বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় নিতে বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই লক্ষ্য ও প্রত্যাশা নিয়ে তিন দিনের সফরে আগামী ২০ জানুয়ারি বেইজিং যাচ্ছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি বাংলাদেশের একটি বড় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন।
এই সফরকে চীন সরকারও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের চলমান টানাপোড়েনের সুযোগ নিতে গত ৫ আগস্টের পর থেকেই নানা ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস। ভূ-রাজনৈতিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকায় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বিকল্প ও ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হয়ে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনকে সম্প্রতি বেইজিং সফরের আমন্ত্রণ জানান চীনের ডেপুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের অভ্যন্তরীণ অবস্থান, বাংলাদেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক ও ভারতের নেতিবাচক মনোভাব এবং চীনের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে চীনের দেওয়া এই আমন্ত্রণ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, এই সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে আগামী ৭ জানুয়ারি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকের ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিতে কোন মন্ত্রণালয়ের কী চাহিদা বা পরামর্শ তা এই বৈঠকে আলোচনা করা হবে। এসব পরামর্শ বা চাহিদার ওপর ভিত্তি করে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করা হবে। এই রূপরেখা নিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি বড় প্রতিনিধিদল নির্বাচন করা হবে চীন সফরে যাওয়ার লক্ষ্যে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানায়, ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ পশ্চিমা দেশগুলোর এ ব্যাপারে ব্যাপক আগ্রহ দীর্ঘদিনের। কিন্তু বিগত রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে নানা বিষয়ে মতপার্থক্য এবং প্রতিবেশী একটি দেশের আপত্তির কারণে চীনের অনেক প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এখন বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় না থাকায় সেসব বিষয়ে নতুন করে এগিয়ে আসতে চায় চীন সরকার। তবে এই বৈঠকের পরই পরিষ্কার হবে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যাপক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় চীন।
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বিভিন্ন সময় বলেছেন, দুই দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মানবোধ ও আত্মবিশ্বাসের ওপরে গড়ে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের এই যুগে শুধু কৌশলগত অংশীদার হিসেবেই নয়, বরং বন্ধু হিসেবে চীনের সঙ্গে কাজ করা আমাদের জন্য অপরিহার্য।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সুসম্পর্ক থাকবে। তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখলে পরবর্তী প্রজন্ম লাভবান হবে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অংশীদারত্ব বাড়ানোর তাৎপর্য পুনর্ব্যক্ত করেন, যা এ বছর একটি ‘ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বে পরিণত হয়েছে’। তিনি বলেন, এই নতুন অংশীদারত্বটি বিশ্বাস, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তির ওপর গড়ে উঠেছে।
মায়ানমারের স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তা ও রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের টেকসই প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দিয়ে তোহিদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের জন্য বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে নির্বিঘ্ন সংযোগ প্রয়োজন এবং এ ক্ষেত্রে মায়ানমারের মধ্য দিয়ে সবচেয়ে কার্যকর রুটটি করা যেতে পারে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) উদ্যোগে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এর অধীনে অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য করিডর ও জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং কল্যাণের লক্ষ্যে টেকসই উন্নয়ন ও আঞ্চলিক সংহতির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। মায়ানমার হয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ স্থাপনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেছেন, এই ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে পারস্পরিক অনেক সুবিধা অর্জন করা যেতে পারে।
চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, সব সংকটে বাংলাদেশের পাশে ছিল চীন। কোভিড কিংবা জুলাই আন্দোলনেও চীনা কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা দেশ ছেড়ে যাননি। সব প্রকল্প সময়মতো শেষ হয়েছে।
এদিকে ২০২৫-এ বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপিত হবে। সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানসূচি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বের আলোচনার মধ্য দিয়ে শুরু করতে চায় বেইজিং।
বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের মহাপরিকল্পনা নিয়ে বিশিষ্টজনের অভিমত পড়ুন