ঢাকা ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
স্বাস্থ্য খাতে সংকট: বরাদ্দের অর্ধেকও ব্যয় হয় না ৯ জুন  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি শেরপুরে নিখোঁজ ৫ ছাত্রের ৩ জনকে জীবিত উদ্ধার তনু হত্যা: দুই আসামিকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলে রেড নোটিশের নির্দেশ বোয়ালখালীতে ওমান প্রবাসীকে হত্যা: শোকে পাথর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও মা মবতন্ত্র ও উচ্ছৃঙ্খল রাজনীতি বাড়ছে: যুবদল সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা ইউনুছ হাওলাদার আর নেই মরিশাসের শ্রমবাজার খুলতে সমঝোতা চুক্তিতে সম্মত টিআইবি প্রকৃত ঘটনা জাজ করে স্টেটমেন্ট দেয় না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নারীর নিরাপত্তা নিয়ে অস্বস্তিকর বাস্তবতা ঈশ্বরগঞ্জে অটোরিকশাচাপায় শ্রমিকের মৃত্যু গণতন্ত্রে হতাশা এবং নেতৃত্বে অসন্তোষ শরীয়তপুরে প্রধান শিক্ষকের ওপর মব হামলা, আদালতে মামলা কন্যাশিশু নির্যাতন: আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংকট মনপুরায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে কেন্দ্র করে মামলা, ছাত্রলীগ নেতা কারাগারে বাজেট বাস্তবায়নে ছলচাতুরি চলবে না: চরমোনাই পীর আকাশসীমা পুনরায় খুলে দিয়েছে ইরাক ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে: মাহদী আমিন যেকোনো সাফল্যে যে দোয়া পড়তেন বিশ্বনবি (সা.) রৌমারীতে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে নারীর মৃত্যু ইন্টার্ন ও ট্রেইনি চিকিৎসকদের কর্মবিরতি প্রত্যাহার ইসরায়েলবিরোধী সামরিক অভিযান স্থগিতের ঘোষণা ইরানের শেরপুরে ১২ দিনে পাঁচ শিক্ষার্থী নিখোঁজ, অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ জঙ্গল সলিমপুরে সড়ক নির্মাণকাজ শুরু করেছে সেনাবাহিনী ভাঙ্গায় বিয়েবাড়িতে খাবার নিয়ে সংঘর্ষে আহত ৭ হালুয়াঘাটে ছুরিকাঘাতে প্রাণ গেল যুবকের কালিহাতীতে ট্রেনে কাটা পড়ে গৃহবধূর মৃত্যু, পাশে মিলল আরেক নারীর মরদেহ ঝিনাইদহে ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল জাতীয় মুট কোর্ট প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন ঢাবি পবিপ্রবিতে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম হেমায়েত জাহান
Nagad desktop

স্বাস্থ্যসংস্কার প্রস্তাব রোগ প্রতিরোধে গুরুত্ব বিএনপির, চিকিৎসায় নাগরিক কমিটি

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৬:০০ এএম
রোগ প্রতিরোধে গুরুত্ব বিএনপির, চিকিৎসায় নাগরিক কমিটি
ছবি: সংগৃহীত

দেশে রোগীদের রোগের তথ্য সংরক্ষণে নেই নির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা। এক হাসপাতালে দেখানোর পর আরেকটিতে গেলে যাবতীয় কাগজ নিয়ে যেতে হয়। তা না হলে ওই চিকিৎসক জানতেই পারেন না আগের হাসপাতাল থেকে রোগী কী ধরনের চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন, কী কী পরীক্ষা করিয়েছেন। তা ছাড়া দুই বছর, তিন বছর কিংবা আরও আগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসকের দেওয়া ব্যবস্থাপত্র রোগীরা খুব একটা সংরক্ষণ করে রাখেন না। তথ্য সংরক্ষণ না থাকায় রোগের ইতিহাস জানা যায় না, বারবার পরীক্ষা করতে হয়, সময় নষ্ট হয় এবং চিকিৎসায় ভুলের ঝুঁকি বাড়ে।

ঝুঁকি এড়িয়ে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আধুনিক, সমৃদ্ধ এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় নাগরিক কমিটি। অগ্রাধিকার দেওয়া সাতটির মধ্যে অন্যতম জাতীয় ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড (ইএইচআর) ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি। বিএনপির স্বাস্থ্য সংস্কার প্রস্তাবেও এ বিষয়টি এসেছে। গত ৬ ফেব্রুয়ারি বিএনপিও স্বাস্থ্য সংস্কার প্রস্তাব জমা দিয়েছে।

এর আগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, এনডিএফ, ড্যাবসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য খাত সংস্কারে বিভিন্ন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিএনপির প্রস্তাবে রোগ প্রতিরোধের বিষয়টি খুবই গুরুত্ব পেয়েছে। নাগরিক কমিটির প্রস্তাবে প্রতিরোধের চেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে চিকিৎসার বিষয়টি। বিভিন্ন দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত দেওয়া স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার প্রস্তাবে উপেক্ষিত পুষ্টি ও নারীস্বাস্থ্য।

কমিশনের সদস্যরা মনে করছেন, এই বিষয়গুলোতেও জোর দেওয়া প্রয়োজন। তারা যে প্রস্তাব পেয়েছেন, তাতে যেগুলো বাদ পড়েছে তা যুক্ত করে চলতি মাসেই একটি সুন্দর প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করবেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. ইউনূস শপথ গ্রহণ করেন। এরপর খাতভিত্তিক সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সেই অনুযায়ী সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়।

স্বাস্থ্য খাত সংস্কারে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ কে আজাদকে প্রধান করে গত বছরের ১৮ নভেম্বর ১২ সদস্যের কমিশন গঠন করা হয়। ৯০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সব মতামত বিবেচনা করে প্রস্তুত করা প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তরের সময় বেঁধে দেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী আগামীকাল ১৭ ফেব্রুয়ারি ৯০ দিন পূর্ণ হবে। তবে এর মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে পারবে না কমিশন। আরও হয়তো সময় চাইবে। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রধান বলছেন, ফেব্রুয়ারির মধ্যেই প্রতিবেদন হস্তান্তর করবেন। তবে কমিশনের কেউ কেউ মনে করছেন, মার্চের মাঝামাঝির আগে প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব হবে না। কারণ স্বাস্থ্য খাতের পরিসর অনেক বড়। দেশে ১৮ কোটি মানুষের সবাই স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট। তাই এই খাত সংস্কারের কাজটি বেশ সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে।

কমিশনপ্রধান অধ্যাপক এ কে আজাদ বলেন, ‘বহু প্রস্তাব পেয়েছি। সেগুলো গুছিয়ে লেখা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব হবে না। মেয়াদ বাড়ানোর জন্য দরখাস্ত করছি। তবে এই মাসের মধ্যেই প্রতিবেদন দিয়ে দেব।’

গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে রাজধানীর মিন্টো রোডে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন কার্যালয়ে জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক, স্বাস্থ্য পলিসি এবং অ্যাডভোকেসি সেলের সম্পাদক ডা. তাসনিম জারার নেতৃত্বে ৭ সদস্যের প্রতিনিধিদল সংস্কার প্রস্তাব জমা দেয়। এই প্রস্তাবে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান তিনি।

সেগুলো হলো জরুরি স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন ও আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স সিস্টেম, একটি কার্যকর রেফারেল সিস্টেম চালু করা, স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য উন্নত কর্মপরিবেশ ও ন্যায্য পারিশ্রমিক, সারা দেশে ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা (ইএইচআর) চালু করা, চিকিৎসার জন্য প্রমাণভিত্তিক জাতীয় গাইডলাইন, একটি জাতীয় বায়োব্যাংক স্থাপন ও সরকারি উদ্যোগে নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্য তথ্য প্ল্যাটফর্ম চালু করতে সুপারিশ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সাতটি প্রস্তাবের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ও পুষ্টির বিষয় আসেনি। এখানে রোগ হওয়ার পরে চিকিৎসার বিষয়ে গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (বিএমআরসি) চেয়ারম্যান ও কমিশন সদস্য অধ্যাপক অধ্যাপক ডা. সায়েবা আক্তার বলেন, ‘রোগ প্রতিরোধের কথাটা আমাদের আগে চিন্তা করা উচিত।’

গত ৬ ফেব্রুয়ারি বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের কার্যালয়ে স্বাস্থ্য সংস্কার প্রস্তাব হস্তান্তর করেছে। এর আগে গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী খোন্দকার ড. মোশাররফ হোসেন সংবাদ সম্মেলন করে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় স্বাস্থ্য খাত সংস্কার প্রস্তাব (খসড়া) তুলে ধরেন।

বিএনপির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ‘একটি পরিকল্লিত স্বাস্থ্যনীতির অনুপস্থিতি, চিকিৎসক-চিকিৎসা প্রার্থীর সম্পর্ক উন্নয়ন, প্রতিরোধই যে প্রতিকারের চাইতে গুরুত্বপূর্ণ’ এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা।

বিএনপির প্রস্তাবে রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিএনপি স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে প্রস্তাব দিয়েছে। স্বাস্থ্যের সামগ্রিক বিষয় চলে এসেছে ওই প্রস্তাবে। দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক চাহিদা পূরণে সক্ষম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, স্বাস্থ্য পর্যটন উপযোগী একটি আন্তজার্তিক মানের স্বাস্থ্য পরিকাঠানো নির্মাণ করা।

বিগত ১৫ বছর দেশের স্বাস্থ্য খাতে পরিকল্পিত উদাসীনতা ও দুর্নীতির ব্যাপকতার মাধ্যমে অতি সাধারণ চিকিৎসার জন্যও ক্রমবর্ধমান বিদেশ গমনের প্রবণতা, দেশীয় সেবার প্রতি জনগণকে বিমুখ করার ষড়যন্ত্রের বিষয়টি স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্কারের অগ্রাধিকারের বিবেচনায় রাখারও প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি। সুষ্ঠু তদন্ত ও পর্যালোচনার মাধ্যমে ১৫ বছরের অনিয়ম-দুর্নীতির নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ও দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিতের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বিএনপির প্রস্তাবে সংক্রমক এবং অসংক্রমক রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, কমিউনিকেশন স্কিল বৃদ্ধিতে চিকিৎসা শিক্ষায় বিশেষ জোর দেওয়া, প্রাথমিক-মাধ্যমিক স্কুলে ফাস্ট এইডের প্রয়োগিকভাবে শিক্ষা এবং পরিবহন শ্রমিকদের জন্য বাধ্যতামূলক ফাস্ট এইড, সিপিআর ও রেসকিউ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।

নাগরিক কমিটির অগ্রাধিকার দেওয়া সাতটি বিষয়ের মধ্যে পাঁচটি বিষয়ের সঙ্গে বিএনপির প্রস্তাবে মিল আছে। রেফারেল সিস্টেম, জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবার নিশ্চয়তা, চিকিৎসকসহ সব স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীকে ন্যায্য অধিকার ও সুরক্ষা, ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড ব্যবস্থা চালু ও গবেষণা- এই বিষয়গুলো বিএনপি এবং নাগরিক কমিটি উভয়ের প্রস্তাবে এসেছে।

নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাসনিম জারা বলেছেন, বাংলাদেশে জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা বিপর্যস্ত। অনেক রোগী সময়মতো অ্যাম্বুলেন্স পান না, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অনেকে মারা যান। সে জন্য একটি আধুনিক জরুরি সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সে প্রশিক্ষিত প্যারামেডিক থাকবে, যাতে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়। এখনকার মতো শুধু রোগী পরিবহনের পরিবর্তে অ্যাম্বুলেন্সেই জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা শুরু হবে, যা মৃত্যুহার কমাতে সাহায্য করবে।

এ ছাড়া সরকারি উদ্যোগে নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্মের প্রস্তাব দিয়েছে নাগরিক কমিটি। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নাগরিক কমিটি জানায়, অসুস্থ হলে অনেকেই গুগল বা সামাজিক মাধ্যমে চিকিৎসা পরামর্শ খোঁজেন, যেখানে ভুয়া তথ্যের ছড়াছড়ি। এর ফলে অনেকে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পান না। এই সমস্যা সমাধানে একটি সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত, নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্ম চালু করতে সুপারিশ করা হয়েছে। 

রোগ প্রতিরোধ, পুষ্টি এবং নারীস্বাস্থ্যের বিষয় তাদের প্রস্তাবে গুরুত্ব পেয়েছে কি না জানতে চাইলে নাগরিক কমিটির সদস্য ডা. মিনহাজুল আবেদীন বলেন, ‘কিছু কিছু কাভার করবে। সবকিছু কাভার করতে পেরেছি এ রকম না। আমাদের চিকিৎসা খাত খুবই অগোছালো। অনেক বিষয় আছে। সে কারণে আমরা চিকিৎসার বিষয়ে জোর দিয়েছি।’

নাগরিক কমিটির সদস্য ডা. আশরাফুল আলম সুমন বলেন, ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের মধ্যে রোগ প্রতিরোধের বিষয়টি চলে আসে। সেই বিষয়টি আমাদের প্রস্তাবে আছে।’

কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য-সহায়তা ট্রাস্টের সভাপতি ও স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ‘রোগ প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্য উন্নয়নে জোর দিতে হবে। যেমন পুষ্টি বা ফ্যামিলি প্ল্যানিং স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য এগুলো লাগে। যদি স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটাতে পারি আর রোগ প্রতিরোধ করতে পারি এবং নিচের দিকে এগুলোকে যদি ট্যাকল করতে পারি, তাহলে ওপরের দিকে আর যেতে হবে না। আমাদের দরকার নিচের দিকে শক্তিশালী করা।’

বিএনপি, ড্যাব, এনডিএফ, জামায়াত ও নাগরিক কমিটি সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রতিরোধ-প্রতিকারের ওপর বেশ জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পুষ্টির বিষয়টা ওইভাবে আসেনি। পুষ্টির বিষয়ে আরেকটু জোর দিতে হবে।’

নির্ধারিত ৯০ দিনে প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মনে হয় না। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পরিবার পরিকল্পনা, বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি, ওষুধ, জনবল, প্রাইভেট সেক্টর, পাবলিক সেক্টর। স্বাস্থ্যের পরিসর অনেক বড়। এখনো অনলাইন সার্ভে হচ্ছে। কয়েক দিন মধ্যে হয়তো রিপোর্ট পাব। আমাদের চর এলাকায় এখনো যাওয়া হয়নি। হয়তো এই মাসের মাঝামাঝি আমরা যাব। আমরা গ্রাফটিং শুরু করেছি। কিন্তু মজবুত একটা জিনিস দিতে গেলে আরেকটু চিন্তাভাবনা করা লাগে। আমাদের কেউ কেউ বলছেন, এ মাসের মধ্যে দিতে পারব। কিন্তু আমার মনে হয় না আমরা দিতে পারব। আমি সাজেস্ট করব, কমিশনকে মার্চের মাঝামাঝি দিতে।’

বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (বিএমআরসি) চেয়ারম্যান ও কমিশন সদস্য অধ্যাপক ডা. সায়েবা আক্তার বলেন, ‘বিভিন্ন সংগঠন ও দলের কাছ থেকে যে প্রস্তাব এসেছে, তাতে উপেক্ষিত নারীস্বাস্থ্য। নারীস্বাস্থ্য নিয়ে আমরা নিজেরা চেষ্টা করছি। বাকিরা যারা আছে, তারা কেউ নারীস্বাস্থ্যের কথা বলে না। পুষ্টির কিছু বিষয় আসছে। নারীস্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সংস্কার কমিশনে নিজেদের মধ্যে অনেক কথা বলা হচ্ছে। আমরাও প্রস্তাব রেখেছি। নারীস্বাস্থ্য বলতে আমরা সাধারণত মাতৃস্বাস্থ্য বুঝি। কিন্তু এর বাইরেও নারীদের স্বাস্থ্যের অনেক কিছু আছে। সেগুলো কিন্তু অ্যাড্রেস করা হয় না। তা নিয়ে আমরা কথা বলছি। অনেক ধরনের স্পেশালাইজড হসপিটল আছে কিন্তু নারী স্বাস্থ্যের ওপর স্পেশালাইজড হাসপাতাল নেই। এটা মেয়েদের প্রয়োজন এবং অধিকার দুটিই।’

স্বাস্থ্য খাতে সংকট: বরাদ্দের অর্ধেকও ব্যয় হয় না

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৮:১৭ এএম
আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬, ০৮:২৩ এএম
স্বাস্থ্য খাতে সংকট: বরাদ্দের অর্ধেকও ব্যয় হয় না
বাজেট ২০২৬-২০২৭

সংকটে দেশের স্বাস্থ্য খাত। এ খাতের উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করার সুযোগ থাকলেও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের অর্ধেকও খরচ করেনি। আগামী অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে চলতিবারের তুলনায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত বিভাগগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে দ্বিতীয় অবস্থানে রাখা হয়েছে। 

• অন্তর্বর্তী সরকার স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের মাত্র ৩০-৪০% খরচ করেছে
• আগামী বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় ১২,১৬৭ কোটি টাকা
• শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, সঠিক ব্যয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে

স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, শুধু বরাদ্দ রাখলেই হবে না। বরাদ্দ ব্যয় করার বিষয়েও নজর দিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের সরকার ছিল না, তাই জবাবদিহিও ছিল না। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে কাজ না করলেও চলেছে। কিন্তু বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত। জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আশা করি, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের সবটা ব্যয় করে এ খাতের উন্নয়ন করবে। সবার জন্য গুণগত চিকিৎসা নিশ্চিত হবে। 

ওষুধ শিল্প সমিতির সাবেক মহাসচিব, বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও ডেল্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চিকিৎসক জাকির হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার এ পর্যন্ত বরাদ্দের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই খরচ করতে পারেনি। দেশে হামের মতো একটি সাধারণ রোগের টিকা পর্যন্ত আমদানি করা হয়নি। শুধু হাম নয়, আরও অনেক রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে সরকারের অর্থ ব্যয় করে সাধারণ পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তেমন কোনো কাজ হয়নি। 

ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করা অর্থ ফেরত যাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এ দেশে একজন মানুষ নিজের চিকিৎসার মোট খরচের ৬০-৭০ শতাংশ নিজের পকেট থেকে ব্যয় করেন। এ দেশে সরকারি অর্থ চিকিৎসা খাতে খরচ হবে না–এটি ঠিক নয়। নির্বাচিত সরকারের কাছে আবেদন জানাব, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়েই দায়িত্ব শেষ করবেন না, কোথায় কীভাবে কারা কতটা খরচ করছে, তাও খতিয়ে দেখবেন। এ দেশের মানুষের জন্য বিনামূল্যে সরকারি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।’ 

আওয়ামী লীগ সরকার প্রণীত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ৪১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা (প্রায় ৪১৪০৮ কোটি টাকা) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এটি ছিল ওই বাজেটের মোট আকারের প্রায় ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং মোট জিডিপির শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। ওই বাজেটে বিনামূল্যে দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসাসেবা এবং টিকাদান কর্মসূচি জোরদারে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। 

পরে অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সে সময়ে অর্থ খাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনকালে বলেছিলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে সব নাগরিককে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে সেবার পরিধি বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও দক্ষ জনবল নিয়োগে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের শূন্য পদ পূরণে চিকিৎসক, সেবিকা, টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্ট ও স্বাস্থ্য সহকারীদের নিয়োগ ত্বরান্বিত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টির সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। 

সাবেক অর্থ উপদেষ্টা আরও বলেছিলেন, বাজেটে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য অতিরিক্ত ৪ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা এবং সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির জন্য ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দেশে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে রেফারেল হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি ৫০ শয্যার বেশি সব হাসপাতাল স্থাপনের জন্য সুবিধা থাকছে। 

ওষুধ শিল্প সমিতির সাবেক মহাসচিব জাকির হোসেন বলেন, সাবেক অর্থ উপদেষ্টার পরিকল্পনাগুলোর প্রায় সব কটি কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ আছে। দেশে হামের কারণে ছয় শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে অথচ হামের টিকা আমদানি করাই হয়নি। 

তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ টাকা ব্যয় করতে না পারার অন্যতম কারণ স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্পের বেশির ভাগ মহাপরিচালক, পরিচালকের অভিজ্ঞতা থাকে না। বরাদ্দ ব্যয় করা না হলে কোনো জবাবদিহি চাওয়া হয় না। আমাদের মতো গরিব দেশে স্বাস্থ্য খাতের সরকারি বরাদ্দ ব্যয় না করা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা উচিত। অথচ দেখেন হামের টিকা না আনার কারণে কার কী শাস্তি হয়েছে?’ 

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না। যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। কয়েক বছর ধরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের মতো হলেও কী পরিবর্তন হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে? মোট বাজেটের অন্তত ৭ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন এবং তা সঠিকভাবে ব্যয় করতে হবে। বিনামূল্যে সরকারি স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হবে। 

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। আগামী বছরের বাজেটে যে ১০ মন্ত্রণালয় বা বিভাগে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তার মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ দ্বিতীয়। চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রাপ্তের তালিকায় সাত নম্বরে ছিল। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ৩১ হাজার ২২ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। আগামী বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বরাদ্দ বাড়ছে ১২ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা। মোট বাজেটের আকার হিসাবে এ খাতে বরাদ্দ বাড়ছে দশমিক ৬৭ শতাংশ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এ হিসাবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে জিডিপির দশমিক ৬৩ শতাংশের সমান বরাদ্দ থাকছে। অর্থাৎ জিডিপির ভিত্তিতেও আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ বাড়ছে।

বিদ্যুতে হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান চুরি, সিস্টেম লস ও ভর্তুকিতে ঘুরপাক

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪৯ এএম
চুরি, সিস্টেম লস ও ভর্তুকিতে ঘুরপাক
বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের পকেট কেটে ভর্তুকির ওপর নির্ভর করেই টিকে আছে পুরো বিদ্যুৎ খাত। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত যুগ যুগ ধরেই লোকসানে রয়েছে। চুরি, সিস্টেম লস, অপচয়, দুর্নীতি এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে প্রতিবছরে এই খাতে রাষ্ট্রকে গুনতে হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি। বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের পকেট কেটে ভর্তুকির ওপর নির্ভর করেই টিকে আছে পুরো বিদ্যুৎ খাত। উপাদন সক্ষমতা বাড়লেও বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা, অবৈধ সংযোগ, মিটার কারসাজি এবং বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বিদ্যুৎ খাত এখনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎ চুরির অন্যতম প্রধান উৎস হলো অবৈধ সংযোগ বা ‘হুকিং’। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ি, দোকানপাট, বাজার এবং অস্থায়ী স্থাপনায় সরাসরি বিদ্যুতের লাইন থেকে সংযোগ নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া মিটার টেম্পারিং, বাইপাস সংযোগ, বিলিং জালিয়াতি এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অবৈধ চার্জিং স্টেশন থেকেও বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে। অনুমোদনহীন এসব চার্জিং পয়েন্টে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হলেও এর বড় অংশের কোনো বৈধ হিসাব থাকে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে অসাধু কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাদের কারসাজিতে হচ্ছে অনিয়ম-দুর্নীতি। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ওই সব অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভুতুড়ে বিল, মিটার জালিয়াতি, অবৈধ সংযোগ, সিস্টেম লসের নামে অনিয়ম এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কার্যকর জবাবদিহি ও শাস্তির নজির না থাকায় পরিস্থিতিরও তেমন উন্নতি হচ্ছে না। অন্যদিকে, বছর বছর বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হলেও খাতটির আর্থিক সংকট কাটছে না। 

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বিদ্যুতের সিস্টেম লস সাধারণত ২ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বাংলাদেশে তা ১০ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও বিতরণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পুরোনো অবকাঠামো, দুর্বল ট্রান্সফরমার, জরাজীর্ণ লাইন এবং অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে প্রযুক্তিগত ক্ষতির পাশাপাশি চুরি ও অনিয়ম মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ৯ হাজার ৫৪৩ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও গ্রাহকদের কাছে পৌঁছেছে ৮ হাজার ৮১৯ কোটি ইউনিট। ফলে ৭২৪ কোটির বেশি ইউনিট বিদ্যুৎ সিস্টেম লস হিসেবে অপচয় হয়েছে। প্রতি ইউনিটের গড় মূল্য হিসাব করলে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা।

বিতরণ সংস্থাগুলোর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডেসকোর বিদ্যুৎ অপচয়ের হার ছিল ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ, ডিপিডিসির ৫ দশমিক ৬, পিডিবির ৬ দশমিক ৬৮, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ৭ দশমিক ২৬ এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ।

একই সময়ে বিপিডিবির আর্থিক অবস্থা আরও নাজুক হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটির নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৮ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে লোকসান বেড়েছে ৯৪ শতাংশেরও বেশি।

বিদ্যুৎ সরবরাহে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিডিবির মোট ব্যয় ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বিদ্যুৎ বিক্রি করে আয় হয়েছে ৬৯ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। ঘাটতি কমাতে অর্থ বিভাগ থেকে ৩৮ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকার নিট লোকসান হয়েছে সংস্থাটির।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে বেসরকারি আইপিপি কেন্দ্রগুলো থেকে। এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৭২ হাজার ৭১ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৪ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আইপিপি থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছিল ৫৭ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকার। অথচ জাতীয় বাজেটে এ খাতে ব্যয়ের প্রাক্কলন ধরা হয়েছিল মাত্র ৪৩ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাত থেকে ১ লাখ ৩০৯ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। প্রতি ইউনিটের গড় দাম পড়েছে ১৪ টাকা ৪৫ পয়সা, যা আগের বছরের তুলনায় ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ৪০ পয়সা বেশি। ফলে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচও বেড়ে ১২ টাকা ১০ পয়সায় পৌঁছেছে, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ১১ টাকা ৩৫ পয়সা।

বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি নিয়েও রয়েছে তথ্যগত অসংগতি। বিপিডিবির হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুতে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ৩৮ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের এক নথি অনুযায়ী একই সময়ে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৫৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বকেয়াসহ বিদ্যুৎ খাতে মোট ভর্তুকি ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের মোট জ্বালানির প্রায় ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর এবং এর প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। ফলে আমদানি নির্ভরতা কমানো না গেলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপও কমবে না। বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সম্ভাব্য আর্থিক ঘাটতি প্রায় ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম একাধিকবার বাড়ানো হলেও আর্থিক সংকট কাটছে না। চলতি মাসে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ, গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং সঞ্চালন (হুইলিং) চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সাড়ে ৮ শতাংশ এবং পাইকারি দর ৬ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল। 

বিদ্যুৎ খাতে লোকসানের পেছনে বিতরণ সংস্থার কর্মকর্তাদের ‘চুরি’র কারণে সংকট কাটছে না বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ খাত একটি অসাধু সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাদের লাগামহীন দুর্নীতি ও চুরির কারণে দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকারের কারণেও এই সংকট বাড়ছে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে এমন ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যারা ভোক্তাবিরোধী ও গণবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে বিচারের কোনো নজির নেই। ফলে সংকটও কাটছে না।

অধ্যাপক শামসুল আলমের মতে, বিদ্যুৎ খাতের ঘাটতি কমানোর কথা বলে বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও বাস্তবে আর্থিক ঘাটতি কমছে না, বরং প্রতিবছরই তা বাড়ছে। তিনি বলেন, সরকারের প্রধান দায়িত্ব জনগণকে সেবা দেওয়া, মুনাফা অর্জন নয়। তাই শুধু দাম বাড়ানোর নীতি অনুসরণ না করে সাধারণ মানুষের স্বার্থে বিদ্যুতের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার উদ্যোগও প্রয়োজন।

বিএনপির ১৩ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:২৪ এএম
বিএনপির ১৩ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

দেশের অর্থনীতি সংকটে আছে। রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি নেই। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সর্বনিম্ন। এমন প্রেক্ষাপটেও আগামী অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বিএনপির ১৩ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা থাকছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেটবিষয়ক প্রতিবেদন থেকে এসব জানা যায়। 

প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, বাজটে বক্তৃতায় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচির কথা থাকছে। এলাকাভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এভাবে একগুচ্ছ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। 

সূত্র জানায়, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের বাজেট দিতে যাচ্ছে তারেক রহমানের সরকার। গতকাল পর্যন্ত এ বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে হিসাব কষা হয়েছে। ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলেছেন, সরকার বিভিন্ন সংকটে আছে। আর তাই আগামী বাজেটে বিএনপি সরকারের নির্বাচনি সব প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব না হলেও বেশির ভাগই থাকছে। এসব প্রতিশ্রুতির বেশির ভাগই সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের পরিবর্তে পাইলট প্রকল্প হিসেবে আনা হবে। 

অর্থনীতির সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েই রেকর্ড ঘাটতির বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। বাজেটে অর্থায়নে যে সূত্র আঁকা হয়েছে, তা সফল না হলে সমগ্র অর্থনীতি চাপে পড়বে। 

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের সরকার। বিএনপি নির্বাচনের আগে যেসব অঙ্গীকার করেছে, আগামী বাজেটে তার বেশির ভাগই থাকবে। অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন আগামী বাজেট থেকে শুরু করা হবে। পরে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ বাস্তবায়নে যাবে। 

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, দেশের অর্থনীতি এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে সংকটে আছে। বিগত দুই সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছি। এমন পরিস্থিতিতেও বড় অঙ্কের বাজেট দেওয়া হবে। এই বাজেট বাস্তবায়নে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে আয়ের খাত বাড়ানো হয়েছে। 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বড় অঙ্কের বাজেটে অর্থায়ন করতে হলে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। কিন্তু আমরা জানি চলতি অর্থবছরের গত ১১ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রেকর্ড রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। আগামীতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে তা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছি। এতে অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে।’ 

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেছেন, দেশের অর্থনীতি সংকটে ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনীতির সংকট বেড়েছে। সরকার ও ব্যক্তি খাত–দুই খাতই ভালো নেই। এমন পরিস্থিতিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন, উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে। তবে সরকার যত সংকটেই থাকুক না কেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ দিতে হবে। নির্বাচনের আগে বিএনপি যেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা বলেছে, তার বেশির ভাগ আগামী বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও সব বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। আগামী অর্থবছরে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো প্রতিশ্রুতি পাইলট প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। 

আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার, কোন খাতে কত ব্যয় ধরা হবে, কোন খাত থেকে কত আয় করা হবে, এনবিআর ও এনবিআরবহির্ভূত খাত থেকে আয় নির্ধারণসহ বাজেটের বিভিন্ন হিসাব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কয়েক দফা বৈঠক করেন। অনেক বিষয় নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকেও আলোচনা হয়। এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানসহ বাজেট প্রস্তুত কমিটির কর্মকর্তাদের সঙ্গেও পৃথকভাবে প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করেন। সবার মত নিয়ে যাচাই-বাছাই করে প্রস্তাবিত বাজেটের সারসংক্ষেপ প্রণয়ন করা হয়েছে। 

আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের পর ৩০ জুন পর্যন্ত আলোচনা হবে। এরপর তা চূড়ান্ত করে ১ জুলাই থেকে বাস্তবায়ন করা হবে। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি। আসন্ন অর্থবছরের বাজেট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে চলতি বাজেটের তুলনায় ১৮.৭৩ শতাংশ বেশি, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড বৃদ্ধি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে মোট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা ভাবা হচ্ছে, যা আগের বছরের তুলনায় অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি। উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর হিসাব পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বাজেটে সরকারের পরিচালন ও অন্যান্য ব্যয় ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের এনবিআর থেকে ৬ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা, নন-এনবিআর ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং এনটিআর খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা ধার্য করা হয়েছে। অর্থায়নের ক্ষেত্রে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে ১৫ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। 

প্রতিষ্ঠিত সন্তানের বাবা-মায়ের শেষ ঠিকানা কেন বৃদ্ধাশ্রম?

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৮:৪৯ এএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:০৭ এএম
প্রতিষ্ঠিত সন্তানের বাবা-মায়ের শেষ ঠিকানা কেন বৃদ্ধাশ্রম?
ছবি: খবরের কাগজ

মিরপুরের ৭৫ বছর বয়সী নূরজান বেগম। মৃত্যুর পর কয়েক দিন তার মরদেহ পড়ে ছিল ঘরের ভেতর। কয়েক দিন পর একই এলাকায় ৫৫ বছর বয়সী আফরোজা নামের আরেক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের সন্তানরা কেউ রাষ্ট্রের উচ্চপদে কর্মরত, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত জীবন গড়েছেন।

অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমানও দীর্ঘদিন উত্তরার নিজ ফ্ল্যাটে একা থাকতেন। স্ত্রী ও একমাত্র মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতেন। শিক্ষক, গবেষক ও বিশ্লেষক হিসেবে তিনি ছিলেন দেশের পরিচিত মুখ। অথচ জীবনের শেষ মুহূর্তে তিনিও ছিলেন নিঃসঙ্গ। এই ঘটনাগুলো শুধু কয়েকজন মানুষের মৃত্যুর গল্প নয়। এগুলো এমন এক সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে, জীবনযাত্রার মান বাড়ছে, কিন্তু পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। 

দ্রুত বাড়ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৪ লাখেরও বেশি, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬.১৪ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক দশকে এই সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়বে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সাড়ে তিন থেকে চার কোটির বেশি হবে। তখন দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ থেকে ২২ শতাংশই হবেন প্রবীণ।

অর্থাৎ আগামী বাংলাদেশ হবে অনেক বেশি বয়স্ক মানুষের বাংলাদেশ। কিন্তু সেই মানুষের জন্য কি দেশ প্রস্তুত?

সাবেক উপদেষ্টা ও সমাজকর্মী ফরিদা আখতার মনে করেন, আলোচনায় আসা ঘটনাগুলো কেবল দৃশ্যমান অংশ। তিনি বলেন, ‘মিরপুরের ঘটনাটি সামনে এসেছে, তাই আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু সারা দেশে এমন অনেক ঘটনা ঘটছে, যা আমাদের সামনে আসে না। অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা একাকিত্বে জীবন কাটাচ্ছেন। কেউ তাদের খোঁজ রাখছেন না।’

তার মতে, যৌথ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, পরিবার ছোট হচ্ছে, ছেলেমেয়েরা বিয়ের পর আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ফলে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে। ‘বাবা-মা সন্তানকে আদর-যত্ন করে বড় করলেন, লেখাপড়া শিখিয়ে প্রতিষ্ঠিত করলেন। অথচ সেই সন্তান যদি বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের খোঁজ না রাখে, সেটি শুধু অমানবিক নয়, সামাজিক অন্যায়ও’ বলেন তিনি।

তার মতে, যেসব সন্তান সচেতনভাবে বাবা-মায়ের দায়িত্ব এড়িয়ে যান, তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও আইনগত জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিষয়টিকে শুধু সামাজিক অবক্ষয় বলে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। একদিকে রয়েছে বিশ্বায়ন, কর্মসংস্থানের জন্য দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়া, নগরজীবনের ব্যস্ততা, ছোট পরিবার ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন। অন্যদিকে রয়েছে দায়িত্ববোধের ঘাটতি, সম্পর্কের দূরত্ব এবং প্রবীণদের মানসিক চাহিদাকে অবহেলা করার প্রবণতা।

বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই বাবা-মায়ের জন্য অর্থ পাঠান, চিকিৎসার খরচ বহন করেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃদ্ধ বয়সে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কেবল অর্থ নয়, সঙ্গ-কথা বলার মানুষ এবং মানসিক নিরাপত্তা।

ঢাকার একাধিক বৃদ্ধাশ্রমের দায়িত্বশীলরা জানান, সেখানে বসবাসকারী অনেক প্রবীণের সন্তান দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু নিয়মিত যোগাযোগ করেন না। কেউ কেউ মাসের পর মাস বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতেও আসেন না।

বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রমকে এখনো অনেকেই নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন। কিন্তু বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আনজুমান আরা মনে করেন, আধুনিক সমাজে বৃদ্ধাশ্রমের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘জাপান, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশে ওল্ড হোম বা বৃদ্ধাশ্রম খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যবস্থা। আমাদের দেশেও এখন অনেক আধুনিক বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠছে। সেখানে সাবেক সচিব, শিক্ষক, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ থাকছেন।’

তার মতে, সন্তানরা কর্মজীবন বা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতেই পারেন, সেটি অপরাধ নয়। তবে বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, ‘যাদের সামর্থ্য আছে, তারা চাকরিজীবনের শুরু থেকেই ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করতে পারেন। পেনশন বা আয়ের একটি অংশ প্রবীণ বয়সের নিরাপদ আবাসনের জন্য সঞ্চয় করা যেতে পারে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। একাকিত্ব হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, স্মৃতিভ্রংশ এবং অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

প্রবীণদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগ, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানো এবং কমিউনিটি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ প্রবীণদের সুস্থ জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ রয়েছে। এই আইনে বলা হয়েছে, সক্ষম সন্তানদের বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতে হবে। দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে শাস্তির বিধানও রয়েছে।

তবে বাস্তবে খুব কম মানুষই আইনের আশ্রয় নেন। কারণ অধিকাংশ বাবা-মা সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা করতে চান না। তারা শাস্তি নয়, সন্তানের ভালোবাসা ও উপস্থিতি চান।

বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে। মাথাপিছু আয় বাড়ছে, শিক্ষার হার বাড়ছে, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম। কিন্তু একই সঙ্গে একটি প্রশ্নও সামনে আসছে, আমরা কি সম্পর্কের বিনিময়ে উন্নয়ন কিনছি?

যে মা রাত জেগে সন্তানের জ্বর দেখেছেন, যে বাবা নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়েছেন, তাদের জীবনের শেষ সময় কি একটি নীরব ফ্ল্যাটে একা কাটার কথা?

কর্মজীবনের ব্যস্ততা, বিদেশে বসবাস কিংবা ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাবা-মায়ের নিরাপত্তা ও সঙ্গ নিশ্চিত করার দায়িত্ব থেকে সন্তানরা মুক্ত নন। মৃত্যুর পর কয়েক দিন ধরে বন্ধ ঘরে পড়ে থাকা কোনো বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার মরদেহ শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের সমাজ, মূল্যবোধ ও মানবিকতার জন্যও এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন।

যে বাবা-মা এক দিন সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন, তাদের জীবনের শেষ আলোটুকু যেন নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে নিভে না যায়। সন্তানের কাছেই হোক তাদের শেষ আশ্রয়। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে অন্তত এমন নিরাপদ ও মানবিক ব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যেখানে কোনো মা-বাবাকে আর একা, নিভৃতে, অযত্নে মৃত্যুবরণ করতে না হয়। কারণ একটি সভ্য সমাজের প্রকৃত পরিচয় তার আকাশচুম্বী ভবনে নয়, বরং সে তার প্রবীণ মানুষকে কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা দিতে পারে সেখানেই।

আনোয়ারা: দল বদলায়, রক্ষাকবচে অত্যাচার থামে না

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৮:৩৯ এএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:০২ এএম
আনোয়ারা: দল বদলায়, রক্ষাকবচে অত্যাচার থামে না
চট্টগ্রামের আনোয়ারার উপকূলীয় গহিরা প্যারাবন কেটে প্রথমে মাঠ বানানো হয় (বায়ে)। পরে মাটি কেটে মাছের ঘের তৈরি করা হয়। ছবি: খবরের কাগজ

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল। জলোচ্ছ্বাস আর ঘূর্ণিঝড় কেড়ে নিয়েছিল লাখো প্রাণ। লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূলের গহিরা, রায়পুরসহ বিস্তীর্ণ জনপদ। সেই মহাবিপর্যয়ের পর উপকূলবাসীকে রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বন বিভাগের পক্ষ থেকে ‘সবুজ দেওয়াল’ গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রায় ২৫০ একর এলাকাজুড়ে রোপণ করা হয় কেওড়া, গেওয়া, বাইনসহ বিভিন্ন প্রজাতির লাখো গাছ। তিন দশকে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা সেই গহিরা প্যারাবনই এখন আনোয়ারা উপকূলের রক্ষাকবচ। অথচ এই বনকেই ধীরে ধীরে সাবাড় করা হচ্ছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ আমলে এই বনের গাছ কাটা হয়েছে। বর্তমানে কাটা হচ্ছে মাটি। দল বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল হয়, অথচ বনের ওপর অত্যাচার থামে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজনদের থাবায় বনের প্রায় ১৫ একর এলাকার গাছ কেটে সাবাড় করা হয়। আর বর্তমানে স্থানীয় বিএনপির নামধারী একশ্রেণির প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রকাশ্যে ভেকু মেশিন (মাটি কাটার যন্ত্র) বসিয়ে বনের মাটি কেটে বিক্রি করছে। ফলে উপকূলের রক্ষাকবচ এই প্যারাবন এখন নিজেই নিঃশেষের পথে। 

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গহিরা প্যারাবনের ওপর নির্যাতনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে তৎকালীন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আমিন শরীফের সরাসরি আশ্রয়ে জকু মাঝি নামের এক ব্যক্তি বনের ভেতরে তাণ্ডব চালান। সাগরের গুরুত্বপূর্ণ মোহনায় ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা বনের ভেতরের গাছ কেটে, চারপাশে মাটির বাঁধ দিয়ে পানি আটকে বিশাল ঘের তৈরি করেন।
সরেজমিনে গহিরা উপকূলে গিয়ে দেখা যায়, ওই মাছের ঘেরগুলোর ভেতরে এখনো কেটে ফেলা শত শত কেওড়া ও বাইন গাছের গোড়া (অবশিষ্টাংশ) পানির ওপর জেগে আছে। প্রায় ১৫ একর বনভূমির সবুজবেষ্টনী সম্পূর্ণ উজাড় করা হয়েছে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাদের অনুসারীরা একজোট হয়ে এই সংরক্ষিত প্যারাবনের মাটি কেটে বিক্রি করছেন। বনের ভেতর ও সংলগ্ন এলাকার মাটি কেটে নেওয়ার কারণে সেখানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে।
গহিরা এলাকার সত্তরোর্ধ্ব বাসিন্দা ইদ্রিস আলী বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয়ে এসে বনের গাছ কাটল, মাছের ঘের বানাইল। ভাবছিলাম সরকার বদলালে বনটা বাঁচবে। এখন দেখি বিএনপির নাম দিয়ে আরেক দল এসে দিন-রাত মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। বনটা শেষ হয়ে গেলে সাগরের পানি আমাদের ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নেবে।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে আনোয়ারার গহিরা এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অধীনে একটি উপকূলীয় বেড়িবাঁধের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এই কাজের ঠিকাদার ‘মেসার্স শেখ এমদাদুল হক মামুন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। জানা গেছে, এই ঠিকাদারের কাছ থেকে স্থানীয় বিএনপি নেতা সাহেদ, আব্দুল মজিদসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সাব-কন্ট্রাক্ট (উপ-ঠিকাদার) হিসেবে কাজ নিয়েছেন।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য দূরবর্তী কোনো স্থান বা ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গা থেকে মাটি কিনে বাঁধে দেওয়ার কথা। অথচ খরচ বাঁচিয়ে শতভাগ লাভ তুলে নিতে উপ-ঠিকাদার সংরক্ষিত প্যারাবনকে বেছে নিয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বনের ভেতরে বিশাল আকৃতির ভেকু দিয়ে দিন-রাত মাটি কাটা হচ্ছে। ডাম্প ট্রাকে করে সেই মাটি বেড়িবাঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মাটি কাটার ফলে বনের ভেতরের জোয়ার-ভাটার প্রাকৃতিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক গাছের শিকড় উপড়ে গেছে।
বনের বর্তমান অবস্থা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা নূরনাহার বেগম (৪৫) বলেন, ‘চোখের সামনে বনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমরা বাধা দিলে মামলা-হামলার ভয় দেখানো হয়।’

অভিযোগের বিষয়ে উপ-ঠিকাদার ও মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত স্থানীয় বিএনপি নেতা সাহেদ (উপজেলা বিএনপির আহ্বায়কের ছেলে) মোবাইলফোনে বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমি জড়িত নই। দায়িত্বপ্রাপ্ত মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই বনের মাটি কেটে বেড়িবাঁধে দিচ্ছে। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলুন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আমাদের জড়িয়ে এসব ছড়ানো হচ্ছে।’
তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শেখ এমদাদুল হকের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তার মোবাইলফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এসএমএস পাঠিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িতরা বর্তমানে পলাতক থাকায় তাদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ‘ম্যানগ্রোভ বা প্যারাবন উপকূলীয় এলাকার জন্য প্রাকৃতিক সুরক্ষাপ্রাচীর। এই বন শুধু সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের গতি কমায় না, বরং মাটিকে ধরে রাখে।’
তিনি বলেন, ‘বিগত সময়ে মাছ চাষের নামে এখানে যে গাছ কাটা হয়েছে, তা পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি। আর এখন বনের ভেতর থেকে মাটি কেটে নিয়ে পুরো এলাকাকে যদি খালে রূপান্তর করা হয়, তবে সমুদ্রের জোয়ার ও ঢেউয়ের আঘাতে অবশিষ্ট বনও ধসে পড়বে। ফলে পুরো উপকূলীয় অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী ঝুঁকিতে পড়বে।’

সংরক্ষিত বনাঞ্চল কেটে বেড়িবাঁধের কাজ চললেও এর দায় নিতে নারাজ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। সংস্থাটির নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে শহীদ বলেন, ‘আমরা মূল প্রকল্পের নকশা এবং কাজের গুণগত মান তদারকি করি। ঠিকাদার কোথা থেকে মাটি আনছেন, সেই বিষয়টি আমাদের সব সময় লিখিতভাবে জানানো হয় না। তবে স্থানীয়দের কিছু আপত্তির কথা আমরা শুনেছি। ঠিকাদারকে নির্দেশ দিয়েছি, যাতে তারা সংরক্ষিত বন বা উপকূলীয় এলাকা থেকে মাটি না কেটে দূরবর্তী স্থান থেকে এনে সরবরাহ করেন।’ 

বাঁশখালী রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার খায়রুল আলম বলেন, ‘আমি এই রেঞ্জে নতুন এসেছি। মাটি কাটার বিষয়টি লোকমুখে শুনে একবার পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। বিষয়টির বিস্তারিত আমার জানা নেই। নথিপত্র দেখে বলতে হবে, ওটা বন বিভাগের গেজেটভুক্ত জায়গা কি না।’

চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এম এ হাসান বলেন, ‘বিষয়টি আমার বিস্তারিত জানা নেই। আমি দ্রুত তদন্ত টিম পাঠাচ্ছি। বিন্দুমাত্র প্রমাণ মিললে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনানুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’