চলতি অর্থবছর শেষ হতে বাকি আছে এক মাস ৮ দিন। এরই মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রেকর্ড রাজস্ব ঘাটতিতে পড়েছে। এনবিআর বিলুপ্তির অধ্যাদেশ জারিকে ঘিরে চলমান আন্দোলনের কারণে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি আরও বেড়েছে। ফলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা চলতি অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
এ ছাড়া করদাতা ও ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে বলেছেন, এনবিআর সংশ্লিষ্টদের কর্মবিরতির কারণে অনেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে পারেননি। ফলে নিয়মিত রাজস্ব পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি।
দেশের নিটওয়্যার পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আন্দোলনের কারণে অনেকে নিয়মিত রাজস্ব পরিশোধ করতে পারেননি। এতে রাজস্ব আদায়ে গতি কমেছে।’
সরকার শুরুতে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। পরে তা কমিয়ে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নামানো হয়। এই হিসাবে দৈনিক এনবিআরকে আদায় করতে হবে ১২ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। অথচ মে মাসের প্রথম ২২ দিন আদায় হয়েছে মাত্র ১১ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। এর আগের মাস পর্যন্ত এই ঘাটতি ছিল ৬৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা, অর্থাৎ এক মাসে ঘাটতি বেড়েছে ৫ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। এই ঘাটতি যোগ হয়ে দৈনিক আদায়ের পরিমাণ আরও বেড়েছে।
২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে এনবিআর কখনোই বাজেটে নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। বেশির ভাগ বছরেই রাজস্ব সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ কম হয়েছে। এভাবে রাজস্ব আদায়ের এই নেতিবাচক ধারা চলতে থাকলে চলতি অর্থবছরে ঘাটতি বেড়ে ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছেন আর্থনীতির বিশ্লেষকরা। এর আগে এত বড় অঙ্কের ঘাটতিতে এনবিআর পড়েনি।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, অর্থবছরের শেষ দুই মাস রাজস্ব আদায় আগের দশ মাসের তুলনায় কয়েকগুণ বাড়ে। এবারে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনের কারণে রাজস্ব আদায়ের গতি অনেক কম। এরই মধ্যে যে ঘাটতি হয়েছে তা পূরণ করা সম্ভব হবে না। ফলে এ বছরের ঘাটতি আগের অর্থবছরের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ার কথা।
সরকার অর্থসংকটে আছে। নিয়মিত খরচ চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে। উন্নয়ন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। বিদেশি সাহায্য ও অনুদানের অর্থ সংগ্রহে সরকার মরিয়া হয়ে উঠেছে। এক কথায় বলতে গেলে দেশের অর্থনীতি যখন চরম টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই এনবিআর বিলুপ্তি ও বিভক্তির সরকারি সিদ্ধান্তে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ। এর জেরে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কলমবিরতি, অবস্থান কর্মসূচি, অসহযোগ, প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি পেশের মতো কর্মসূচি পালন করেছেন।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন খবরের কাগজকে বলেন, ‘অর্থবছরের শুরু থেকে এনবিআরের আদায়ের ধারা থেকে আশঙ্কা করা হয়েছিল চলতি অর্থবছর শেষে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। আন্দোলন চলতে থাকলে এই ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। তিনি আরও বলেন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট এমন একটি সময়ে প্রণয়ন করা হচ্ছে যখন রাজস্ব প্রশাসনে এই অচলাবস্থা। এতে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও বাড়বে।
গতকাল এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের অপসারণসহ চার দফা দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ। চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে চরম অসহযোগিতার অভিযোগ এনেছে এই পরিষদ। গতকাল বিকেলে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় যান পরিষদের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। তারা প্রধান উপদেষ্টার এপিএস সাব্বির আহমেদের কাছে স্মারকলিপিটি হস্তান্তর করেন।
ঐক্য পরিষদের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন কর পরিদর্শক মুতাসিম বিল্লাহ, রাজস্ব কর্মকর্তা মো. শফিউল বসর, উপ-করকমিশনার শিহাবুল ইসলাম কুশল, অতিরিক্ত কর কমিশনার সেহেলা সিদ্দিকা এবং অতিরিক্ত কমিশনার (কাস্টমস) হাছান মুহম্মদ তারেক। স্মারকলিপিতে উত্থাপিত মূল দাবিগুলো হলো-
১. জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিলুপ্তির জারিকৃত অধ্যাদেশ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।
২. বর্তমান এনবিআর চেয়ারম্যানকে অপসারণ করতে হবে।
৩. রাজস্ব সংস্কারবিষয়ক পরামর্শক কমিটির সুপারিশ জনসাধারণের জন্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।
৪. সব অংশীজনের মতামত নিয়ে টেকসই রাজস্বব্যবস্থা সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।