জমি অধিগ্রহণে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) ও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের মধ্যে জটিলতা নিরসন না হওয়ায় ধীরগতিতে চলছে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর সেতু পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ ও দোতলা রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পের কার্যক্রম। ৭ দশমিক ২৩ একর জমি দুই চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বুঝিয়ে না দেওয়ায় তারাও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে আপত্তি জানাচ্ছে। জমি অধিগ্রহণের ইস্যু ছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলার ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ১ হাজার ৭৬ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুনে এ প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আগামী বছরের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে এই প্রকল্পের মেয়াদ।
কী বলা হয়েছিল প্রকল্প প্রস্তাবে
২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি একনেকে চূড়ান্ত অনুমোদন পায় বিবিএর এ প্রকল্প। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ২০ কোটি টাকা সরকারের উন্নয়ন তহবিল থেকে আর বাকি ২২২ কোটি টাকা সেতু বিভাগের নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ১০ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ পঞ্চবটি-মুক্তারপুর সড়কের ৭ কিলোমিটার অ্যাটগ্রেড সড়ক (যে সড়ক আশপাশের জমির সমতলে নির্মিত) দুই লেন এবং তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু থেকে মুক্তারপুর সেতু পর্যন্ত ৩ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার অ্যাটগ্রেড সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হবে। পঞ্চবটি থেকে শীতলক্ষ্যা-৩ সেতু (মুক্তারপুর) পর্যন্ত ২ দশমিক ৮০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ৬টি র্যাম্পসহ দুই লেনবিশিষ্ট ৯ দশমিক ৬ কিলোমিটার হচ্ছে উড়াল সড়ক।
এই উড়াল সড়কের ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার অংশ পঞ্চবটি থেকে কাশিপুর পর্যন্ত বিদ্যমান সড়কের (অ্যাটগ্রেড রোড) ওপর দিয়ে যাবে। কাশিপুর থেকে চর সৈয়দপুর পর্যন্ত নিচু ভূমির ওপর দিয়ে উড়াল সড়কের ২ দশমিক ৭৬ কিলোমিটার অংশ যাবে। এ ছাড়া যানজট নিরসনে পঞ্চবটি মোড় থেকে ফতুল্লার দিকে ও নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ার দিকে ৩১০ মিটার করে ৬ লেন সড়ক নির্মাণ করা হবে। মুক্তারপুর সেতুর দক্ষিণ প্রান্তে ৪৪৩ মিটার অ্যাটগ্রেড সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হবে। নিচে-ওপরে ২টি করে ৪টি টোল প্লাজা নির্মাণ করা হবে এবং যানবাহনের ওজন পরিমাপের জন্য থাকবে ৬টি ওজন স্টেশন। নিচতলা যান চলাচলের জন্য ফ্রি থাকলেও উড়াল সড়কে যাতায়াতে টোল পরিশোধ করতে হবে।
এই প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার কুনহুয়া এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে চীনের শেনডন লুকাইয়ো গ্রুপ ও সিএসআই কাজ করছে।
জমি অধিগ্রহণে কেন জটিলতা
এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রথম দফায় ১০৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩১ দশমিক ৬১২৫ একর জমি নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন থেকে অধিগ্রহণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় পঞ্চবটি-মুক্তারপুর সড়কে মসজিদ, কবরস্থানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থাপনা রক্ষা করতে গিয়ে এখন ৭ দশমিক ২৮ একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে থাকা এ জমি অধিগ্রহণ করতে গেলে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন জমির মালিকরা। জেলা প্রশাসন থেকে জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত কোনো নোটিশ এখনো জারি করা হয়নি। জেলা প্রশাসনের ব্যাখ্যা হলো, এ জমি অধিগ্রহণ করতে ২৯২ কোটি টাকা দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে বিবিএ থেকে, সে অর্থের পুরোটা পেলে এই নোটিশ জারি করা হবে।
প্রকল্প পরিচালক মো. ওয়াহিদুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, ‘এর আগে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ৩১ দশমিক ৬১২৫ একর জমি হস্তান্তর করতে আমরা ৫ দফায় ১ হাজার ৪৩ কোটি টাকা বুঝিয়ে দিয়েছি। নতুন করে ৭ দশমিক ২৮ একর জমি পেতে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনকে ইতোমধ্যে ১৪৬ কোটি টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ছাড় দিলে বাকি টাকাও তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু এই আশ্বাস তারা মানতে চাইছেন না। জেলা প্রশাসনের বক্তব্য একটাই, পুরো টাকা বুঝে না পেলে তারা জমি অধিগ্রহণের নোটিশ জারি করবে না।’
মো. ওয়াহিদুজ্জামান জানান, গত ফেব্রুয়ারি মাসে শেনডনকে প্রকল্পের পুরো জমি বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল বিবিএর। কিন্তু তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো সেই জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। এতে করে প্রকল্পের নির্মাণসামগ্রী যত্রতত্র রাখতে হচ্ছে। শুধু চুরি যাওয়া নয়; প্রকল্প এলাকায় যানজটেরও সৃষ্টি করছে এসব ভারী মালামাল। এতে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা আপত্তি জানাতে শুরু করেছে।
শুধু প্রশাসনিক জটিলতা না; গ্যাস-বিদ্যুৎ পরিষেবা স্থানান্তর করতে গিয়েও জটিলতায় পড়তে হয়েছে প্রকল্প কর্মকর্তাদের।
নাগরিক পরিষেবা লাইন স্থানান্তরের আগে গ্লোবাল সার্ভে নামে এক প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জরিপ করতে। কিন্তু গ্যাস লাইন ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নিয়ে এ প্রতিষ্ঠানের জরিপের তথ্য ছিল ভুল। ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, পঞ্চবটি থেকে কাশিপুর মোড় পর্যন্ত সাড়ে ৩ কিলোমিটার সড়কে পাইল ক্যাপ করতে বেগ পেতে হয় কর্মীদের। পাইলের নকশাতে পরিবর্তন আনতে হয়, এতেও কিছু খরচ বাড়ে। এই প্রকল্পের সর্বমোট পিলারের সংখ্যা ১৮৯টি, এর মধ্যে ১১০টি নির্মাণ করা হচ্ছে বিদ্যমান সড়কের ওপর। প্রকল্পের ১ হাজার ৪৮৮টি গার্ডারের মধ্যে ১ হাজার ৪১১টি নির্মাণ শেষ হয়েছে। তবে জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় ৫০০ গার্ডার বসানো যাচ্ছে না।
ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘কাজের গতি এখন কম। এতদিনে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা। অথচ হয়েছে মাত্র ৬৪ শতাংশ। জমি পাওয়া মাত্র আমরা প্রকল্পের কাজ পুরোদমে শুরু করব।’
প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ১ হাজার ৭৬ কোটি টাকা
জমি অধিগ্রহণ, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি ইস্যুতে প্রকল্পে ১ হাজার ৭৬ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে বলে জানিয়েছেন মো. ওয়াহিদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলাম তখন ডলারের মূল্য ছিল ৮৪ টাকা, এখন আমাদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১২২ টাকা দরে মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। প্রতি লিটার ডিজেল ৬৫ টাকা থেকে ১১০ টাকায় উন্নীত হয়েছে। এখন তাই প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্ট করতে হচ্ছে। তাই প্রকল্পের ব্যয় ২২৪২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে তা ৩৩১৮ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।’
প্রকল্পের নানা খাতের ব্যয় সম্পর্কে জানিয়েছেন প্রকল্প কর্মকর্তারা। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধি এবং আয়কর সমন্বয়ের কারণে পরামর্শক খাতে ২৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা; মৌজা মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন খাতে ২০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় বাড়ছে। ভূ-গর্ভস্থ ইউটিলিটির অবস্থান বিবেচনায় নির্মাণ ও পূর্ত খাতে ৩০৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা, ইউটিলিটি স্থানান্তর খাতে ১৪ লাখ ৯১ কোটি টাকা বেড়েছে। এই ৫৫৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ছাড়াও ৫২১ কোটি টাকা জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত কাজের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক।
গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরে সেতু ভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়। সেই আগুনে পুড়ে যায় প্রকল্পের কাজে ব্যবহৃত ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ি, যা পরামর্শক ও ঠিকাদারদের আনা নেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হতো। সেই গাড়ির ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১০ কোটি টাকা দাবি করে বসেছে ঠিকাদাররা। এ নিয়েও কিছু জটিলতা আছে।