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের মামলায় পুলিশ অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তদন্ত করে থাকে। তবে সব মামলায় সমানভাবে চার্জশিট জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে সময় নির্ধারণ করা যায় না। অনেক সময় সাক্ষ্য, প্রমাণ, আলামতের রিপোর্টসহ নানা কারণে কিছুটা বিলম্ব হয়ে থাকে। তবে শিশুহত্যা মামলার মতো স্পর্শকাতর তদন্তগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা অনুসারে পুলিশ যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করে থাকে। এ জন্য ঊর্ধ্বতনরা নিয়মিত তদারকি করে থাকেন।’

কষ্টকর হবে জীবন, সব জিনিসের দাম বাড়বে

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ১২:৪৬ পিএম
কষ্টকর হবে জীবন, সব জিনিসের দাম বাড়বে
ছবি: এআই

আগামী অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক-কর-ভ্যাটের মারপ্যাঁচে চাল, ডালসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য থেকে পাউরুটি, চিপস, বিস্কুট ও জুসের মতো খাবারের দাম বাড়বে। চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ বাড়বে। শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়বে। আমদানি করা মোবাইল, ল্যাপটপ ও কম্পিউটার এবং এসব পণ্যের যন্ত্রাংশের দাম বাড়বে। দেশি পোশাকের দাম বাড়বে। ঠিকাদার ব্যবসায়ের লাইসেন্স ফি বাড়বে। জোরালো আবেদন সত্ত্বেও আগামীবারও কমবে না মোবাইল ফোন ব্যবহারের খরচ।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব জানা যায়। 

সূত্র আরও জানায়, বাজেটে চাল, ডাল, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি পর্যায়ে উৎসে কর কিছুটা কমিয়ে বহাল থাকছে। আমদানিকারকরা এই বহাল থাকা করের অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে রাখার সুযোগ পেতে পারেন।

আগামী বাজেটে তামাক পণ্যের দাম বাড়বে। কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোয় দেশে উৎপাদিত ঘড়ি ও চশমার দাম বাড়বে। অন্যদিকে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোয় বিদেশি ঘড়ি ও চশমার দামও বাড়বে। বিদেশি ব্র্যান্ড ও নন ব্র্যান্ড সব ধরনের প্রসাধনীর দাম বাড়বে। আমদানি করা গুঁড়া দুধ, মাছ ও শুকনা ফলের দাম বাড়বে। 

ব্যবসায়ীরা দাম কমানোর জোরালো আবেদন করলেও কমছে না মাছ ও পোলট্রি ফিডের দাম। মানবিক বিবেচনায় কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচ কমানোর পরামর্শ দিলেও আমলে আনা হচ্ছে না। কাঁচামাল আমদানিতে ছাড় না দেওয়ায় কমছে না ওষুধের দাম। জমি রেজিস্ট্রির খরচ কমানো হচ্ছে না।  

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থ সংকটে নিয়মিত খরচ চালিয়ে যাওয়াও সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় মিটাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আগামী বাজেটে খরচ কমানোর প্রত্যাশা করলেও তা বাস্তবায়ন হবে না। বরং বাজেটে সরকার আয় বাড়াতে গিয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেটে অনেক জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প খাতে খরচ বাড়বে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, এরই মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বাড়বে মূল্যস্ফীতি। অন্যদিকে নতুন অর্থবছরে এক লাখ কোটি টাকার বেশি  ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। অন্য সব বাদ দিয়ে শুধু এই দুই কারণেই  অনেক কিছুর দাম ও খরচ বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এ সব কিছুই জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে ফেলবে। 

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, আওতা বাড়িয়ে সরকার আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। অনেক নতুন খাত অর্থনীতির মূল ধারায় যুক্ত করা হচ্ছে। এতে সরকারের আয় বাড়বে বলে আশা করছি।  

বাজেট প্রণয়নকালেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে দেশি কম্পিউটার শিল্পের বাজার সম্প্রসারণে দেশে কম্পিউটার সংযোজন ও খুচরা যন্ত্রাংশ উৎপাদনে রাজস্ব ছাড়ের সর্বোচ্চ সুবিধা দেওয়ার জন্য আবেদন করে। আগামী বাজেটে কম্পিউটার সংযোজনকারী শিল্প এবং কম্পিউটার আমদানি নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। বাজেট প্রস্তাব চূড়ান্ত হলে আমদানিকৃত কম্পিউটার ও ল্যাপটপের দাম বাড়বে। 

সূত্র জানায়, মোটরসাইকেল উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান রাজস্ব বহাল থাকলেও উচ্চ সিসির সম্পূর্ণ মোটরসাইকেল আমদানিতে শুল্ক হার বাড়বে। এতে আমদানি করা বেশি সিসির মোটরসাইকেলের দাম বাড়বে। অন্যদিকে আসন্ন বাজেটে আমদানিকৃত প্লাস্টিক পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। পার্লারের খরচ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহনে চলাচল খরচও আসন্ন বাজেটে বেশি থাকবে। 

সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর ফলে আসন্ন বাজেটে অটোরিকশার যন্ত্রাংশ আমদানিতে খরচ বাড়বে। এতে অটোরিকশা বানাতে খরচ বাড়বে। ফলে অটোরিকশার দাম বাড়বে।  

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সদস্য প্রায় ৩০ লাখ। এনবিআর থেকে এসব দোকানের তালিকা নিয়ে ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব দোকানের মধ্যে লক্ষাধিক হস্ত ও কুটির শিল্পের দোকান আছে। এসব দোকানের বেশির ভাগই এসএমই খাতের (ক্ষুদ্র ও মাঝারি। আগামী বাজেটে ছোট দোকানের ওপর বছরে এক হাজার টাকা করে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।  

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ছোট ছোট দোকান সাধারণত পাড়া-মহল্লা ও গ্রামে থাকে। এসব দোকানের আয় দিয়ে দোকান-মালিক সংসারের খরচ চালান। এসব লোকের বেশির ভাগই অল্প আয়ের মানুষ। এখান থেকে যারা কেনাকাটা করেন তারাও ধনী ব্যক্তি না। এসব দোকানকে ভ্যাটের আওতায় আনা হলে দোকান-মালিকের ওপর চাপ হয়ে যাবে। অনেক দোকান জিনিসপত্রের দামও বাড়াবে।

আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণের বদলে আরও উসকে দেবে বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, গণমাধ্যমে দেখেছি আগামী বাজেটের আকার ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি হবে। এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের আয় বাড়াতে হবে। এনবিআরের রাজস্বের আওতা ও লক্ষ্যমাত্রা বাড়াতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন করে শুল্ক-কর-ভ্যাট আরোপ করতে হবে। এতে অনেক পণ্যের দাম বাড়বে। সেবা খাতের  খরচ বাড়বে। যা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াবে। এখনই সাধারণ মানুষ খরচের চাপে আছে। আরও খরচ বাড়লে বিপাকে পড়বে।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে স্টেডিয়ামের খেলা ও থিয়েটারে নাটক দেখতে হলে এখনকার চেয়ে বেশি দাম দিয়ে টিকিট কাটতে হবে।

আসন্ন অর্থবছরের বাজেটে ভারতসহ অনেক দেশ থেকে তুলা আমদানিতে খরচ বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিতে বিশেষ ছাড় থাকবে। তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা কম দামে তুলা আমদানির পক্ষে। তাদের বেশির ভাগই ভারত থেকে কম দামে তুলা আমদানি করতে চায়। অন্যদিকে টেক্সটাইল খাতের ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে তুলা আনার বিপক্ষে। তারা দেশে উৎপাদিত তুলা ব্যবহারের পক্ষে। তবে সরকার পড়েছে খানিকটা বেকায়দায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বাড়ানোর শর্ত রয়েছে। তাই আগামী বাজেটে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিতে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে।

শুল্ককরের মারপ্যাঁচে আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পরই মোবাইল ফোনের সামগ্রী বেশি দামে আমদানি করতে হবে। মোবাইল ফোন মেরামতে খরচ বাড়বে। একই সঙ্গে আমদানি করা মোবাইলের দামও বাড়বে। একইভাবে কম্পিউটার যন্ত্রাংশ আমদানিতে খরচ বাড়বে। এতে কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের গুনতে হবে বাড়তি টাকা।

আগামী বাজেটে দেশে শিল্প খাতে ব্যবহৃত অনেক কাঁচামালের আমদানি নিরুৎসাহিত করা হবে। বিশেষভাবে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি, লোহার রড, স্ক্র্যাব, টেক্সটাইল, চামড়া খাত, পাটশিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হবে। দেশি গরুর দুধ, মসলা ও দেশি শিল্পে বানানো খেলনার দাম বাড়বে না।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আগামী অর্থবছরের বাজেটে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার বা অ্যাপ্লিকেশন কাস্টমাইজেশন, এনটিটিএন, ডিজিটাল কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল অ্যানিমেশন ডেভেলপমেন্ট, ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট, ওয়েবসাইট সার্ভিস, ওয়েব লিস্টিং, আইটি প্রসেস আউটসোর্সিং, ওয়েবসাইট হোস্টিং, ডিজিটাল গ্রাফিক্স ডিজাইন, ডিজিটাল ডেটা এন্ট্রি অ্যান্ড প্রসেসিং, ডিজিটাল ডেটা অ্যানালেটিক্স, জিওগ্রাফিক্স ইনফরমেশন সার্ভিসেস, আইটি সাপোর্ট অ্যান্ড সফটওয়্যার মেইনটেন্যান্স সার্ভিস, সফটওয়্যার ল্যাব টেস্ট সার্ভিস, কল সেন্টার সার্ভিস খাতে খরচ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হবে। একইভাবে ওভারসিজ মেডিকেল ট্রান্সক্রিপশন্স সার্ভিস, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন সার্ভিস, ডকুমেন্ট কনভারশন, রোবোটিক্স প্রসেস আউটসোর্সিং এবং সাইবার সিকিউরিটি সার্ভিস খাতেও খরচ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হবে। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থমন্ত্রীসহ এনবিআর বাজেট প্রস্তুত কমিটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব খাতের ওপর কোনো ধরনের রাজস্ব আরোপ না করার নির্দেশ দেন। ফলে আগামী বাজেটে বাড়ছে না এসব খাতের খরচ।