গত ১ আগস্ট ছিল কাজল মিয়া (২৭) ও সিনথিয়ার প্রথম বিবাহবার্ষিকী। বিশেষ এই দিনটিতে পরিবারের সবাই একসঙ্গে কাটাতে স্ত্রীকে নিয়ে কাজল যান নারায়ণগঞ্জে বড় ভাইয়ের বাসায়। ছাত্র আন্দোলনের কারণে যান চলাচল বন্ধ ছিল। সে জন্য কাজলের বড় ভাই আর তাদের ফিরতে দেননি। এদিকে ৪ আগস্ট রাতে ৫ আগস্টে লং মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এই কর্মসূচিতে যোগ দিতে পরদিন ভোরে শুধু স্ত্রীকে বলে ভাইয়ের বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েন কাজল।
যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় দুপুরে পুলিশের সঙ্গে ছাত্র-জনতার সংঘর্ষ শুরু হয়। যে যার মতো বাঁচার জন্য ছুটতে থাকলেও কাজল তখন আবু সাঈদের মতো দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দেন। কিন্তু পুলিশ তার বুকে নয়, সরাসরি মাথায় গুলি চালায়। এরপর সেখানকার ছাত্র-জনতা কাজলকে মাতুয়াইলের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। তারাই খবর পাঠান তার পরিবারের কাছে। বেলা ২টার দিকে খবর পেয়ে কাজলের বড় ভাই রুবেল আর ছোট ভাই সজল ছুটে আসেন হাসপাতালে। সেখানে এসে দেখেন কাজলের অবস্থা খুবই খারাপ।
কোথায় নেবেন, কী করবেন- কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। পাচ্ছিলেন না অ্যাম্বুলেন্সও। অনেক চেষ্টার পর একটি অ্যাম্বুলেন্স পান। এরই মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের মাধ্যমে যোগাযোগ হয় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস (নিনস) হাসপাতালের এক চিকিৎসকের সঙ্গে। তারপর রাত ১২টার দিকে নিয়ে যান সেখানে। পরদিন তার অপারেশন হয়। গুলি মাথায় ছিল না। কিন্তু মাথার হাড় গুঁড়া গুঁড়া হয়ে গিয়েছিল। ওই দিন অপারেশন করে তার মাথার খুলি বের করে ফেলা হয়। খুলি রাখা হয় সাভারের বোন ব্যাংকে। প্রায় দেড় মাস পর আবার এনে খুলি লাগানো হয়। গত ৬ আগস্ট থেকে কাজল নিনসে চিকিৎসাধীন।
নিনসের চিকিৎসক হুমায়ুন কবীর হিমু জানান, ধীরে ধীর তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল। হঠাৎ তিন দিন আগে ইনফেকশন হয়। ডায়রিয়া দেখা দেয়। রক্তচাপ কমে যায়। তখন তাৎক্ষণিক মেডিকেল বোর্ড বসিয়ে তার চিকিৎসা শুরু করা হয়। পরে অবস্থার আরও অবনতি হলে চিকিৎসকরা গত শনিবার স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে অবহিত করেন। তিনি খবর পেয়ে তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামকে নিনসে পাঠান। নাহিদ আসার পর শুরু হয় তাকে থাইল্যান্ডের বেজথানি হাসপাতালে পাঠানোর প্রক্রিয়া।
শনিবার ছুটির দিন ছিল তাই থাইল্যান্ডের ভিসা পাওয়া যায়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে থাই অ্যাম্বাসিতে যোগাযোগ করা হয়। রবিবার (১৭ নভেম্বর) দুপুরে ভিসার ব্যবস্থা হয়। এ ছাড়া এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ৩১ হাজার ডলারের ব্যবস্থা করেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা। গতকাল দুপুরের মধ্যে সেই টাকা সিঙ্গাপুরে পাঠিয়ে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স নিশ্চিত করেন। সন্ধ্যা ৭টায় ঢাকার উদ্দেশে রওনা করে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স। কাজলকে নিয়ে রাত ১২টার দিকে থাইল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা। কাজলের সঙ্গে যাবেন তার স্ত্রী সিনথিয়া। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, জাতীয় নাগরিক কমিটির ডা. আহাদসহ আরও অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কাজলকে বিদায় জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।
শুধু কাজল নন, এর আগে চিকিৎসার জন্য আরও চারজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে পাঠানো হয়েছে। আরও ১০-১২ জনকে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে যোগদানের পর আমার প্রধান কাজ হলো আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। তাদের সুচিকিৎসার জন্য বিদেশি চিকিৎসক দল আনার ব্যবস্থা করেছি। চীন, নেপাল, ফ্রান্স থেকে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এসেছেন। থাইল্যান্ড থেকে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এসেছেন। ৫০ জনের চোখের কর্নিয়া নেপাল রেডি করে রেখেছে, যাদের কর্নিয়া স্থাপন প্রয়োজন হবে তাদের জন্য। ইতোমধ্যে দুজনের চোখে সফলভাবে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। ছাত্র আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসায় যুক্তরাজ্য থেকে চিকিৎসকদের একটি টিম বাংলাদেশে এসেছে। গত ৫ নভেম্বর থেকে দুজনের একটা মেডিকেল টিম ঢাকায় জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) ভর্তি রোগীদের পর্যবেক্ষণ করে। তারা ১৮ তারিখ পর্যন্ত ২৫টির বেশি অপারেশন করে।’
কাজল গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার রাজপাট গ্রামের মো. বুলবুল মিয়া ও আঞ্জুয়ারা বেগমের মেজো ছেলে। তারা চার ভাইবোন। বোন ছোট। ভাইদের মধ্যে কাজল মেজো। বড় ভাই রুবেল মিয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষে নারায়ণগঞ্জে ব্যবসা করেন। ছোট ভাই সজল মিয়া রাজধানীর তিতুমীর কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাদের বাবা-মা থাকেন গ্রামে। কাজল স্ত্রী নিয়ে থাকতেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী কাজল জুলাইয়ের শুরু থেকেই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন।
কাজলের ছোট ভাই সজল বলেন, ‘আমার ভাইয়া একজন ভালো মানুষ। তিনি সব সময় নির্যাতিত ও দুর্বলের পক্ষে দাঁড়াতেন। জুলাইয়ে শুরু থেকেই তিনি জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নেন। কাজল ভাইয়ার বিবাহবার্ষিকী পালনের জন্য আমরা সবাই বড় ভাইয়ার বাসায় যাই।’
কাজলের জন্য দোয়া চেয়েছেন তার বড় ভাই রুবেল। তিনি বলেন, ‘সরকার কাজলকে থাইল্যান্ডে নিয়ে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশবাসীর কাছে দোয়া চাচ্ছি, আপনার দোয়া করবেন আল্লাহ যেন তাকে পরিপূর্ণ সুস্থতা দান করেন।’