বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থানের পর ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের উদাহরণ বিশ্বের অনেক দেশে রয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশেও এ ধরনের কমিশন গঠনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য এ মাসের মধ্যে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি দল দক্ষিণ অফ্রিকা সফরে যাচ্ছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবসানের পরে এ ধরনের ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের বিষয়টি বিশ্বব্যাপী বহুলভাবে আলোচিত। বর্ণবাদের অবসান ঘটিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা ক্ষমতায় আসার পর তার জীবনী নিয়ে বানানো হয় আলোচিত একটি চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রের আলোচিত সংলাপ হলো, ‘ওরা (শ্বেতাঙ্গরা) ক্ষমতায় থেকে যা যা করেছে, আমরা যদি ক্ষমতা পাওয়ার পর সেটাই করি, প্রতিশোধ নিই, তাহলে আমরা কীভাবে ওদের চেয়ে ভালো হলাম? ক্ষমা আর শান্তিই একমাত্র সমাধান।’ ‘ম্যান্ডেলা লং ওয়াক টু ফ্রিডম’ নামের ওই চলচ্চিত্রটির একটি দৃশ্যে শ্বেতাঙ্গ এবং কৃষ্ণাঙ্গদের বিরোধ তুঙ্গে থাকা অবস্থায় এক ভাষণে এই সংলাপ উচ্চারণ করেন চলচ্চিত্রটির চরিত্র ম্যান্ডেলা।
১৯৯৪ সালের ১০ মে আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ম্যান্ডেলা। তারপর তাকে নিয়ে বানানো হয় ওই চলচ্চিত্র। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তের জন্য নেলসন ম্যান্ডেলার সরকার ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন (টিআরসি) গঠন করে।
বর্তমানে বাংলাদেশেও বিভিন্ন বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তিতর্কের মধ্যে সরকারও ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের কথা জানায়। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ম্যান্ডেলার শপথের ৩১তম বার্ষিকীর দিন গত ১০ মে এই ঘোষণা দেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। কমিশন গঠনের আগে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ম্যান্ডেলার দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যাচ্ছেন বলেও জানান তিনি। ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘এই উপলক্ষে আমি এবং প্রধান বিচারপতি টিম নিয়ে সাউথ আফ্রিকায় যাচ্ছি। সেখান থেকে ফিরে এসে আপনাদের (সাংবাদিকদের) সঙ্গে অভিজ্ঞতা শেয়ার করব।’
‘আমার মনে হয় অনন্তকাল হানাহানি করে জাতির মুক্তি আসবে না। জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।’
এদিকে আগামী ১৭ মে শনিবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ দক্ষিণ আফিকা যাচ্ছেন বলে সুপ্রিম কোর্টের একাধিক সূত্র গতকাল রবিবার রাতে দৈনিক খবরের কাগজকে নিশ্চিত করেছেন। এই সফর সাত দিনের বলেও জানা গেছে।
প্রসঙ্গত এর আগে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারও ‘ট্রুথ কমিশন’ গঠন করেছিল। তবে পরবর্তীতে ওই কমিশন অবৈধ ঘোষণা করেছিল আপিল বিভাগ। তাই দক্ষিণ আফ্রিকা, কেনিয়া কিংবা সার্কভুক্ত দেশ নেপালসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ক্রান্তিকালীন বিচারের অংশ হিসেবে যেসব ট্রুথ কমিশন প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেগুলো থেকে জ্ঞান অর্জন করে দেশের বাস্তবতার নিরিখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এক-এগারোর সরকার আমলে গঠিত ট্রুথ কমিশন পরবর্তী সময়ে অবৈধ বলে রায় দিয়েছিলেন উচ্চ আদালত। হাইকোর্টের ওই রায়কে বহাল রেখেছিলেন আপিল বিভাগ।
এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতির দায় স্বীকার করে জরিমানা দিয়ে মার্জনা পাওয়া সরকারি কর্মকর্তাদের আবার বিচারের মুখোমুখি হতে হয়।
এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অধ্যাদেশের মাধ্যমে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই থেকে সত্য ও জবাবদিহি কমিশন বা ট্রুথ অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি কমিশন কাজ শুরু করে। ওই কমিশন দুর্নীতিবাজদের স্বেচ্ছায় দায় স্বীকার এবং জরিমানা আদায়ের মাধ্যমে অনুকম্পা বা মার্জনার সুযোগ দেয়। দুর্নীতির দায়ে যারা দুবছরের কম মেয়াদে সাজা পান শর্ত সাপেক্ষে তাদের দায়মুক্তির জন্য ওই কমিশন গঠন করা হয়েছিল। তবে ওই বছরেরই আগস্টে ট্রুথ কমিশনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হয়। পরে ১৩ নভেম্বর হাইকোর্ট ট্রুথ কমিশনকে অবৈধ ঘোষণা করেন। এর ফলে যেসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা / প্রতিষ্ঠান অনুকম্পা পান তারা আবার দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত এবং মামলার আওতায় চলে আসেন।
আদালতে তেমন ৯টি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তখন লড়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আহসানুল করিম। জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী গতকাল রবিবার দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, ‘তখন এই আইনে বলা হয়েছিল যে, কেউ সত্যি কথা বললে, তাকে ক্ষমা করা হবে। সেখানে সত্যি কথা বলে জরিমানা দিয়ে উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তারাও সরল বিশ্বাসে উপকৃত হওয়ার আশায় সত্য কথা বলেছেন। কিন্তু পরে দেখা যায়, তাদের ওই স্বীকারোক্তি দিয়েই তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। অর্থাৎ ‘রাষ্ট্র নিজেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে’। যেখানে রাষ্ট্রের উচিত ছিল তাদের নিরাপত্তা বিধান করা।
তাই এখন যে কমিশন করার কথা বলা হচ্ছে, তাদেরকে অতীত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে করতে হবে। রাষ্ট্র আইন করে যদি কাউকে ট্রুথ কমিশনের সুযোগ নিতে বলে, তবে তাদেরকে ‘ইনডেমনিটি’ দিতে হবে। যেন পরে তারা অতীতের মতো আবার বিশ্বাসঘাতকতার শিকার না হন। এটি আর্থিক অনিয়ম সংক্রান্ত মামলার ব্যাপারে বলছি। তবে মানুষ হত্যার মতো ঘটনা সংক্রান্ত মামলা হলে, সেখানে ইনডেমনিটি দেওয়ার কথা বলছি না। সেখানে যারা সত্যিই খুনের সঙ্গে জড়িত, তাদেরকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। আর যাদেরকে হয়রানির উদ্দেশ্যে মামলায় জড়ানো হয়েছে, তাদের পরিত্রাণের ব্যবস্থা করতে হবে।