ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড তখন সরগরম। বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর দাপট রাজধানী ঢাকায়। যাদের নামে এলাকাভিত্তিক আধিপত্য ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ হতো। এমনকি অপরাধ জগতে অস্থিরতা শুরু হলে রক্তক্ষয়ী সংঘাত হতো। লাশ পড়তো একের পর এক। বলছি, সেই নব্বইয়ের দশকের কথা। ঠিক ওই সময়টায় যে কয়েকজন ভয়ংকর সন্ত্রাসীর আবির্ভাব ঘটেছিল বা ব্যাপক আলোচিত যারা, তাদেরই অন্যতম একজন- সুব্রত বাইন। যিনি কি না মগবাজারের ঐতিহ্যবাহী ‘চাংপাই রেস্টুরেন্টের’ কর্মচারী ছিলেন। সেই চাংপাই কর্মচারীই একপর্যায়ে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী হয়ে উঠেছিলেন। পরিণত হন অপরাধ জগতের প্রভাবশালী মাফিয়ায়। যার বিরুদ্ধে অন্তত ৩০টি হত্যাসহ শতাধিক মামলা হয়েছিল।
গতকাল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শ্বাসরুদ্ধকর এক অভিযানে কুষ্টিয়া থেকে সুব্রত বাইন ও অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদসহ চারজনেক গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরপরই মূলত ব্যাপক আলোচনায় এসেছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ। যদিও বেশি আলোচিত ও প্রভাবশালী হিসেবে বিবেচিত হন সুব্রত বাইন। আর সেটাই হয়তো স্বাভাবিক। কেননা, সুব্রত বাইনের হাত ধরেই অপরাধ জগতে প্রবেশ করেছিলেন মোল্লা মাসুদ। বলতে গেলে তারা দুজন ‘গুরু-শিষ্য’।
মঙ্গলবারও (২৭ মে) ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটের রেড নোটিশে সুব্রত বাইন ওরফে ত্রিমতি নামে তার ছবি দেখা যায়। যেখানে বয়স দেখানো হয়েছে ৫৬ বছর।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড কাঁপানো সুব্রত বাইন ছিলেন কথিত ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপের প্রধান। ২০০১ সালের ২৫ ডিসেম্বর তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকারের আমলে যে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল- তাদের অন্যতম ছিলেন সুব্রত বাইন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ১৯৬৭ সালে জন্ম নেওয়া এই শীর্ষ সন্ত্রাসীর পুরো নাম- ত্রিমতি সুব্রত বাইন। তার বাবা বিপুল বাইন ছিলেন একটি এনজিওর গাড়িচালক। গ্রামের বাড়ি বরিশালের আগৈলঝড়া থানাধীন জোবারপাড়ে। সুব্রতর শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল বরিশালের একটি খ্রিষ্টান মিশনারি স্কুলে। সেখানে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করার পর ঢাকায় চলে আসেন। ওই সময় সুব্রত বাইন তার মা কুমুলিনি আর তিন বোন মেরি, চেরি ও পরীকে নিয়ে ঢাকার মগবাজারে সপরিবারে ভাড়া বাসায় থাকতেন তারা। পরে ঢাকার শেরেবাংলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। কিন্তু এরপর আর পড়াশোনা হয়নি তার।
মগবাজারের সেই সময়ের নামকরা ‘চাংপাই চায়নিজ রেস্টুরেন্টে’ কর্মচারীর চাকরি নেন তিনি। সেখান থেকেই একপর্যায়ে অন্ধকার জগতে পা বাড়ান সুব্রত বাইন। কিছুদিনের মধ্যেই মগবাজারে গড়ে তোলেন নিজের সন্ত্রাসী বাহিনী, যার নাম দেন ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপ।
১৯৯৩ সালের দিকে মগবাজারের মধুবাগে এক সবজিবিক্রেতা খুন হলে পুলিশের তালিকায় তার নাম ওঠে। কিছুদিন পর মগবাজারের বিশাল সেন্টার নির্মাণের সময় চাঁদাবাজি নিয়ে রীতিমতো ভয়ংকর গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় সে সময়ের গণমাধ্যমের শিরোনামে চলে আসে সুব্রত বাইনের নাম।
মগবাজারের মধুবাগ মাঠে একবার তার জন্মদিনের উৎসব আয়োজন করা হয়। এই উৎসবে ওই সময়ের অনেক রাজনৈতিক নেতা হাজির হলে সুব্রত বাইনের নাম ও প্রভাব আরও ছড়িয়ে পড়ে।
অভিযোগ আছে, ওই সময় মগবাজার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতেন যুবলীগের লিয়াকত। তার কাছ থেকে ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে বিএনপিপন্থিরা সুব্রতকে সমর্থন দেন বলেও শোনা যায়। এরপর ১৯৯৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ট্রিপল মার্ডারে নেতৃত্ব দেন সুব্রত বাইন। এরপর মগবাজারের রফিক, সিদ্ধেশ্বরীর খোকনসহ বেশ কয়েকজন তার হাতে খুন হন। এভাবে খুব অল্প সময়ে রাজধানীর দক্ষিণাংশের অপরাধ জগতের একটি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে সুব্রত বাইনের হাতে। তার বিরুদ্ধে সে সময় কমপক্ষে ৩০টি হত্যা মামলা হয়। এর মধ্যে ১৯৯১ সালে আগারগাঁওয়ে জাসদ ছাত্রলীগের নেতা মুরাদ খুনের ঘটনায় তার যাবজ্জীবন সাজা হয়।
নিজের স্ত্রীকে প্রেমিকের সঙ্গে বিয়ে দেন সুব্রত বাইন
জানা যায়, ১৯৯৭ সালে নয়াপল্টন এলাকার একটি হাসপাতাল থেকে সুব্রত বাইনকে গ্রেপ্তার করেছিল গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এতে বছর দেড়েক কারাগারে ছিলেন তিনি। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে সুব্রতের স্ত্রী লুসি তার গ্রুপেরই এক সদস্যের প্রেমে পড়েন। জেল থেকে বেরিয়ে ঘটনা জানার পর সুব্রত নিজেই লুসিকে সেই যুবকের সঙ্গে বিয়ে দেন। এই ঘটনাটি সেই সময়ে ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল। লুসি ও সুব্রতর দুই সন্তান ছিল। পরে ১৯৯৯ সালে কুমিল্লায় বিউটি নামের এক নারীকে বিয়ে করেন সুব্রত। তবে বিয়ের কয়েক বছর পর বিউটির সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। পারিবারিক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মাঝেও আন্ডারওয়ার্ল্ডে বেশ দাপটের সঙ্গে অবস্থান গড়েছিলেন সুব্রত বাইন। তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০১ সালের ২৫ ডিসেম্বর ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করে এবং তাদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে। সেই তালিকায় প্রথম নামই ছিল- সুব্রত বাইনের। এরপর আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলে তাকে গ্রেপ্তারে নোটিশ জারি করে।
এরপর সুব্রত বাইন ঢাকা ছেড়ে চলে যান। ঘাঁটি গাড়েন কলকাতায়। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার জামেলা নামে এক নারীকে বিয়ে করেন। সেই ঘরেও একটি মেয়ে আছে বলে জানা যায়। ভারতে গিয়ে সেখানে জমি কিনে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য যাবতীয় নথিপত্র তৈরি করেন সুব্রত। কিন্তু তার আগেই অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে ২০০৮ সালে কলকাতা পুলিশ তাকে আটক করে। এরপর কিছুদিন জেল খেটে জামিন পেয়ে চলে যান দুবাই। একপর্যায়ে আবার কলকাতায় ফিরে এক নায়িকার কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন সুব্রত বাইন। এ ঘটনায় কলকাতা পুলিশ বিশেষ অভিযান শুরু করলে সুব্রত নেপালের সীমান্ত শহর কাঁকরভিটায় ঢুকে পড়েন। তবে সেখানেও নেপালি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হতে হয় তাকে। পরে তাকে পূর্ব নেপালের ভাদ্রপুর এবং পরে ঝুমকা কারাগারে নেওয়া হয়। ২০১২ সালের ৮ নভেম্বর সেই কারাগারে ৭৭ ফুট লম্বা সুড়ঙ্গ কেটে পালিয়ে যান দুর্ধর্ষ এই সন্ত্রাসী। ওই সময় সুব্রত বাইনসহ মোট ১০ জন কারাবন্দি পালিয়ে গিয়েছিলেন। জেল ভেঙে পালানো এই সব অপরাধী কারাগারের ভেতর টুপি তৈরির কাজ করত এবং রাতের অন্ধকারে মাটি কেটে এই সুড়ঙ্গ তৈরি করেছিল। বাঁশ কাটার চাকু দিয়ে মাটি কেটে ২০ ইঞ্চি চওড়া ও ২২ ইঞ্চি উচ্চতার এ সুড়ঙ্গটি তৈরি করা হয়েছিল। সেখান থেকে ফের কলকাতায় ঢুকলে সুব্রতকে বউবাজার এলাকা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে বলে খবর শোনা যায়। তারপর সুব্রত কোথায় ছিলেন সেটা নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা রয়েছে।
অপরদিকে মোল্লা মাসুদ রাজধানীর মতিঝিল ও গোপীবাগ এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতেন। সুব্রত বাইনের হাত ধরেই মোল্লা মাসুদ অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়েন। ২০০১ সালের শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় মোল্লা মাসুদেরও নাম ছিল। তবে ২০০৩ সালের পরে তাকে আর বাংলাদেশে দেখা যায়নি বলে জানান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।
তবে সূত্রগুলো জানিয়েছে, ভারতে তিনি আবু রাসেল মো. মাসুদ নামে পরিচিত হন। ভারতীয় নাগরিক রিজিয়া সুলতানাকে বিয়ে করে সেখানে বসবাস করছিলেন। মোল্লা মাসুদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা আছে, তার মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য কামাল মজুমদারের ভাগনে মামুন হত্যা, পুরান ঢাকায় মুরগি মিলন হত্যা, খিলগাঁওয়ের তিলপাপাড়ায় ট্রিপল মার্ডার মামলা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে অসংখ্য জিডি আছে। মোল্লা মাসুদ ২০১৫ সালে ভারতে ধরা পড়েন বলে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। পরে তিনি জামিনে মুক্ত হন এবং ভারতেই অবস্থান করেন বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।