ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসংলগ্ন আশকোনার হজ ক্যাম্পে আবার প্রাণচঞ্চলতা ফিরেছে। বছর ঘুরে আবার সরব হজক্যাম্প। প্রতিবছর হজে যাওয়ার আগে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের হজযাত্রীরা এই ক্যাম্পে ওঠেন। তাই নির্দিষ্ট সময়ে ফ্লাইট ধরতে কয়েক দিন আগেই ক্যাম্পে আসতে শুরু করেছেন দূর-দূরান্তের হজযাত্রীরা। আগামীকাল ২৯ এপ্রিল শুরু হচ্ছে হজের প্রথম ফ্লাইট। এর আগে সোমবার (২৮ এপ্রিল) হজক্যাম্পে এ বছরের হজ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হবে।
নিয়ম অনুযায়ী ফ্লাইটের অন্তত ৬ ঘণ্টা আগে ক্যাম্পে উপস্থিত হতে হচ্ছে হজযাত্রীদের। তবে যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকেন তারা ফ্লাইট নিশ্চিত করতে কয়েক দিন আগে থেকেই ক্যাম্পে আসতে শুরু করেন। এরই অংশ হিসেবে গতকাল থেকেই হজক্যাম্প মুখর হতে শুরু করেছে হজযাত্রীদের পদচারণে।
গতকাল রবিবার দুপুর ১২টা থেকে বিকেল পর্যন্ত ঢাকা হজক্যাম্প ঘুরে দেখা যায়, ফ্লাইটের দুই দিন বাকি থাকায় এবং ক্যাম্পের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু না হওয়ায় এখনো খুব একটা ভিড় নেই হজক্যাম্পে। তাই আগত হজযাত্রীদের কাউকেই ক্যাম্পের বাইরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। গত কয়েক বছরের মতো এবারও হজযাত্রী ছাড়া কাউকে হজক্যাম্পে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।
অন্যদিকে ক্যাম্পের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে রিপোর্ট করছেন। কেউবা আবার বাইরে যাচ্ছেন খাওয়া-দাওয়া করতে এবং শেষ সময়ের কেনাকাটা সারতে।
কুষ্টিয়া থেকে আসা নাজমা আক্তার স্বামীর সঙ্গে এবার হজ করতে যাচ্ছেন। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের ফ্লাইট আগামীকাল রাত ৯টা ৪০ মিনিটে। তাই আমরা দুদিন আগে চলে এলাম। ক্যাম্পের পরিবেশ কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানের পরিবেশ অনেকটা পরিচ্ছন্ন দেখছি। চারপাশ পরিচ্ছন্ন না থাকলে এখানে মশার উৎপাত বেশি থাকে।’ নারীদের থাকার জায়গা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পরিবেশ বেশ ভালো। আর খুব বেশি ভিড় নেই তাই ভালোই আছি।’
দিনাজপুর থেকে এসেছেন মো. মোসলেম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি ভোরেই পৌঁছেছি হজক্যাম্পে। আমার ফ্লাইট ৩০ এপ্রিল রাত ৯টা ৪০ মিনিটে।’ ক্যাম্পে কেমন আছেন জানতে চাইলে তিনি খবরের কাগজকে বললেন, ক্যাম্পের ডরমেটরিতে আমরা অনেকে একসঙ্গে থাকছি। খাবার জন্য ক্যাম্পের মধ্যে ক্যানটিন আছে। তবে আমি আজ অন্যদের সঙ্গে বাইরে খাব। সঙ্গে কিছু জিনিস কেনাকাটা করতে হবে।’ এখানে থাকা-খাওয়ার তেমন সমস্যা হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেকে একসঙ্গে থাকলেও বাথরুম ও গোসলখানার সংখ্যা অনেক এবং সেগুলো পরিচ্ছন্ন। তাই সেখানেও তেমন সমস্যা হচ্ছে না।
হজক্যাম্প ঘুরে দেখা যায়, হজযাত্রীদের সার্বিক সহযোগিতায় নিয়োজিত আছে অনেক স্কাউট সদস্য। ক্যাম্পের প্রবেশদ্বার থেকেই তাদের তৎপর উপস্থিতি দেখা যায়। গেটে আইডি কার্ড চেক করে ক্যাম্পে হজযাত্রীদের প্রবেশ করিয়ে কে কোনদিকে যাবেন তাও দেখিয়ে দিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবীরা।
এবারের হজ কার্যক্রম সম্পর্কে হজ অফিসের পরিচালক মো. লোকমান হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতি হওয়ায় এবার আমাদের ওপর মানুষের প্রত্যাশা বেশি। আমরা সেটা পূরণ করার চেষ্টা করছি। প্রতিবছর ক্যাম্পে হজযাত্রীরা মশার উপদ্রবে কষ্ট করেন। এবার যেন এমন না হয়, সেদিকে আমরা নজর দিচ্ছি। ওয়াশরুমগুলোর ব্যাপারেও আমরা তৎপর আছি। সেগুলো যেন পরিচ্ছন্ন থাকে সে জন্য আমরা নজর দিচ্ছি। পাশাপাশি আমাদের কিছু ইনোভেশন করেছি। যেমন- এবার একটি অ্যাপ চালু করেছি। এই অ্যাপের মাধ্যমে হজযাত্রীরা বেশ কিছু সুবিধা পাবেন। বিশেষ করে, হঠাৎ কোথাও অসুস্থ হয়ে গেলে তারা একটি ক্লিকেই তাদের লোকেশন জানিয়ে দিতে পারবেন। এতে তাদের আমরা দ্রুত সাহায্য করতে পারব। এ ছাড়া সুলভ মুল্যে রোমিং সিম দেওয়া হচ্ছে। এতে হজযাত্রীরা কানেকটেড থাকতে পারবেন এবং একটি ডেবিট কার্ডও দেওয়া হচ্ছে।’
সোমবার এ বছরের হজ কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কার্যক্রম উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এ ছাড়াও থাকবেন বাণিজ্য এবং বিমান ও পর্যটন উপদেষ্টা সেখ বশিরউদ্দীন।’
হজক্যাম্পের ভেতরে হজযাত্রীদের সার্বিক নিরাপত্তা দিতে নিয়োজিত আছেন অনেক পুলিশ সদস্যও। খোলা হয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কন্ট্রোল রুম। হজযাত্রীদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে এয়ারপোর্ট জোনের অফিসার ইনচার্জ তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘এবার হজ কার্যক্রমের সার্বিক নিরাপত্তা দিতে তিনস্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে হজ ক্যাম্পকে ঘিরে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে ক্যাম্পসহ বিমানবন্দর ঘিরে। আর তৃতীয়টি হচ্ছে থানাকেন্দ্রিক। আমাদের ৩০০-এর বেশি পুলিশ সদস্য এবার নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন।’
হজ ব্যবস্থাপনা পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৮৭ হাজার ১০০ জন পবিত্র হজ পালন করতে পারবেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৫ হাজার ২০০ ও বাকি ৮১ হাজার ৯০০ জন যাবেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। এদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ নারী এবং ৬৫ শতাংশ পুরুষ রয়েছেন। পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত মোট হজযাত্রীর ৮০ শতাংশের ভিসা হয়েছে। এ ছাড়া হজ ব্যবস্থাপনার জন্য এ বছর সরকারি ১১২ ও বেসরকারি গাইড থাকবেন ১ হাজার ৭৪৩ জন। ৭০ মোয়াল্লেম হজযাত্রীদের সার্বিক সহযোগিতায় রাখা হয়েছে। অন্যদিকে হজক্যাম্প থেকে রবিবার দুপুর ২টা পর্যন্ত পাওয়া হিসাব অনুযায়ী ওই সময় পর্যন্ত ক্যাম্পে রিপোর্ট করেছেন ১৫৫৬ জন।
হজ ফ্লাইট
২০২৫ সালের পবিত্র হজ ফ্লাইট শুরু আগামী ২৯ এপ্রিল। ওই দিন ৪১৯ জন হজযাত্রী সৌদি আরবের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন। হজের প্রথম ফ্লাইট উদ্বোধন করবেন অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন।
হজযাত্রী পরিবহনে বিমান বাংলাদেশসহ তিনটি এয়ারলাইনস এবার কাজ করবে। ২৯ এপ্রিল শুরু হয়ে ৩১ মে হজের শেষ ফ্লাইট সৌদি আরব যাবে। ফিরতি ফ্লাইট ১০ জুন শুরু হয়ে শেষ হবে ১০ জুলাই। যাত্রী পরিবহনে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে ১১৮, সাউদিয়া ৮০ ও নাস এয়ারলাইনসের ৩৪ ফ্লাইট পরিচালনা করবে। এ ছাড়া বিমান ১০৮টি, সাউদিয়া ৭৯টি ও ফ্লাই নাস ৩৪টি ফিরতি ফ্লাইট পরিচালনা করবে।
বাংলাদেশ বিমান জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ২৯ এপ্রিল দিবাগত রাত ৩টায় এবার বিমানের প্রথম হজ ফ্লাইট উড়বে। এবার আমরা আমাদের নিজস্ব এয়ারক্রাফটে যাত্রী পরিবহন করছি। মোট ৪টি এয়ারক্রাফট ব্যবহার করছি। এবার প্রায় ৪৪ হাজার হজযাত্রী বাংলাদেশ বিমান পরিবহন করবে।