গত সপ্তাহে নতুন ছাত্রসংগঠন ও রাজনৈতিক দল গঠনের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির (জানাক) কার্যক্রম কী হবে তা নিয়ে সবখানে আলোচনা চলছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে নাগরিক কমিটির কার্যক্রম নির্ধারণ হতে পারে। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং পলিসি নির্ধারণের জায়গায় কাজ করতে ইচ্ছুক রাজনৈতিক দলে যুক্ত হননি, কেবল তারাই এই প্ল্যাটফর্মের দায়িত্বে থাকবেন। অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন অভ্যুত্থানের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে থাকবে। নেতৃত্বে আসতে পারেন সংগঠনটির মুখপাত্র উমামা ফাতেমা। দুই প্ল্যাটফর্মের সংশ্লিষ্ট একাধিক সক্রিয় সদস্যের সঙ্গে কথা বলে এসব জানা গেছে।
বৈষম্যবিরোধী ছা্ত্র আন্দোলনের ব্যানারে সংঘটিত অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তী সময়ে ৮ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার থেকে ‘রাষ্ট্র পুনর্গঠন’, ‘ফ্যাসিবাদীব্যবস্থার বিলোপ’ ও ‘নতুন বাংলাদেশের’ রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নির্ধারণের জন্য যাত্রা শুরু করে জাতীয় নাগরিক কমিটি। এই প্ল্যাটফর্ম থেকেই ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়করা জুলাই স্পিরিট নিয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি গঠন করে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ। গণ-অভ্যুত্থানে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালনকারীদের নেতৃত্বেই দুই দিনের ব্যবধানে আত্মপ্রকাশ করে এই দুই সংগঠন।
অভ্যুত্থানের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়। সে সময় এই প্ল্যাটফর্ম সর্বজনগ্রাহ্য নিরপেক্ষ একটি মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত হয়। আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা নিজ নিজ পতাকাতলে ফিরে যাওয়ার পর অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ ও বিকাশের কথা বলে আত্মপ্রকাশ করে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ। নবপ্রতিষ্ঠিত সংগঠনের নেতারা ঘোষণা করেন, এই ছাত্রসংগঠন কোনো দলের লেজুড়বৃত্তি করবে না। এই প্ল্যাটফর্ম থেকে হওয়া ছাত্রসংগঠনটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পান সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার।
অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক কমিটি অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ ও বিকাশের জন্য নতুন দল গঠনের জন্য দেশব্যাপী কাজ শুরু করে। একই সঙ্গে প্রেশার গ্রুপ হিসেবেও ভূমিকা রাখে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত নতুন দল এনসিপিতে জাতীয় নাগরিক কমিটির শীর্ষ পদের অধিকাংশই যোগ দেন। এই কমিটির সর্বশেষ সভায় যারা নতুন দলে যুক্ত হবেন তাদের পদ বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর যারা যোগ দেবেন না, তাদের সদস্যপদ বহাল থাকবে বলে জানানো হয়। তবে কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সদস্যসচিব আখতার হোসেন, মুখপাত্র সামান্তা শারমিন ও মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের দায়িত্ব পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারণ পর্যন্ত বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এই চারজন নতুন গঠিত রাজনৈতিক দলে (এনসিপি) গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল আমিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘নাগরিক কমিটির মূল দায়িত্বের চারজনকে ১৫ দিনের মধ্যে কমিটির পরবর্তী কার্যক্রমের রূপরেখা নির্ধারণের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। যারা বিভিন্ন পলিসি নির্ধারণে ভূমিকা রাখার জন্য প্রেশার গ্রুপ হিসেবে সক্রিয় থাকবে। একই সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করবে। যারা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনে যোগ দিতে অনিচ্ছুক, তারাই এই প্ল্যাটফর্মে থাকবে।’
জাতীয় নাগরিক কমিটিতে কারা দায়িত্বে পেতে পারেন এই নিয়ে আলোচনা চলছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই প্ল্যাটফর্মের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকছে। কারণ অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী অনেক নিরপেক্ষ ব্যক্তিদেরও এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সংগঠিত করা হয়েছে। নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন নাহার হলের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি, হাসান ইমতিয়াজ নাদভী, সাংবাদিক সাবিত আল হাসান, আজহার উদ্দীন অনিক, আরিফুর রহমান এই প্ল্যাটফর্মের মূল দায়িত্বে আসতে পারেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নাগরিক কমিটি সিভিল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। যারা বিভিন্ন বিষয়ে মতামত প্রদান করবে। এখানে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরাও যুক্ত থাকবেন।
অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ এনসিপির মুখ্য সংগঠকের (দক্ষিণাঞ্চল) দায়িত্ব পেয়েছেন। ফলে এই পদটি এখন শূন্য। সাবেক সমন্বয়কদের অনেকেই নতুন ছাত্রসংগঠন গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদে যোগ দিয়েছেন। আর মুখপাত্র উমামা ফাতেমা রাজনৈতিক দল কিংবা ছাত্রসংগঠনে যোগ দেননি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর অনুযায়ী উমামা ফাতেমা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল দায়িত্ব পেতে পারেন। দায়িত্বের বিষয়ে খবরের কাগজকে নিশ্চিত করে কোনো কিছু জানাতে অপরাগতা প্রকাশ করেন তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে উমামা বলেন, যেহেতু এই প্ল্যাটফর্ম থেকে অনেকেই রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনে যোগ দিয়েছেন, তাই তাদের এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই। দায়িত্ব বিষয়ে নিশ্চিত বলতে পারব না। তবে আমাদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চলছে। কারণ এই প্ল্যাটফর্মের গুরুত্ব অনেক। অভ্যুত্থানে আহত, নিহতদের ডকুমেন্টেশেন এখনো চূড়ান্তভাবে হয়নি। আহতদের পুনর্বাসন চিকিৎসারও একই অবস্থা। তাই অভ্যুত্থানের মর্যাদা রক্ষায় এই প্ল্যাটফর্ম থাকবে প্রেশার গ্রুপ হিসেবে।
উমামা আরও বলেন, ‘এনসিপি ও ছাত্রসংগঠনে যোগ দেওয়ার পর নির্বাহী কমিটিতে যারা আছেন, তারাই এই প্ল্যাটফর্মে থেকে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই যোগ দেননি। তাদের সঙ্গে মধ্যে আলাপ-আলোচনার পর আমরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
দল ও প্ল্যাটফর্মের অফিস আলাদা হচ্ছে
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হয় বাংলামোটরে রূপায়ণ টাওয়ারে। নতুন দল ও ছাত্রসংগঠনের জন্য আলাদা কার্যালয় খোঁজা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এনসিপির অফিস রাজধানীর সেগুনবাগিচা, ফার্মগেট, শাহবাগ এবং গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের অফিস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে খোঁজা হচ্ছে বলে সংগঠন দুটির একাধিক নেতা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন। তবে এখনো চূড়ান্ত হয়নি।