চা-বাগানের নাম লোভাছড়া। এ নামটি শুনলে চোখে ভেসে ওঠে জল-পাহাড়-সবুজ প্রকৃতি। পর্যটকদের বেড়ানোর জন্য লোভনীয় একটি স্পট। আছে শতবর্ষী ঝুলন্ত সেতু ও আদি কাঠামোর খড়ের বাংলো। এই বাগানে উৎপাদিত চায়ের নাম ফার্গুসনের ‘লোভা-চা’। এবারের আন্তর্জাতিক চা-দিবস সামনে রেখে কোনো বাণিজ্যিক প্রচার ছাড়াই হাতে হাতে সরবরাহ করা হচ্ছে লোভা-চা। উদ্দেশ্য ভারতীয় চোরাই চায়ের আগ্রাসন ঠেকানো।
জানা গেছে, ভোক্তা তথা ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করতে পারলে লোভা-চা সরাসরি বাগান থেকে বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহের কর্মযজ্ঞে নামবে লোভাছড়া চা-বাগান কর্তৃপক্ষ। এ যাত্রার প্রচারক যেন ভোক্তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলা হচ্ছে, ভারতের নিম্নমানের চায়ের ‘আগ্রাসন’ ঠেকাতে এল ফার্গুসনের ‘লোভা-চা’।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক চা-দিবস উদযাপনের রেওয়াজ খুব পুরোনো নয়। নতুনই বলা চলে। এর মধ্যে এবার দিনটি এগিয়ে আনা হয়েছে। ৪ জুনের পরিবর্তে আজ ২১ মে উদযাপন হবে দিনটি। এ দিনটি সামনে রেখে লোভাছড়া চা-বাগান কর্তৃপক্ষের প্রচার চলেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। তাতে দেখা গেছে, ১৮ মে চা-বাগানের মধ্যে একটি ৫০০ গ্রাম চা-পাতার প্যাকেট।
পরিবেশবান্ধব সাদা রঙের প্যাকেটটি চা-বাগানের মধ্যে রেখে গ্রাহকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। তিন দিনের মধ্যে গ্রাহক পর্যায়ে লোভা চায়ের প্যাকেট বিতরণ করা হয়। গ্রাহকরা পান করে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন।
লোভাছড়া চা-বাগানটির অবস্থান বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকার সিলেটের কানাইঘাট উপজেলায়। চা-বাগান দৃশ্যত দুটি ভাগে বিভক্ত। সীমান্তের ওপার থেকে নেমে আসা নুনছড়া (পাহাড়ি নালা) বাগানটিকে প্রাকৃতিকভাবে বিভক্ত করে রেখেছে। নুনছড়ার এই বিভাজন ঘোচাতে নির্মাণ করা হয় ঝুলন্ত সেতু। ১৯২৫ সালে নির্মিত সেতুটির বয়স শতবর্ষ পেরিয়েছে গেল এপ্রিল মাসে।
চা-বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে চা-বাগান রয়েছে ১৬৭টি। এর মধ্যে সিলেট বিভাগের তিন জেলায় রয়েছে ১৩৫টি। সুনামগঞ্জ জেলায় কোনো চা-বাগান নেই। উপমহাদেশের প্রথম চা-বাগান বা চায়ের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগানে। ব্রিটিশ টি-প্ল্যান্টার লর্ড হার্ডসন চা-বাগানটির সূচনা করেন। বলা হয়, উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন চা-বাগান মালনীছড়া। এরপর আসে লোভাছড়া নামটি। এই বাগান পরিচালনার দায়িত্বে ছিল ফার্গুসন পরিবার।

বাগান পরিচালনার দপ্তর থেকে জানা গেছে, ১ হাজার ৮৪০ একর আয়তনের চা-বাগানটির গোড়পত্তন হয়েছিল প্রায় দেড় শ বছর আগে। ১৮৭৪ সালে বাগানটি তৈরি হয়েছিল। তখন মালিক ছিল ‘মেসার্স স্টিল ম্যাকিনটোশ অ্যান্ড কোং’। ইন্ডিয়া-ব্রিটিশ-আসাম আমলের ‘টি টোকেন’ সংরক্ষিত রয়েছে বাগানটিতে। টোকেন অনুযায়ী বাগান তৈরির সাল ১৮৭৩। পরবর্তী সময়ে বাগানের মালিকানা বদল হয়ে যায় ‘অক্টোভিয়াস স্টিল অ্যান্ড কোং’-এর কাছে। এরপর বাগানের মালিকানা আবার পরিবর্তন হয়। বাগান কেনেন জেমস আর্থার ফার্গুসন। তিনি অকটোভিয়াস স্টিল অ্যান্ড কোম্পানিতেই চাকরি করতেন। যখন কোম্পানি ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার চিন্তা করে, তখন জেমস আর্থার ফার্গুসন তার পেনশনের টাকা দিয়ে বাগানটি কিনে নেন। তার মেয়ে জুন ফার্গুসন উপমহাদেশের প্রথম নারী টি-প্ল্যান্টার। পাশাপাশি তিনি ছিলেন লোভাছড়া চা-বাগানের ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার)। তৎকালীন ভারত ও পাকিস্তানে তিনিই ছিলেন কোনো চা-বাগানের প্রথম নারী ব্যবস্থাপক। তার ছেলে জেমস লিও ফার্গুসন ও তার ভাগনে ইউসুফ ওসমান উত্তরাধিকার মালিক হিসেবে বাগান পরিচালনা করছেন।
দেড় শতাব্দী পর কেন চা-পাতা বাজারজাত করার প্রয়াস? এ প্রশ্নের উত্তরে দুটি কারণকে সামনে আনেন ইউসুফ ওসমান। প্রথম কারণ হচ্ছে, চা-শিল্পে দৈন্য ঘোচানো ও সরাসরি চায়ের স্বাদ আস্বাদন। জুন ফার্গুসনের রক্তের ধারায় (মেয়ের সন্তান) দেশীয় চা-শিল্প অন্তঃপ্রাণ ইউসুফ ওসমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘পাতা রূপান্তরের কারখানা সব বাগানে নেই। লোভাছড়ায় সেই শুরু থেকে কারখানা রয়েছে। নিজস্ব কারখানায় অর্গানিক চা ভোক্তাদের পাতে তুলে দিতেই লোভা-চা বাজারজাত করার প্রাথমিক একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেহেতু আামাদের প্যাকেট ৫০০ গ্রামের, এটা আমাদের পরীক্ষামূলক প্যাকেট। যদি আমরা মার্কেট থেকে ভালো সাড়া পাই, তাহলে আমরা আস্তে আস্তে ছোট প্যাকেট আনব। আপাতত কিছু সুপার শপগুলোর সঙ্গে আমাদের কথা হচ্ছে। অনলাইনে টুকটাক অর্ডার হচ্ছে। খুব শিগগির সিলেট শহরকেন্দ্রিক একটি সেলস পয়েন্ট খোলা হবে। মার্কেট প্রতিক্রিয়া সরাসরি যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
দ্বিতীয় বিষয় সম্পর্কে তার ভাষ্য যেন সিলেট অঞ্চলের সব চা-শিল্পোদ্যোক্তাদের মনের কথা। চিনির মতোই ভারত থেকে নিম্নমানের চা চোরাচালান ক্রমে বাড়ছে। এসব চা দেশীয় কোম্পানির নামে ব্ল্যাক মার্কেট দখল করছে। তাতে দেশীয় চায়ের বাজার প্রায় ধ্বংসের পথে। চা-চোরাচালান ঠেকাতে সরাসরি বাগানের মানসম্পন্ন চা ভোক্তাদের পাতে তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি কাটাতে চাওয়া ইউসুফ ওসমান বলেন, ‘ভারতীয় চিনি যেভাবে চোরাই পথে এসে দেশি চিনিকলগুলোকে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে, ঠিক একইভাবে ভারতীয় নিম্নমানের চা দেশীয় ভালো চায়ের বাজার ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আমাদের উদ্যোগটি দেখে যদি বাগান মালিক-পরিচালক সরাসরি বাজারজাত করতে নামেন, তাহলে ভারতীয় চা-চোরাচালানির বিরুদ্ধে এটিই হবে জুতসই একটি পদক্ষেপ।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, সিলেট অঞ্চলের সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতীয় চোরাই চিনির রমরমা চোরাকারবার শুরু হয় ২০২৩ সালের শেষের দিকে। ২০২৪ সালের শুরুতে চোরাচালানিতে জড়িয়ে পড়ে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাও। খবরের কাগজে ধারাবাহিক অনুসন্ধানে একের পর এক চোরাই চিনি চক্র উন্মোচন হলেও চোরাই চিনির রুটে ভারতীয় পণ্য সামগ্রীর চোরাচালান অব্যাহত রয়েছে। চক্রটি সেই চিনির মতোই ভারতীয় চা-পাতা সরবরাহ করছে। তবে চিনির পথে ভারতীয় চায়ের চালানও ধরা পড়ছে বলে জানিয়েছে সিলেট জেলা ও সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেল।