রমজান মাসের চতুর্থ দিন ছিল বুধবার (৫ মার্চ)। বিকেল ৪টায় গ্যাসের চুলা ধরান রাজধানীর কলাবাগানের ডলফিন গলির বাসিন্দা গৃহিণী আলেয়া বেগম। তিনি চুলায় কড়াই বসান, ঢেলে দেন তেল। মোটামুটি গরম হলে আগে থেকে তৈরি থাকা পেঁয়াজুর ডো এক এক করে ছাড়তে থাকেন তেলে। কিন্তু ফুলে মচমচে হওয়ার আগেই কমে যায় গ্যাসের চাপ। আর ভাজা হয়নি পেঁয়াজু-বেগুনিসহ অন্যান্য ইফতারি। সময় ঘনিয়ে আসায় বাধ্য হয়ে দোকান থেকে কিনে আনেন ইফতারি।
আলেয়ার মতো গ্যাসসংকটের কারণে বিপাকে পড়েছেন রাজধানীর আরও অনেক এলাকার বাসিন্দা। ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, উত্তরা,যাত্রাবাড়ীসহ রাজধানীর অধিকাংশ এলাকার মানুষ গ্যাসের অভাবে রান্নার চুলা জ্বালাতে পারছেন না। তাদের ভরসা সিলিন্ডার, ইনডাকশন, কেরোসিন কিংবা মাটির চুলা। এতে একদিকে জ্বালানির খরচ যেমন বেড়েছে, তেমনি গ্যাস না পেলেও গুনতে হচ্ছে বিল। বাসিন্দারা জানান, অধিকাংশ সময় ভুগতে হলেও, রোজা এলে ভোগান্তি বাড়ে কয়েকগুণ। গ্যাস কখন আসবে তা নিয়ে থাকতে হয় অনিশ্চয়তায়।
ওইসব এলাকায় দুপুরের পর থেকে গ্যাসের চাপ একেবারে কমে যায়। রাত ১০টার দিকে কিছুটা এলেও গ্যাসের চাপ সেভাবে থাকে না। ফলে রান্নাবান্না করা যায় না। ভোর রাতের দিকে গ্যাসের চাপ ভালো থাকে। সকাল ৯টার পর আবারও তৈরি হয় সংকট।
গ্যাস কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানা গেছে, নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে শীতকালীন সময়ে গ্যাস সরবরাহ মোটামুটি ঠিক থাকে। মার্চের দিকে গরম শুরু হয়। এর ফলে গ্যাস আবাসিক থেকে কমিয়ে গতি বাড়াতে হয় বিদ্যুৎকেন্দ্রে। এতেই ঘটেছে বিপত্তি। রমজানে রান্নাঘরে গৃহিণীদের ব্যস্ততা থাকলেও গ্যাসসংকট থাকায় দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরেও রান্না হচ্ছে না।
শুধু আবাসিকেই নয়, রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতেও রয়েছে গ্যাসসংকট। ফিলিং স্টেশনগুলো বন্ধ রাখার সময় বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। জ্বালানি বিভাগের নির্দেশে বলা হয়েছে, রমজান মাসে প্রতিদিন বেলা আড়াইটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত ঢাকা মহানগরের সব সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখতে হবে। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রয়োজনের চেয়ে সরবরাহ কম থাকায় দেখা দিয়েছে সংকট। ঢাকায় গ্যাস সরবরাহ করে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্যাস না পাওয়ায় ফোন আসছে তিতাসের অভিযোগ কেন্দ্রে।
সংশ্লিস্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে একসময় দিনে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হতো। ২০১৮ সালের পর থেকে উৎপাদন কমতে থাকে। ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানির দিকে ঝুঁকে যায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোয় তেমন জোর দেওয়া হয়নি। ফলে উৎপাদন কমে এখন ১৯৩ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। গত বছরও এটি ২০০ থেকে ২১০ কোটি ঘনফুট ছিল।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্রে জানা গেছে, দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। ৩০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ পেলে মোটামুটি চাহিদা মেটানো যায়। এখন সরবরাহ হচ্ছে ২৬০ থেকে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। বিগত বছরে একই সময়ে গ্যাসের সরবরাহ প্রায় একই পরিমাণ ছিল। তবে এবার বিদ্যুৎকেন্দ্রে গত বছরের চেয়ে বাড়তি সরবরাহ করা হবে।
পেট্রোবাংলার কাছ থেকে বরাদ্দ বুঝে নিয়ে গ্রাহকের কাছে গ্যাস সরবরাহ করে ছয়টি গ্যাস বিতরণ সংস্থা। এর মধ্যে তিতাস সূত্রে জানা গেছে, রমজান ও গ্রীষ্ম মৌসুম সামনে রেখে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। রমজান মাসে দিনে গ্যাসের সরবরাহ বাড়তে পারে ২০ থেকে ২৫ কোটি ঘনফুট। এর পুরোটাই চলে যায় বিদ্যুৎ খাতে। শিল্পেরও চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়লে শিল্প আরও চাপে পড়বে। তাই আবাসিকে পরিস্থিতি উন্নতির তেমন সুযোগ নেই। তবে, আগে এসব সংকটের কথা অনুমান করা গেলেও কোনো প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। অথবা সমাধানের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গ্রাহকরা।
তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘পেট্রোবাংলা থেকে আমাদের গ্যাসের বরাদ্দ কমে গেছে। যার ফলে বিভিন্ন স্থানে সাপ্লাইও কমে গেছে। আমরা কিছু আবাসিক এলাকায় গ্যাস কমিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাড়িয়েছি। আর গ্যাসের সাপ্লাই বাড়লে এ সমস্যাগুলো হবে না। এর আগে কোনোভাবেই পরিপূর্ণ সমাধান হবে না।’
কিছু অবৈধ সংযোগের কথা ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ‘কিছু এলাকায় গ্যাসের ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়। আর আমরা গ্যাস বাড়ালে তা আবাসিক এলাকায় দেওয়ার আগেই হোটেল-রেস্টুরেন্ট ও ফিলিং স্টেশন নিয়ে যায়। আসলে আমাদের বরাদ্দ ও সাপ্লাই বাড়লে সংকট কাটানো সম্ভব।’
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ‘বালাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কারে চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে আয়োজিত সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর তেজগাঁওয়ে। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশ (আইবিএফবি) ও পাক্ষিক পত্রিকা এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার আয়োজিত ওই সেমিনারে বলা হয়, দাম দিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার পর চুরি ও অপচয় হচ্ছে। প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ১২ ডলার ধরলে বছরে ১০০ কোটি ডলার (১২ হাজার কোটি টাকা) ক্ষতি হচ্ছে।
বিগত তিন বছর (২০২০-২০২২) গ্যাস খাতে গড়ে কারিগরি ক্ষতি (সিস্টেম লস) হয়েছে ৯ দশমিক ৮২ শতাংশ। গ্যাস সরবরাহে অপচয়ের পাশাপাশি চুরিও হয়। শিল্পও চুরির গ্যাস ব্যবহার করে। তবে সবচেয়ে বেশি চুরি হয় আবাসিক খাতে। ৫ শতাংশ চুরি কমিয়ে শিল্পে সরবরাহ করা হলে চলমান গ্যাসসংকট কেটে যায়। গ্যাসের চুরি রোধে অন্তর্বর্তী সরকার নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেবে।