আসন্ন বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ কমানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে চলতি অর্থবছরের তুলনায়। ফলে মানসম্মত শিক্ষা কীভাবে নিশ্চিত হবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্টজনদের মধ্যে। যেখানে উন্নত দেশগুলোতে বাজেটে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, সেখানে বাংলাদেশে শিক্ষায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া হয় না। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর অভিমত, শিক্ষায় জিডিপির ৫-৬ শতাংশ বা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া দরকার।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী খবরের কাগজকে বলেন, শিক্ষায় যা বরাদ্দ দেওয়া হয় তা অবকাঠামো নির্মাণ ও শিক্ষকদের বেতনে বেশি ব্যয় হয়। মান বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ নেই। এটা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। আশা করছিলাম, অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ বাড়াবে। দক্ষ জনশক্তির কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা। কিন্তু আমরা সেখানে যদি বিনিয়োগ না করি, তাহলে মানসম্মত শিক্ষা কীভাবে নিশ্চিত হবে? তিনি বলেন, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জনবল সংকট রয়েছে, দক্ষ প্রশিক্ষক নেই। আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। আমাদের দুই দিকে দৃষ্টি দেওয়া দরকার। প্রথম হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা, যেটা সব শিক্ষার ভিত্তি। দ্বিতীয়ত দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি। অন্যথায় পিছিয়ে যাব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক শিক্ষাবিদ ড. ছিদ্দিকুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের জন্য শিক্ষায় যথেষ্ট বরাদ্দ দরকার। মানসম্পন্ন শিক্ষকরাই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারবেন। সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিক্ষায় বরাদ্দ ছিল ৯৪ হাজার ৭১১ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ছিল ৩৮ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা। আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগ; মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জন্য ৪৪ হাজার ১০৯ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের জন্য ১১ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা। শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতসহ সর্বমোট বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ১১ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ। তবে জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) তুলনায় শিক্ষায় বরাদ্দ প্রতিবছর কমছে। যেখানে ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে শিক্ষায় বরাদ্দ ছিল ২ দশমিক ৮ শতাংশ, সেখানে চলতি অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
অর্থ মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্টরা জানান, এবার শিক্ষায় বরাদ্দ গতবারের চেয়ে ৩ থেকে ৪ ভাগ কম প্রস্তাব করা হচ্ছে। সে হিসাবে আনুমানিক ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা কম বরাদ্দ দেওয়া হতে পারে।
শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য প্রতিবছরই বলে আসছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা। কিন্তু সেসব আমলে নেওয়া হয় না। গত মার্চে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য প্রাক-বাজেট আলোচনার আয়োজন করে গণসাক্ষরতা অভিযান। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে আসন্ন বাজেটে শিক্ষা খাতে ১৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষা খাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ হয় বাংলাদেশে। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৭টি বিষয়ের মধ্যে একটি মানসম্মত শিক্ষা। যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে গুণগত শিক্ষার কথা বলা হয়েছে।
গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত না হওয়ায় বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমেই নিম্নমুখী বা অবস্থান তলানিতে। ২০২৪ সালে গ্লোবাল এডুকেশন ইনডেক্সের করা তালিকায় ১৪১ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১৩তম। এ ছাড়া দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান ৫০০-এর নিচে। এশিয়ার শীর্ষ দশেও নেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকা দরকার, তার অনেকটাই অনুপস্থিত দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। নেই পর্যাপ্ত গবেষণাগার আর ল্যাব সুবিধা।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার মান বৃদ্ধি করতে হলে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পাঠদানে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার, আধুনিক সিলেবাস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ উন্নয়ন, স্মার্ট সমৃদ্ধ শিক্ষা উপকরণ এবং গ্রহণযোগ্য মূল্যায়ন ব্যবস্থা আবশ্যক। এসব বাস্তবায়ন করতেই পর্যাপ্ত বরাদ্দ দরকার।
মানসম্মত শিক্ষা কীভাবে নিশ্চিত করা যায় তা নিয়ে অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের জন্য সর্বপ্রথম মানসম্পন্ন শিক্ষক দরকার। শিক্ষক দক্ষ হলে শিক্ষার্থীরাও মানসম্মত হয়ে গড়ে উঠবে। শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য ২০১২ সালে দেশে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়। কিন্তু আমাদের সেই মানের সৃজনশীল শিক্ষক নেই। এ জন্য গাইড থেকে প্রশ্ন করা হয়। ক্লাসরুমেই শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল করে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাক্রম যুগোপযোগী করতে হবে।’
শিক্ষক নিয়োগে তিনটা যোগ্যতার সম্মিলন থাকতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রথমত, শিক্ষকতা করার ব্রত থাকতে হবে। অন্য কোথাও চাকরি না পেয়ে শিক্ষকতায় এসেছেন সে রকম না। দ্বিতীয়ত, প্রজ্ঞা থাকতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যথেষ্ট দক্ষ হয়ে উঠতে হবে। তৃতীয়ত, মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন হতে হবে।
দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করার উপায় নিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা পদ্ধতি বদলাতে হবে। তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শিক্ষকতায় আকৃষ্ট হওয়ার জন্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে।