‘আমার নানু গো...! নানু...! ও নানু ভাই...!’ মঙ্গলবার (১০ ডিসেম্বর) বেলা ১২টার দিকে রাজধানীর শ্যামলী শিশু হাসপাতালে ঢুকতেই কানে ভেসে আসে এমন রোনাজারি। সামনে এগিয়ে দেখা যায় অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর বয়স্ক এক নারীর কোলে এক শিশুর নিথর দেহ। সেই দেহ দেখে বিলাপ করছিলেন এক মুরব্বি। কথা বলে জানা যায়, তিনি ওই শিশুর নানা। পাশে নির্বাক শিশুটির মা। বেলা ১২টার কিছুক্ষণ আগে শিশুটি মারা যায়।
গত শনিবার টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থেকে স্বজনরা সাত মাসের খাদিজাকে নিয়ে আসেন রাজধানীর শিশু হাসপাতালে। শিশুটি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিল। রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব হাসপাতালেই বাড়ছে শিশু রোগীর সংখ্যা। ঠাণ্ডাজনিত নানা রোগে কাবু হচ্ছে শিশুরা।
২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র-আইসিডিডিআরবি জানায়, দেশে বছরে অন্তত ২৪ হাজার শিশুর নিউমোনিয়ায় মৃত্যু হয়। চলতি শীত মৌসুমে এখন পর্যন্ত কতজন আক্রান্ত ও কত জনের মৃত্যু হয়েছে তা নিশ্চিত করে জানা যায়নি। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ ডা. মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, এক মাস ধরে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত হয়নি। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে তথ্য নিশ্চিত করে জানানো সম্ভব হবে।
২ মাস ২৫ দিন বয়সী ঝিনাইদহের খালিদ সাইফুল্লাহকে গত ১৫ নভেম্বর শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখনো চলছে তার চিকিৎসা। সেও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। এখন পর্যন্ত খুব একটা অবস্থার উন্নতি হয়নি শিশুটির।
শীত আসার সঙ্গে দেখা দিচ্ছে বিভিন্ন ধরনের রোগ। এতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। বর্তমানে শীতের সঙ্গে বায়ুদূষণও যোগ হয়েছে। যা শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। যদিও রাজধানী ঢাকায় খুব একটা শীত পড়েনি। কিন্তু ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে বেশ শীত পড়েছে। রাজধানীতে শীত কম হলেও রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত দূষণ।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের (ঢাকা শিশু হাসপাতাল) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুবুল আলম বলেন, শুধু শীতে নয়; এখন বায়ুদূষণেও আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। জ্বর-সর্দি-কাশি গলায় ইরিটেশন হচ্ছে। দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের ব্রংকিউলাইটিস এবং দু-বছরের বেশি বয়সী শিশুদের নিউমোনিয়া দেখা দিচ্ছে। যাদের অ্যাজমা আছে, শীতে তা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। শীতে শিশুদের ডায়রিয়ার ঝুঁকিও থাকে।
অন্য সময়ের তুলনায় শীতকালে শিশুদের তুলনামূলক পানি কম খাওয়ানো হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। যাতে শিশুরা শীতে পর্যাপ্ত পানি পান করে। বাসায় বড়দের যদি জ্বর-সর্দি-কাশি হয়, তাহলে তারা যেন বাসায় মাস্ক ব্যবহার করেন। কারণ তারা যখন হাঁচি, কাশি দেবেন তা দ্বারা শিশুরা যেন সংক্রমিত না হয়। শিশুদের বিষয়ে বিশেষ যত্ন নিতে হবে।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে অ্যাডিনা ভাইরাস সংক্রমণের সন্দেহ করা হচ্ছে জানিয়ে অধ্যাপক মাহবুবুল আলম বলেন, কিন্তু তা নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ দেশে তা পরীক্ষা করার ব্যবস্থা নেই।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের (ঢাকা শিশু হাসপাতাল) শিশু রেসপিরেটরি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. নাবিলা আকন্দ বলেন, ‘নিউমোনিয়ার লক্ষণ হচ্ছে- কাশি, তার সঙ্গে জ্বর, শ্বাসতন্ত্রের জটিলতার জন্য শ্বাসকষ্ট হতে পারে। খেতে না পারা, বমি করে দেওয়া।’
তিনি বলেন, ‘নবজাতকের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি যদি মিনিটে ৬০ বার থাকে, নবজাতক পরবর্তী এক বছর বয়সী শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি যদি ৫০ বার বা তার অধিক হয় এবং এক বছর থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি মিনিটে যদি ৪০ বার বা তার বেশি হয় তাহলে অবশ্যই ঝুঁকি আছে ধরে নিতে হবে। শিশুর কোনো ধরনের অসুস্থতা দেখা দিলে বাসায় বসে না থেকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।’
শীতকালে শিশুরা পরিবেশগত কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই সময় স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। হাইজিন মেইনটেইন করতে হবে।’
ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের জন্য বুকের দুধ খাওয়ানো খুবই জরুরি উল্লেখ করে এই চিকিৎসক বলেন, শুধু বুকের দুধপানে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটা কমে যায়। সময়মতো টিকাগুলো দিতে হবে। যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম, দুর্বল প্রকৃতির শিশু, যাদের নিউমোনিয়া বারবার হয় বা হওয়ার আশঙ্কা আছে, তাদের জন্য সরকারি টিকার পাশাপাশি প্রতিবছর ইনপ্লুয়েঞ্জার টিকা নিতে পারলে নিউমোনিয়ার ঝুঁকি কমে আসবে।