রোজায় পণ্যমূল্য স্বাভাবিক রাখতে কঠোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে একগুচ্ছ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে মাঠপর্যায়ে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বাজার মনিটরিং, সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া, পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, বাজার কমিটির কমিশন আদায় বন্ধ করা, সৎ-ন্যায়বান আমদানিকারকদের পণ্য আমদানিতে উৎসাহ দেওয়া, প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে বিনা শুল্কে আমদানির অনুমোদন দেওয়া ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।
এবার রোজায় ভোক্তাদের পণ্যমূল্যে স্বস্তি দিতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শুধু রাজধানীই নয়, দেশের সর্বত্র যেন রোজায় দেশবাসীকে পণ্যমূলে বাড়তি দাম দিতে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে এ বিষয়ে কাজ করে নানা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এই নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে দেওয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, যত শক্তিশালীই হোক না কেন, বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া হবে।
সিন্ডিকেটে জড়িতদের তালিকা
বিভিন্ন সময়ে বাজারে সিন্ডিকেটে জড়িতদের তালিকা করেছে দেশের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। এ তালিকায় বিগত সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের নাম এসেছে। দেশের বড় মাপের অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেটে জড়িত বলেও নিশ্চিত কার হয়েছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। গোয়েন্দা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ভোজ্যতেলের বাজার সিন্ডিকেটে চারটি বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ জড়িত। একইভাবে চিনি, মুরগি, ডাল, ছোলা, খেজুরের মতো নিত্যপণ্যের বাজারও মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ী গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।
এসব ব্যবসায়ী গ্রুপের অনেকের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, ঋণের নামে ব্যাংকের অর্থ লুট, জমি জবরদখল, রাজস্ব ফাঁকি, নারী কেলেঙ্কারিসহ বিভিন্ন দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। বর্তমান সরকার বাজার সিন্ডিকেটে জড়িত এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে নিয়মিত সৎ ব্যবসায়ীদের পণ্য সরবরাহের ব্যবসায়ে উৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সম্প্রতি এক আলোচনা সভায় বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন বলেন, ‘চাহিদা ও জোগানে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হবে। উৎপাদন বাড়াতে হবে। বাণিজ্যে বেশিসংখ্যক মানুষকে সম্পৃক্ত করতে চাই। এর মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ বাড়বে। গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর কাছে বাজার জিম্মি থাকবে না।’
উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। পাইকারি থেকে খুচরা সব পর্যায়ে ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদ সংরক্ষণ করতে হবে।’
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘কোনো অস্বচ্ছতা রেখে বাজার অস্থিতিশীল করতে দেওয়া হবে না।’
শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ই নয়, সব উপদেষ্টাই নিজ নিজ মন্ত্রণালয় থেকে রোজায় পণ্যমূল্য সহনীয় রাখতে কাজ করবেন।
পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা
রাজনৈতিক পরিচয়ে এতদিন বিভিন্ন গোষ্ঠী পণ্য পরিবহনে দেশব্যাপী চাঁদাবাজি করেছে। এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে পরিবহন চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। রোজায় পণ্য পরিবহনে যেন চাঁদাবাজি না হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়েছে।
বাজার কমিটি কমিশন নিতে পারবে না
বাজার পরিচালনায় একটি করে কমিটি থাকে। এসব কমিটিতে ওই বাজারের প্রভাবশালী বিক্রেতারা থাকেন। অনেক সময় এসব কমিটি ওই বাজারের সাধারণ বিক্রেতাদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা বা কমিশন নিয়ে থাকে। এরই মধ্যে সরকারের সংশ্লিষ্টরা গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে বাজার কমিটিকে চাঁদা বা কমিশন বাণিজ্য বন্ধ করতে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে।
বেশি চাহিদা আছে এমন পণ্যে রাজস্ব ছাড়
বাজারে সরবরাহ বাড়াতে আলু, পেঁয়াজ, চিনি, ডিমসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের আমদানিতে রাজস্ব ছাড় দিয়েছে। অনেক পণ্যের স্থানীয় ভ্যাটও কমানো হয়েছে। রোজা সামনে রেখে ট্যারিফ কমিশন থেকে ছোলা, খেজুরসহ অন্য নিত্যপণ্যের রাজস্ব ছাড়ে সুপারিশ করেছে। রাজস্ব ছাড় দেওয়ার এরই মধ্যে সরকারের এক অর্থবছরে রাজস্ব আয় ৭০০ কোটি থেকে ১ হাজার কোটি টাকা কমেছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, জনকল্যাণে প্রয়োজনে আরও ছাড় দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাজারে পণ্য সরবরাহ বাড়াতে বিভিন্ন পণ্যের রাজস্ব ছাড় দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে আরও পণ্যের রাজস্ব ছাড় দেওয়া হবে। এতে এনবিআরের রজস্ব আদায় কমলেও জনস্বার্থে তা মেনে নেওয়া হচ্ছে।’
নিয়মিত বাজার নজরদারিতে গাফিলতি মেনে নেওয়া হবে না
রোজায় বাজার নিয়মিত নজরদারিতে রাখতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে একাধিক কমিটি গঠন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনেক সময় এসব কমিটি নিয়মিত এবং জনবহুল বাজারগুলোতে ঠিকমতো নজরদারি করে না। এবারে নজরদারিতে কোনো ধরনের গাফিলতি মেনে নেওয়া হবে না বলেও সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন এসব কমিটিকে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়ছে।
পণ্য আড়তে রেখে সংকট তৈরি করলে জব্দ
বেশির ভাগ আমদানিকারকের নিজের আড়ত আছে। কম দামে পণ্য আমদানি করে অনেকেই আড়তে মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে দাম বাড়ান। এবার রোজায় পণ্য আড়তে রেখে অতীতের মতো দাম বাড়ানোর কৌশল করলে ওই সব পণ্য জব্দ করা হবে। মালিককে পণ্য আটকে রাখার জন্য জরিমানাও করা হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়ীদের আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও সোপর্দ করবে।
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাবেক সভাপতি গোলাম রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘রোজায় সাধারণ মানুষকে সহনীয় দামে পণ্য কেনার জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যাগ নিতে হবে। সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া সম্ভব হলে বাজার পণ্যের দাম কমবে।’