ময়মনসিংহ বিভাগে পাঁচটি জলবায়ু-সহনশীল সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা থেকে শুরু করে নেত্রকোনা-ময়মনসিংহ-শেরপুর হয়ে জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার ধানুয়া কামালপুর গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত ১৭২ কিলোমিটার সীমান্ত সড়কে এই সেতুগুলো নির্মিত হবে। সওজের ব্রিজ উইংয়ের একটি দল সমীক্ষা শেষ করে এখন এই সেতুগুলোর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করছে।
সীমান্ত সড়কে যে পাঁচটি নতুন সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা সওজ করছে, সেগুলো হলো নিতাই সেতু (৬৪৫ মিটার), মহাদেব সেতু (৭০৮ মিটার), গণেশ্বরী সেতু (৬৬৮ মিটার), সোমেশ্বরী সেতু-২ (৮০৬.৮ মিটার) ও সোমেশ্বরী সেতু-৩ (১,৯৮২ মিটার)। এর মধ্যে সোমেশ্বরী-২ সেতুটি নির্মিত হবে শ্যামগঞ্জ-জারিয়া-বিরিশিরি সড়কে।
সওজের ব্রিজ উইংয়ের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খালেদ শাহেদ খবরের কাগজকে জানান, ইতোমধ্যে এসব সেতু এলাকায় সমীক্ষার কাজ শেষ করেছেন সওজের প্রকৌশলীরা। এই পাঁচটি সেতু নির্মাণে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯৩৭ কোটি টাকা সরকারের উন্নয়ন বরাদ্দ খাত থেকে আসবে। বাকি ২ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা দেবে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। সওজের কোনো প্রকল্পে প্রথমবারের মতো সংযুক্ত হচ্ছে এ ব্যাংকটি। চলতি বছরের জুলাই থেকে শুরু হওয়া এ পাঁচ সেতু নির্মাণ প্রকল্প ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রাথমিকভাবে।
ময়মনসিংহ থেকে ধোবাউড়া উপজেলা সদর, নেত্রকোনার কলমাকান্দা, দুর্গাপুর উপজেলা হয়ে সীমান্ত সড়কটি হাওরের বুক চিরে চলে গেছে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর এলাকায়। তবে সীমান্ত সড়ক এখনো পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। কারণ দুর্গাপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নিতাই নদী, লেংগুড়া এলাকার গণেশ্বরী নদীতে সেতু নির্মিত হয়নি। এই দুই নদীর পাশাপাশি সোমেশ্বরী নদীর একটি পয়েন্টেও সেতু নেই। এ সেতুগুলো নির্মিত হলে ১৭২ কিলোমিটার সড়ক পূর্ণতা পাবে।
খালেদ শাহেদ জানান, এই পাঁচ সেতু নির্মাণ করতে জমি অধিগ্রহণ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ-গ্যাস লাইন স্থানান্তর ছাড়াও ভ্যাট ও ট্যাক্স পরিশোধ করা হবে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে। আর প্রকল্পের নির্মাণসামগ্রী কেনাকাটা, পরামর্শকদের পারিশ্রমিক পরিশোধ করা হবে উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়নে।
ময়মনসিংহ সওজের (সড়ক সার্কেল) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. রাশেদুল আলম জানান, কলমাকান্দা উপজেলার ১২ কিলোমিটার এবং সুসং-দুর্গাপুরের চায়না মোড় এলাকায় চার কিলোমিটার সড়ক রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে। এই সড়ক সওজের অধীনে নিতে আবেদন করা হয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগে। তবে এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
রাশেদুল আলম বলেন, ‘এই সড়কগুলো সওজের অধীনে এলে ময়মনসিংহ, শ্যামগঞ্জ হয়ে বিরিশিরি, জারিয়া ও দুর্গাপুর পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার সড়কে তখন আর কোথাও থামতে হবে না।
সেতুগুলো হয়ে আমরা সোজা চলে যেতে পারব সুনামগঞ্জ। এতে রাজশাহী, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগ থেকে আসা পণ্যবাহী যানবাহনগুলো আর ঢাকা ঘুরে সিলেটে যাবে না। এতে অর্থনীতির এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হবে।’
সওজের এই পাঁচটি নতুন ব্রিজ নির্মাণে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো বন্যা নিয়ন্ত্রণ। সীমান্তের পাহাড়ি ঢল সমতলের নদীগুলোতে আসে যেসব নদী হয়ে তার মধ্যে সোমেশ্বরী, নিতাই, গণেশ্বরীও রয়েছে। তাই পানিপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত না করে পিয়ার বসাতে হবে সেতু নির্মাণের সময়। খালেদ শাহেদ বলেন, ‘বন্যার পানি যেন সহজে প্রবাহিত হয়, সে জন্য ব্রিজের উভয় পাশে ভায়াডাক্টের প্রশস্ততা বাড়ানো হবে। বাড়ানো হবে ড্রেনেজ ফ্যাসিলিটি। পিয়ারগুলোর প্রশস্ততা হবে যথাক্রমে ১১০ মিটার থেকে ১৬০ মিটার।’
তিনি জানান, নিতাই, মহাদেব, গণেশ্বরীতে নির্মিত হবে স্টিল আর্চ সেতু। সোমেশ্বরী নদীতে নতুন দুটি ব্রিজ হবে এক্সট্রাডোজড পদ্ধতির। বিরিশিরি সড়কে সোমেশ্বরী নদীর ওপর একটি ব্রিজ থাকলেও সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তার পাশেই সোমেশ্বরী ব্রিজ-২ নির্মাণ করা হবে বলে জানান প্রকল্প কর্মকর্তা শাহেদ।
জলবায়ু-সহনশীল সেতু কেন বলা হচ্ছে জানতে চাইলে খালেদ শাহেদ বলেন, ‘এই সেতুগুলো নির্মিত হলে রাজশাহী ও রংপুরের সঙ্গে সিলেট বিভাগের সড়ক যোগাযোগে দূরত্ব কমবে। এতে জ্বালানি পুড়বে কম। পাশাপাশি এই সেতু নির্মাণে নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হবে; পরিবেশ দূষণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনব আমরা। পাশাপাশি এমন প্রযুক্তিতে এই ব্রিজগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে, যেন বন্যার পানিতে এর সংযোগ সড়ক, পিয়ার বা ভায়াডাক্ট ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। ডিপিপি চূড়ান্ত হলে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য বলতে পারব।’
প্রকল্পের অর্থদাতা ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক সেতু বাস্তবায়নে নানা পরামর্শ দিচ্ছে সওজকে। তারা জানিয়েছে, অর্থ লগ্নির টাকা তারা সেতুর টোল থেকে উঠিয়ে নেবে। পরামর্শক নিয়োগে কিছু পরামর্শ আছে, যা এখনো সওজ কর্মকর্তারা খোলাসা করতে চান না। তবে প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে সওজ যে দাবি তুলেছে, তাতে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক আপত্তি জানায়নি।
এই পাঁচ সেতু নির্মাণের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সওজ, সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ হয়ে একনেকে পাস হতে কমপক্ষে দেড় বছর সময় লাগবে বলে ধারণা প্রকল্প কর্মকর্তাদের। একনেক এই প্রকল্প অনুমোদন করলে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করবে সওজ। পরামর্শক নিয়োগেও উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির কথাই ভাবছে সওজ।