চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার হিঙ্গুলি ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ মেহেদী নগর এলাকা। সেখানে ভেকু মেশিন দিয়ে কাটা হচ্ছে বিশাল একটি টিলা। ইতোমধ্যে টিলার বিশাল অংশ কেটে সমতল করা হয়েছে। একই সঙ্গে শত শত গাছও উপড়ে ফেলা হয়েছে। পুরো এলাকাটি পাহাড়ি লাল মাটির রঙে লালচে হয়ে উঠেছে।
দিনদুপুরে এমন পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে হতবাক সেখানকার স্থানীয়রা। কিন্তু প্রভাবশালী বিএনপি নেতার ছত্রচ্ছায়ায় টিলা কাটার কাজ চলায় কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। এমনকি প্রশাসনও সেখানে অভিযান না চালানোয় মুখে কুলুপ এঁটেছেন। এতে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে হিঙ্গুলি ইউনিয়নের প্রাণ-প্রকৃতির অন্যতম কেন্দ্র আলমের টিলা নামে পরিচিত এই এলাকাটি। টিলাটির পেছনে আছে বিশাল পাহাড়।
স্থানীয়দের শঙ্কা পাহাড়খেকো চক্র টিলার পর পাহাড়েও কোপ বসাতে দেরি করবে না। তাদের অভিযোগ, এক মাস ধরে স্থানীয় বিএনপি নেতা ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বেলায়েত হোসেন মেম্বার, জামায়াত কর্মী দেলোয়ার হোসেন, ভেকু মেশিন ব্যবসায়ী সেন্টুসহ আরও কয়েকজন মিলে টিলাটি কাটছেন।
খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, সরকার পতনের আগে সেখানে টিলাটি কাটা হতো স্থানীয় যুবলীগ নেতা সোহাগের নেতৃত্বে। আর ৫ আগস্টের পর থেকে টিলাটি কাটা হচ্ছে বিএনপি নেতা ও একসময়ের ইউপি সদস্য বেলায়েত হোসেন ও জামায়াত কর্মী দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে। সেখানে ভেকু মেশিন পরিচালনা ও ভাড়া দিয়েছেন উপজেলা বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার ভগ্নিপতি সেন্টু। দেলোয়ারের বাড়ি হিঙ্গুলি ইউনিয়নের চিনকি আস্তানা এলাকায় হলেও বারইয়ারহাটে তার দোকান রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, বারইয়ারহাটে প্লট বিক্রির একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। তারা বিভিন্ন জায়গায় বিরোধপূর্ণ জমি কিনে রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে বিরোধ মিটিয়ে অন্য জায়গায় মোটা দামে সেটা বিক্রি করে দেন। এর মধ্যে আছেন দেলোয়ার, বেলায়েত, সেন্টুসহ আরও কয়েকজন। আলমের টিলা কেটে খামার গড়ে তোলা তাদের তেমনই একটি প্রকল্প।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের এলাকায় পরিবেশ হুমকির মুখে। এখানে বন্যপ্রাণী দূরে থাক, মানুষও বাস করতে পারছে না। ওরা প্রভাবশালী হওয়াতে কেউ মুখ খুলছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাত-দিন মাটির ট্রাক চলাচল করায় সেই রাস্তায় একটি রিকশাও চলতে পারে না। ধুলোবালিতে অতিষ্ঠ সবাই। বর্তমানে অনেকেই সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। দীর্ঘ ১ মাসের বেশি সময় ধরে এই টিলা কাটার কাজ চলছে। প্রশাসন শুরুতে একবার অভিযান চালালেও কোনো লাভ হয়নি।’
অভিযোগ স্বীকার করে বিএনপি নেতা ও সাবেক ইউপি সদস্য বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘এনাম হোসেন নামে একজনের কাছ থেকে কিনে আমরা টিলাটি কেটে সমতল করছি মাত্র। আমরা সেখানে প্রায় ১ একরের বেশি জায়গায় ভেড়া-ছাগলের একটি খামার করছি। টিলার পাশাপাশি সেখানে নাল জমিও আছে। আমরা জমিটি কেনার আগেই সবাই মিলে আলাপ-আলোচনা করে পরিকল্পনার মাধ্যমে টিলা কেটে নালের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছি। আমাদের সঙ্গে জমির মূল মালিকও ছিলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এসিল্যান্ডের কাছ থেকে আলোচনা করে টিলা কাটার সরঞ্জামগুলো নিয়ে আসছি। এ সময় এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের কোনো অনুমতি নেই। আমরা নিজেরাই টিলাটি কাটা শুরু করেছি।’
অভিযোগ স্বীকার করে দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি বিএনপির বেলায়েত হোসেন মেম্বারকে চুক্তিভিত্তিতে সব দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছি। আর বিএনপির একজন নেতার আত্মীয় সেখানে ভেকু মেশিন ভাড়া দিয়েছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে কিছু গ্রুপিং থাকাতে বিষয়টি মিডিয়াতে প্রকাশ হয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ৫ জন মিলে সেখানে একটি খামার করছি। ১ একরের বেশি জায়গা আমার নামে দলিল হয়েছে। টিলা থাকাতে কেটে সমান করে দিচ্ছি।’
এ বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব গাজী নিজাম উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি নিজেকেও এসব কাজে জড়িত করতে চাই না এবং কেউ যেন জড়িত না হয়, সেজন্য সতর্ক করি সবসময়। প্রয়োজনে হালাল ব্যবসা করে খাব। আমাদের দলের কেউ জড়িত হলে আমরা প্রমাণ পেলে অবশ্যই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব।’
এ ঘটনায় জামায়াতের জোরারগঞ্জ থানা আমির নুরুল ইসলাম হামিদীকে কল করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে জানান। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহফুজা জেরিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে গত ১৩ জানুয়ারি ওই এলাকায় একজনকে আটক করে জরিমানা করেছি। এর মধ্যে এসিল্যান্ড ৪টি জায়গায় অভিযান করেছেন। পরিবেশ রক্ষায় আমরা প্রতিনিয়ত তৎপর আছি।’