গত বছরের ডিসেম্বরে টাকার বিনিময়ে নিজের নাম পরিবর্তন করে মো. ইউনুস পরিচয়ে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব সনদ (এনআইডি) হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন রোহিঙ্গা মো. বেলাল হোসেন। এ কাজ সফল করতে কক্সবাজারের কলাতলী উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের ফাতেমা বেগম নামে এক নারীকে মা সাজিয়ে হাজির করেন কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসে। ফাতেমার স্বামী মৃত আব্দুল খালেককে বাবা হিসেবে দেখানো হয়। এ সময় ইউনুসের জমা দেওয়া কাগজপত্র দেখে সন্দেহ হয় নির্বাচন কর্মকর্তা মো. ফয়সালের। তিনি এ ব্যাপারে প্রশ্ন তুললে ফাতেমা দাবি করেন ইউনুস তার প্রথম পক্ষের সন্তান। এরপর দুজনের জন্মসনদ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ইউনুসের সঙ্গে ফাতেমার বয়সের পার্থক্য মাত্র ১৪ বছর। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ফাতেমা প্রতারণার কথা স্বীকার করেন। বলেন, মাত্র ১৫ হাজার টাকার লোভে তিনি বেলাল হোসেন ওরফে মো. ইউনুসের মা সেজেছেন। পরে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ফাইলটি জব্দ করায় ইউনুসের পক্ষে এনআইডি পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে থেমে নেই রোহিঙ্গাদের এমন অপতৎপরতা।
বেলাল হোসেনের মতোই এ পর্যন্ত অনেক রোহিঙ্গা নিজের নাম, আসল মা-বাবার নাম গোপন করে কথিত (ভুয়া) মা-বাবার নাম-ঠিকানা এবং ইউনিয়ন ও পৌরসভা থেকে ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে বাগিয়ে নিয়েছেন এ দেশের এনআইডি। আর অনৈতিক এসব কাজে তাদের সহায়তা করছেন অর্থলোভী স্থানীয় দালাল, জনপ্রতিনিধি এবং নির্বাচন অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তবে কয়েক বছর ধরে স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের এ ব্যাপারে কড়াকড়ি বাড়ায় প্রতারক রোহিঙ্গারা তিন পার্বত্য জেলার বাইরে দেশের বিভিন্ন জেলায় গিয়ে কৌশলে ভোটার হওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। ওই রোহিঙ্গারা শুধু এ দেশের নাগরিকই বনে যাচ্ছেন না, জড়িয়ে পড়ছেন বিভিন্ন অপকর্মে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের অনৈতিক তৎপরতা রোধ এবং বিগত সময়ে কোনো রোহিঙ্গা ভোটার হয়ে থাকলে তা খুঁজে বের করতে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আর সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ‘রোহিঙ্গা এফিস’ নামে নতুন সফটওয়্যার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। এফিসের পূর্ণ রূপ হলো- অটোমেটেড ফিঙ্গারপ্রিন্ট আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম বা এএফআইএস। যার মাধ্যমে আগে ভোটার হওয়া বা নতুন ভোটার হওয়া কোনো ব্যক্তির ফিঙ্গারপ্রিন্ট ক্রসচেক করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ ইসির বিদ্যমান ও হালনাগাদ ভোটার তালিকায় থাকা রোহিঙ্গাদের খুঁজে বের করতেও কাজ করবে ইসির এই নতুন সফটওয়্যার।
ইসি জানিয়েছে, রোহিঙ্গা ডেটাবেস-সংবলিত এই সফটওয়্যারটি সংরক্ষণ করা হবে নির্বাচন ভবনের ৯ তলায়। এর মাধ্যমে চলমান হালনাগাদ তালিকায় থাকা ভোটারদের থেকে রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করা যেমন সম্ভব হবে, তেমনি বিগত দিনে যারা ভোটার হয়েছেন তাদের মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কেউ রয়েছেন কি না, সেটাও শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে কক্সবাজার জেলার সাতটি ক্যাম্পে ১১ লাখ ৫৮ হাজার ২৫৯ জন রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। তবে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে এ পর্যন্ত কতজন রোহিঙ্গা নানা কৌশলে ছদ্মবেশে এ দেশের এনআইডি বাগিয়ে নিয়েছেন তার কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি নির্বাচন কমিশনে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের এনআইডি পাওয়ার অপতৎপরতা রোধে বিভিন্ন সময় তারা পদক্ষেপ নিয়েছেন, কিন্তু সেসব তথ্য সন্নিবেশ করার নির্ধারিত কোনো ডেস্ক তাদের নেই।
২০১৯ সালে অবৈধভাবে রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার তথ্যানুসন্ধানে মাঠে নেমেছিল নির্বাচন কমিশনের একটি দল। সে সময় দলটি ১০ জেলায়- চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ফেনী, রাঙামাটি, নারায়ণগঞ্জ, খাগড়াছড়ি ও ঝিনাইদহে অভিযান পরিচালনা করে। পরে অবৈধভাবে ভোটার হওয়া ৩ হাজার ৮১৮ জন রোহিঙ্গার সন্ধান পায় নির্বাচন কমিশন। পরে তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা মামলা করেন এবং তাদের এনআইডি লক করার নির্দেশ দেয় ইসি। আর এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১৭ জনকে (স্থানীয় অফিস সহকারী, অফিস সহায়ক, ঢাকা অফিসের এক ডেটা এন্ট্রি অপারেটর) আটক করা হয়। পরে আদালতের রায়ে তাদের এক-দুই বছর পর্যন্ত জেল খাটতে হয়েছে।
২০১১ সালে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের তদন্ত অনুযায়ী, এ দেশের ভোটার তালিকায় শনাক্ত করা হয় ৫০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা। এরপর নির্বাচন কমিশন যাচাই-বাছাই করে ৪৫ হাজার রোহিঙ্গার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়। ২০১৬ সালে আরেক দফা যাচাই-বাছাই করে সাড়ে চার হাজার রোহিঙ্গার নাম বাদ দেওয়া হয়। তার পরও বিভিন্ন সময় দালালদের সহায়তায় অর্থের বিনিময়ে এনআইডি হাতিয়ে নিতে রোহিঙ্গাদের অপতৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
কক্সবাজার রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাহাবুবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘২০২০ সাল থেকে তারা কাজ করছেন। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি করে রোহিঙ্গাদের লোকালয়ে জমি কিনে বাড়ি করা অথবা এনআইডি পাওয়ার তৎপরতা চালাচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করছি। এ পর্যন্ত জেলায় সাড়ে ৬০০-এর বেশি রোহিঙ্গার এনআইডি বাগিয়ে নেওয়ার প্রমাণ পেয়েছি এবং সেগুলো বাতিল করতে স্থানীয় উপজেলা, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এবং ঢাকার নির্বাচন কমিশনেও অভিযোগ দায়ের করেছি। জানতে পেরেছি আমাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ পর্যন্ত ইসি প্রায় ৩০০ রোহিঙ্গা সন্দেহভাজন ব্যক্তির এনআইডি লক করেছে এবং এখনো তদন্তাধীন রয়েছে অনেক এনআইডি।’
মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ভোটার করা আমি মনে করি রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ। অথচ আইনের ফাঁকফোকরে প্রতারকরা পার পেয়ে যাচ্ছে। তাদের শাস্তির আওতায় আনা যাচ্ছে না। এমনও দেখেছি, মাঠপর্যায়ে গিয়ে প্রশাসন প্রমাণ পাচ্ছে প্রতারণার, অনেক সময় আদালতেও প্রমাণ হয়েছে অথচ কোনো শাস্তি এখন পর্যন্ত দেখিনি। তার মানে আইনি দুর্বলতাও রয়েছে। কাজেই আইনি দুর্বলতা ও প্রয়োগের অভাবে বন্ধ হচ্ছে না রোহিঙ্গাদের এনআইডি পাওয়ার অপতৎপরতা।’
এনআইডি উইংয়ের সিস্টেম ম্যানেজার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের কাছে এ দেশে থাকা ১০ লাখ রোহিঙ্গার ডেটা রয়েছে। আন্তর্জাতিক ওই সংস্থাটি এরই মধ্যে ইসিকে এ তথ্য শেয়ার করতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। তথ্যগুলো কোন উপায়ে দেবেন, সে ব্যাপারে আমাদের বেশ অগ্রগতি হয়েছে। শিগগিরই হয়তো আমরা সেটা পেয়ে যাব।’
ইসির এই সিস্টেম ম্যানেজার আরও বলেন, ‘বিগত দিনে আমরা এমন অনেক কেস পেয়েছি, যারা ভুয়া নাম-পরিচয় ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহার করে এ দেশে নাগরিক হওয়ার চেষ্টা করেছেন। সেসব নাগরিকের সঠিক তথ্য খুঁজে বের করার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে ফিঙ্গারপ্রিন্ট চেক করা। ইউএনএইচসিআরের থেকে রোহিঙ্গাদের তথ্যগুলো পাওয়ার পর নতুন করে সারা দেশের ভোটারদের তথ্য ক্রসচেকের আওতায় আনা সম্ভব হবে। শনাক্ত করা সম্ভব হবে কতজন রোহিঙ্গা ছদ্মনাম-পরিচয়ে এ দেশের নাগরিক হয়েছেন। রোহিঙ্গা এফিসটি পাওয়ার পর তা সংরক্ষণ করা হবে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনের ৯ তলায়, ইসির নিজস্ব সার্ভারের পাশে। এ পর্যায়ে রেহিঙ্গা এফিসটি সংরক্ষণের কারিগরি দিকগুলো আমরা পর্যালোচনা করছি।’
জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের তথ্যসংবলিত ইসির ওই নতুন সার্ভারটির নাম হবে ‘রোহিঙ্গা এফিস’। এটির সঙ্গে ইসির সেন্ট্রাল ডেটাবেসের যোগসূত্র থাকবে। এমনভাবে সফটওয়্যারটি তৈরি করা হবে, সংক্রিয় পদ্ধতিতে সে নতুন-পুরোনো সব ভোটারের তথ্য ও বায়োমেট্রিক যাচাই করতে সক্ষম হবে। বর্তমানে ইসির সার্ভারে সংরক্ষিত রয়েছে সাড়ে ১২ কোটি ভোটারের তথ্য ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট। নতুন সফটওয়্যারটিতে ইসির নিজস্ব সার্ভারের তথ্য অটোমেটিক ক্রসচেক হতে থাকবে। এ সময় কোনো ভোটারের ফিঙ্গারপ্রিন্টের তথ্যের মিল পেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এফিস তার এনআইডি আটকে রাখবে, যেটা ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বুঝতে পারবেন। এরপর এফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে সেই রোহিঙ্গার তথ্য তদন্ত করা হবে।
গত ১৯ মার্চ নির্বাচন ভবনে ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের পর ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন (এনআইডি) অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এস এম হুমায়ুন কবীর জানান, রোহিঙ্গাদের তথ্য শেয়ারের বিষয়ে ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে সম্প্রতি সরকারের চুক্তি হয়েছে। তাতে রোহিঙ্গাদের তথ্য নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে শেয়ার করতে সম্মত হয়েছে ইউএনএইচসিআর। তবে এই তথ্য আমাদের কাছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নাকি অন্য কোথাও থাকবে- সে বিষয়ে আলোচনার পর এই তথ্য নির্বাচন কমিশনে রাখার বিষয়টিও চূড়ান্ত হয়েছে।
এ বিষয়ে ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশের মুখপাত্র শারি নিজমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তথ্য অধিকার ও সম্মান নিশ্চিতে ইউএনএইচসিআর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বৈশ্বিক সুরক্ষা মানদণ্ডের আলোকে প্রয়োজনীয়তা ও অনুপাতের ভিত্তিতেই কঠোরভাবে সীমিত আকারে এসব তথ্য ভাগাভাগি করা হবে। সেই লক্ষ্যে আমাদের কাছে থাকা রোহিঙ্গাদের তথ্যভান্ডার বাংলাদেশে ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রমে সহযোগিতার জন্য দিতে বাংলাদেশ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থী নিবন্ধন তথ্যভান্ডার ভাগাভাগি, এর আওতা ও নির্দিষ্ট তথ্যক্ষেত্র। এ পর্যায়ে তথ্যভান্ডারটির নিরাপদ ও সুরক্ষা নিশ্চিতে এর কারিগরি দিকগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এতে এমন উপায় বিবেচনা করা হচ্ছে, যাতে এসব তথ্য ভাগাভাগি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুরক্ষা আরও জোরদার হয়।’