গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অস্থিরতা সামাল দেওয়াই অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা সামাল দেওয়ার চেষ্টার মধ্যেই যোগ হয়েছে দাবি আদায়ে নানামুখী রাজনৈতিক অস্থিরতা। অথচ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ভেঙে পড়া পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল এখনো পুরোপুরি চাঙা করা সম্ভব হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে সরকার বেশ চাপের মুখে রয়েছে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে। সরকার একটি সমস্যার সমাধান করতে না করতেই আরেকটি সমস্যা সামনে আসছে। আবার এসবের নেপথ্যে ষড়যন্ত্র রয়েছে বলেও অনেকে মনে করছেন।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত তিন মাসে কিছুটা নমনীয়তার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশল থাকলেও এখন থেকে সরকার কঠোর অবস্থান নেবে। পাশাপাশি ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে ঐক্য বজায় রাখার কৌশলও গ্রহণ করবে সরকার।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বর্তমান সরকার দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার আগের চেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে।
গত ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেওয়ার পর থেকেই নানা দাবিতে রাজধানীসহ সারা দেশে অবস্থান, বিক্ষোভ, অবরোধ ও সহিংসতা চালায় বিভিন্ন পক্ষ। সর্বশেষ আন্তঃকলেজ শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ইসকন নেতা চিন্ময় দাসের গ্রেপ্তারের পর তার অনুসারীদের বিক্ষোভ, গণমাধ্যম ইস্যু নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে।
বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, চলমান অস্থিরতা নিরসনে শিগগিরই প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে তারা। গত সোমবার রাতে অনুষ্ঠিত দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির বৈঠকে চলমান অস্থিরতায় উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলমান অস্থিরতা নিরসনে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করবে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে থাকা দলগুলোকে এ প্রশ্নে ঐকমত্যে রাখার চেষ্টা চালাবে সরকার। তাদের সঙ্গে পরামর্শের পাশাপাশি প্রশাসনিকভাবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্রসংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে সোমবার রাতে সভা করেছেন। সেখান থেকে ‘জাতীয় সংহতি সপ্তাহ কর্মসূচি’ ঘোষণা করা হয়েছে। সরকার গঠন পরবর্তী বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে তাদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হলেও আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন ঠেকাতে সবার মধ্যে ঐক্য জোরদার করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
গত তিন মাসের ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে একটার পর একটা ইস্যু নিয়ে আন্দোলন হয়েছে। একটা দাবি বা আন্দোলন শেষ হতেই অন্য দাবি সামনে আসছে। প্রথম পর্যায়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবরোধ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পদোন্নতি, বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, চাকরি স্থায়ীকরণ, এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বাতিলের দাবিতে অবরোধ, বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়েও অস্থিরতা ছিল। আবার বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি-ছিনতাইয়ের প্রবণতাও বেড়ে গিয়েছিল। বিভিন্ন গণমাধ্যমের কার্যালয়ের সামনেও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মব তৈরির চেষ্টা ছিল। চাকরির বয়স বৃদ্ধির জন্য প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ করা হয়। ভুল চিকিৎসায় ছাত্রের মৃত্যুর অভিযোগকে কেন্দ্র সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে পাল্টাপাল্টি ভাঙচুর করা হয়। যেখানে শিক্ষার্থী ছাড়াও নানা পক্ষের লোকজন জড়িত বলে সরকারসংশ্লিষ্টরা বলেছেন।
সর্বশেষ ইসকন নেতা চিন্ময় দাসের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। চট্টগ্রামের আদালত থেকে চিন্ময় দাসকে কারাগারে নেওয়ার চেষ্টাকালে তার সমর্থকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এ সময় এক আইনজীবীকে ধরে নিয়ে গিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই ইস্যু নিয়ে পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা না করতে সরকার থেকে বলা হচ্ছে।
এসব ঘটনা সম্পর্কে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকারকেএগুলোর বিরুদ্ধে পরিষ্কার এবং খুব শক্ত অবস্থান নিতে হবে। পাশাপাশি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো আছে তাদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। তারা তো এসব নিয়ে কথা বলছে না। তারা শুধু ভোটের কথাই বলছে, ভোটের রাজনীতি করতে চায়। সমাজে তো নানা রকম দ্বন্দ্ব আছে, বিরোধ আছে। নানা রকমের শক্তি আছে। ফ্যাসিবাদ তো কোনো একটা সরকার না। এটা তো একটা আদর্শ। সেই আদর্শটা সমাজের মধ্যে বিদ্যমান। সেই আদর্শের একটা সরকারের পতন হলে কী ফ্যাসিবাদ চলে যাবে তা না? ফ্যাসিবাদের মূল জায়গাটা হচ্ছে গণতন্ত্রের অভাব, পরমত সহিষ্ণুতার অভাব। কর্তৃত্ববাদ, ক্ষমতার আস্ফালন এসব আছে সমাজের মধ্যে।’
তিনি বলেন, মানুষ আওয়ামী লীগের শাসনের সময় ক্ষমতার অভাবে ছিল। আর এখন সবাই ক্ষমতা দেখাতে চাচ্ছে। যার যতটুক ক্ষমতা আছে, সেটা যেভাবে পারে দেখাচ্ছে। মব কালচার দেখা যাচ্ছে। নিজস্ব ক্ষমতা না থাকায় মব তৈরি করে ক্ষমতা দেখাচ্ছে। আর ছাত্রদের জন্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন দরকার। ছাত্রসংগঠনগুলোর অতীত ইতিহাস রয়েছে। তাদের ভূমিকা রাখতে হবে। তাদের নেতৃত্ব দিতে হবে।
বাংলা একাডেমির সভাপতি সমাজ চিন্তক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকারের গতি তো ধীরে। অশান্ত করার জন্য চক্রান্ত কিছু আছে বলে মনে হয়। কীভাবে মোকাবিলা করবে জানি না। তবে ধরপাকড় তো করছে। সমাধান সরকারকে করতে হবে। যদি না করতে পারে তাহলে তো বিপন্ন হবে। দেশের ক্ষতি হবে। জনজীবনে যে সমস্যা ছিল তা তো রয়ে গেছে।’
সরকার ‘সন্ত্রাসী’দের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছেন উপদেষ্টা মাহফুজ আলম । তিনি ফেসবুক পোস্টে মঙ্গলবার লেখেন, ‘গণ-অভ্যুত্থান ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে শান্ত থাকুন। নিরীহ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। সরকার দ্রুতই রাষ্ট্রদ্রোহী ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।’
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, ‘একটি গ্রেপ্তারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে। স্পষ্টভাবে বলতে চাই, কেউ যদি রাষ্ট্রদ্রোহের মতো ঘটনায় যুক্ত থাকে, সে যেই হোক, তাকে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। এটা সম্প্রদায় বিবেচনায় নয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিবেচনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’