বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুনতাসির আল জেমি গত বছরের ৬ আগস্ট কারাগারের দেয়াল ভেঙে পালিয়েছেন। অথচ বিষয়টি জনসমক্ষে আসে গত সোমবার রাতে। ফলে অত্যন্ত স্পর্শকাতর এ বিষয়টি প্রায় সাত মাস গোপন কেন থাকল জনমনে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
জেমির কারাগারের কনডেম সেল থেকে পলায়নের ঘটনায় সোমবার রাতেই উত্তাল হয় বুয়েট ক্যাম্পাস। তার গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা জানান, ফাঁসির আসামি পালিয়েছে, এই খবর প্রকাশ করা হয়নি। এতে বোঝা যায়, এখানে পুলিশের গাফিলতি রয়েছে। খুনি জেমিকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানাই। যারা জেমিকে কারাগার থেকে পালাতে সহযোগিতা করেছে তাদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি তোলেন শিক্ষার্থীরা।
সোমবার রাতেই শিক্ষার্থীরা বুয়েটের শহিদ মিনার থেকে মিছিল বের করেন। মিছিলটি পলাশীর মোড়, ভিসি চত্বর হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এক সমাবেশে মিলিত হয়। পরে সেখানে সংবাদ সম্মেলন করেন বুয়েট শিক্ষার্থীরা।
আবরারের ভাই ফাইয়াজ খবরের কাগজকে বলেন, আমার ভাই কবরে শুয়ে আছে, আর খুনিরা মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নেবে এটা হতে পারে না। তিনি আবরার হত্যায় জেমিসহ পলাতক অন্য আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দাবি জানান।
তবে কারা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘যেহেতু এটি একটি আলোচিত ঘটনা ও আসামি যেহেতু পালিয়েছে তাই এ বিষয়টি এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে আরও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও কিন্তু ওখান থেকে পালিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘কারাগার থেকে আসামি পালানোর পর আমরা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। যে ৫টি কারাগারে আসামি পালানোর ঘটনা ঘটেছিল, সেখানে ছাত্র-জনতা, পুলিশ বা দুষ্কৃতকারী যেভাবেই বলি না কেন অভ্যুত্থানের কারণেই এই বন্দিরা পালিয়ে যেতে পেরেছেন। এ বিষয়ে মামলাও হয়েছে।’
আবরার ফাহাদের ভাই আবরার ফাইয়াজ (বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী) এ বিষয়ে খবরের কাগজকে জানান, হাইকোর্টে ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে আবরার হত্যা মামলার আপিলের শুনানি চলছিল, সেখানে গত সোমবার শেষ শুনানি ছিল। সেখানে আসামি পক্ষের ২০ জনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়। জেমির আইনজীবী আদালতে উপস্থিত না থাকায় সন্দেহের সৃষ্টি হয়। তখন বিচারকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে, রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বলা হয়, তিনি ৫ আগস্টের পর পালিয়েছেন।
আদালতের ওই ঘটনা থেকেই আবরার হত্যার আসামি পালানোর বিষয়টি সামনে আসে এবং সারা দেশে এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল মঙ্গলবার কারা কর্তৃপক্ষ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আসামি পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রকাশ করে।
কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আবরার হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত বন্দির কারাগার থেকে পলায়ন সংক্রান্ত সংবাদের প্রতি কারা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে। জনমনে বিভ্রান্তি নিরসনের লক্ষ্যে কারা কর্তৃপক্ষ এই মর্মে সবার অবগতির জন্য জানাচ্ছে যে, সংশ্লিষ্ট মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত বন্দি কয়েদি মুনতাসির আল জেমি গত ৬ আগস্ট গাজীপুরের হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ২০২ জন বন্দির সঙ্গে একত্রে (৮৭ জন মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত বন্দিসহ) কারাগারের দেয়াল ভেঙে পলায়ন করেন। বিষয়টি নিয়ে ১৫ আগস্ট কোনাবাড়ী থানায় একটি মামলা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একই সঙ্গে সব কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়।
কারা কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, সব কর্তৃপক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ইতোমধ্যে ৩৫ জন মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত বন্দিসহ ৫১ জন বন্দিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক সংশ্লিষ্ট বন্দিকে গ্রেপ্তারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
পলাতক জেমি বুয়েটের মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। তবে পালানোর ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো গ্রেপ্তার হননি জেমি। জেমির আইনজীবী আদালতে অনুপস্থিত থাকলে সন্দেহের সৃষ্টি হয় এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে তথ্যটি প্রকাশ্যে আসে।
অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক জানান, ২ হাজার ৩০০ জনের মতো বন্দি বিভিন্ন সময়ে পালিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মধ্যে ১ হাজার ৪৪৭ জনকে আমরা গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। যা প্রায় এক তৃতীয়াংশ। ৮০০ জনের মতো বন্দিকে এখনো ধরা যায়নি। তাদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিটি মিটিংয়ে এই বন্দিদের ধরার অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করি। কতজনকে ধরা হয়েছে, কতজনকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি, তাদের ধরতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বা কীভাবে ধরা সম্ভব, কাজের অগ্রগতি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। আমরা বাড়িতে বসে নেই, পলাতকদের ধরতে চেষ্টা অব্যাহত আছে। অপরাধ করে কেউ পার পাবে না।
উল্লেখ্য, আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় বিভিন্ন দণ্ডে দণ্ডিত ২২ জন বন্দির মধ্যে বর্তমানে ২১ জন বন্দি কারাগারে রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর বুয়েটের শেরেবাংলা হলে আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডে একদল ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীর নাম উঠে আসে। ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক আবু জাফর কামরুজ্জামান এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
গেল বছরের আগস্টে মোট ২০৯ জন বন্দি পালানোর ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষ গাজীপুরের কোনাবাড়ি থানায় একটি মামলা করে। সেই মামলায় নাম উল্লেখ থাকা আসামিদের একজন জেমি। এর আগে গত ৬ আগস্ট কারাগার থেকে জেমি পালিয়ে যান বলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. জসিম সরকার গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।