মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টা। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং সার্ভিস (এইচটিসি) সেন্টারের বারান্দায় ১৭-১৮ বছর বয়সী এক তরুণকে বসে থাকতে দেখা যায়। তার চোখে-মুখে ছিল ক্লান্তির ছাপ। যে চেয়ারে তিনি বসেছিলেন তার পাশেই ছিলেন আরেকজন তরুণ। নিজেদের মধ্যে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন। হঠাৎ অন্য মানুষ দেখে চুপ হয়ে যান।
কী কাজে এখানে এসেছেন, জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে চেহারায় ক্লান্তির ছাপ থাকা ওই তরুণ বলেন, ‘অনেক দিন ধরে ক্লান্তিভাব ছাড়ছে না। এরই মধ্যে জ্বর ও মাথাব্যথা শুরু হয়েছে। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পর এইচআইভি পরীক্ষা করতে দিয়েছেন। এখন ওই পরীক্ষার রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছি।’
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং সার্ভিস সেন্টারে বিনামূল্যে এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়। যাদের এই রোগের উপসর্গ দেখা দেয়, তারা এখানে পরীক্ষাটি করাতে আসেন। গত কয়েক বছর ধরে এখানে এইচআইভি টেস্টের পরিমাণ বেড়েছে। অনেক রোগীও শনাক্ত হয়েছেন। আর সেই সংখ্যা রীতিমতো চোখ কপালে ওঠার মতো। আক্রান্তদের বেশির ভাগই সমকামী তরুণ। এতে অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহলের দাবি, নৈতিক অবক্ষয়ের কারণেই তরুণরা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। যথাযথ কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তারা সচেতনতা বাড়ানো তাগিদ দিয়েছেন।
কথা হয় কয়েকজন এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সঙ্গে। তাদের একজন জাহিদ (ছদ্মনাম)। তিনি ময়মনসিংহ নগরীর আনন্দ মোহন কলেজে অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী। জানান, কয়েকজন ছেলের সঙ্গে তিনি শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। একপর্যায়ে তার শরীরে অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দেয়। কোনোভাবেই চুলকানি ভালো হচ্ছিল না। এমন অবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকের পরামশ্যে এইচআইভি টেস্ট করান। পরীক্ষায় ধরা পড়ে তিনি এইডসে আক্রান্ত।
জেলার ভালুকার কলেজ শিক্ষার্থী ফাহিমও (ছদ্মনাম) সমকামী। তিনিও চুলকানিজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। ময়মনসিংহ মেডিকেলে বিনামূল্যে এইডস পরীক্ষা করিয়ে তিনিও জানতে পারেন তার শরীরে বাসা বেঁধেছে মরণঘাতী এইডস।
এইচটিসি সেন্টার সূত্র জানায়, পাঁচ বছরে সেখানে ১১ হাজার ২০৮ জনের এইচআইভি পরীক্ষা করে ৬০ জনের শরীরে এইডস ধরা পড়েছে। এর মধ্যে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৩ হাজার ৩৯২ জনের পরীক্ষা করে দুজনের শরীরে এইডস শনাক্ত হয়। ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১ হাজার ৭২৯ জনের পরীক্ষা করে ১০ জনের শরীরে এইডস ধরা পড়ে। ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৩ হাজার ২৯৬ জনের পরীক্ষা করে ১৪ জন শনাক্ত হন। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৭৯১ জনের পরীক্ষা করে ৩৪ জনের এইডস ধরা পড়ে। গত দুই বছরের ব্যবধানে দুজন এইডস আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বাকি ৫৮ জনের মধ্যে ৫৩ জন পুরুষ। এর মধ্যে সমকামী ৪০ জন।
এইচটিসি সেন্টারের কাউন্সেলর কাম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘চলতি বছরের মে মাসে ময়মনসিংহের একটি উপজেলার এক পরিবারের স্বামী, স্ত্রী ও তাদের তিন শিশুসন্তানের এইডস শনাক্ত হয়। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জেলায় এইডস রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তাদের বেশির ভাগেরই বয়স ১৯ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। ময়মনসিংহে এইডসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই সমকামী পুরুষ।’
তিনি বলেন, ‘রক্ত, বীর্য, বুকের দুধ আদান-প্রদান, অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক, অপরীক্ষিত রক্ত গ্রহণ, একই সুই-সিরিঞ্জ ব্যবহার করে মাদক সেবনেও ছড়াতে পারে এইচআইভি ভাইরাস। এ ছাড়া এইডসে আক্রান্ত মা-বাবার কাছ থেকে শিশুর শরীরে এইচআইভির জীবাণু যেতে পারে।’
বিষয়টি উদ্বেগজনক উল্লেখ করে ময়মনসিংহ নাগরিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন কালাম বলেন, ‘তরুণরা যেন বিপথে গিয়ে নিজেদের ক্ষতি না করে, এই বিষয়টি তাদের বোঝাতে হবে। এ জন্য তাদের পরিবারকে সচেতন থাকতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদেরও এইডস সম্পর্কে গুরুত্বের সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে আলোচনা করতে হবে।’
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচআইভি ইউনিটের ফোকাল পারসন ফরহাদ হোসেন হীরা বলেন, ‘জেলায় এইডসে আক্রান্ত তরুণদের বেশির ভাগই সমকামী। তরুণদের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে এ ধরনের প্রবণতা বাড়ছে। এ থেকে উত্তরণে সামাজিক সচেতনতা জরুরি।’