আগামী অর্থবছরের বাজেটে লাখ টাকার ওপর কোরবানির পশু কিনলে তার তথ্য রিটার্নে উল্লেখ করতে হবে। শুধু তা-ই নয়, আয়কর রিটার্ন ফরমের সব তথ্য অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে। রিটার্ন ফরমের সব তথ্য পূরণ করা না হলে ফরম জমা হবে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
আরও জানা যায়, রিটার্নে মিথ্যা তথ্য দেওয়া যাবে না। কোনো তথ্য গোপন করা যাবে না। আগামী অর্থবছর থেকে ম্যানুয়ালি রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। অনলাইনে রিটার্ন জমা দিতে হবে। করযোগ্য আয় না থাকলেও ই-টিআইএন থাকলেই রিটার্ন দিতে হবে। রিটার্ন জমার ক্ষেত্রে এসব নির্দেশ না মানলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করা হবে। এ ক্ষেত্রে আসছে বাজেটে জেল-জরিমানা, হিসাব জব্দ, প্রয়োজনে মামলা করারও বিধান থাকবে।
এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান খবরের কাগজকে বলেন, ই-টিআইএন থাকার পরও গড়ে ৬০ শতাংশ করদাতা রিটার্ন জমা দেন না। বছরের পর বছর এ ধারা চললেও অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না। এ বিষয়ে আগামী অর্থবছর থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, রিটার্নে খুব কম তথ্য চাওয়া হয়। অথচ ম্যানুয়ালি জমা দেওয়া রিটার্নে এসব তথ্যের বেশির ভাগই উল্লেখ করা হয় না। আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে মোট আয় বা মোট ব্যয় বেশির ভাগ করদাতা উল্লেখ করেন না, যা ঠিক নয়। আগামী অর্থবছর থেকে অনলাইনে রিটার্ন জমা দিতে হবে। এতে রিটার্ন ফরমের সব ঘর পূরণ না করে অর্থাৎ সব তথ্য উল্লেখ না করলে ফরম সাবমিট হবে না। মানে জমা হবে না। অনলাইনে রিটার্ন জমার সফটওয়্যার এমনভাবেই সাজানো থাকবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আয়কর শাখার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের দেশে দুই ঈদ, পয়লা বৈশাখসহ বিভিন্ন উৎসব উদযাপন করা হয়। দুই ঈদ উদযাপনে সরকার থেকে বোনাস দেওয়া হয়। রিটার্নে উৎসব ব্যয়ের হিসাব জানানোর একটা ঘর আছে। এখানে কোরবানির পশু কিনতে কত খরচ হয় তা আগামীবার থেকে জানাতে হবে।
আগামী অর্থবছরের রাজস্ব বাজেট নিয়ে প্রণীত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেকে লাখ টাকা বা তার বেশি দামের পশু কোরবানি করে থাকেন। অনেকে কোরবানির পশু কিনতে আট/দশ/পঞ্চাশ লাখ টাকাও ব্যয় করেন। এসব হিসাব রিটার্নে উল্লেখ করেন না। আসছে অর্থবছর থেকে কোরবানির পশু কেনার মোটা অঙ্কের হিসাব রিটার্নে উল্লেখ না করলে তথ্য গোপন হিসেবে ধরা হবে।
গত ২২ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন জারি করে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দেশের সব তফসিলি ব্যাংক, মোবাইল ফোন অপারেটর এবং বেশ কিছু বহুজাতিক কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অন্যদেরও অনলাইনে রিটার্ন জমায় উৎসাহিত করা হয়েছে। এরই মধ্যে অনলাইনে প্রায় ১৭ লাখ রিটার্ন জমা পড়েছে।
আগামী অর্থবছরে সময়মতো রিটার্ন জমা না দিলে বেশ কিছু সেবা নিতে পারবেন না করদাতারা। কর অব্যাহতির সুবিধা পাবেন না, অর্থাৎ যেকোনো ধরনের কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত আয় করযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। করমুক্ত আয়ের সুবিধা পাবেন না। হ্রাসকৃত হারে কর প্রদানের সুবিধা পাবেন না। বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত সুবিধাও পাবেন না। অতিরিক্ত কর পরিশোধ করতে হবে। নির্ধারিত হারে জরিমানা দিতে হবে।
এতদিন ই-টিআইএন না থাকলে ৪০টির বেশি সেবা বা সুবিধা পাওয়া যেত না। আগামী অর্থবছর থেকে রিটার্ন না থাকলেও অনেক সেবা বা সুবিধা পাওয়া যাবে না। যেমন ট্রেড লাইসেন্স করতে পারবেন না। আয়কর জমা দেওয়ার তথ্য ভিসার জন্য প্রয়োজন হবে। করারোপযোগ্য আয় না থাকার পরও ২০ লাখ টাকার বেশি ঋণ গ্রহণ করতে হলে রিটার্ন দেখাতে হবে। আমদানি বা রপ্তানি করতে, সিটি করপোরেশন বা পৌর এলাকায় ট্রেড লাইসেন্সপ্রাপ্তি ও নবায়নে, সাধারণ বিমার তালিকাভুক্ত সার্ভেয়ার হতে এবং লাইসেন্সপ্রাপ্তি ও নবায়নে, চিকিৎসক, দন্তচিকিৎসক, আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট, প্রকৌশলী, স্থপতি অথবা সার্ভেয়ার বা সমজাতীয় পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃত পেশাজীবী সংস্থার সদস্যপদপ্রাপ্তি ও বহাল রাখতেও এখন থেকে রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হবে। গ্যাসের বাণিজ্যিক ও শিল্প সংযোগপ্রাপ্তি বহাল ও সিটি করপোরেশন এলাকায় আবাসিক গ্যাস সংযোগপ্রাপ্তি ও বহাল রাখতে এবং পরিবেশ অধিদপ্তর বা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ইট উৎপাদনের অনুমতিপ্রাপ্তি ও নবায়নেও রিটার্ন লাগবে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তির জন্য আগামী অর্থবছর থেকে রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হবে।