বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়রের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার দাবিতে গত ১৪ মে থেকে আন্দোলন করছেন তার সমর্থকরা। ইশরাক ইস্যুতে এর মধ্যে আদালত, নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবং সরকারও (স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়) প্রাসঙ্গিক হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ইস্যুতে এর মধ্যে চতুর্মুখী ভুল হয়েছে। এই চার পক্ষকেই যার যার জায়গা থেকে তা স্বীকার করে ভুল শোধরাতে হবে।
এই প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ গতকাল মঙ্গলবার খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই ইস্যুতে আদালত, নির্বাচন কমিশন, সরকার এবং ইশরাক- এই চার পক্ষই ভুল করেছে।’
প্রথমত আদালত। আদালতের ভুল নিয়ে কেউ কথা বলছেন না, আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি। এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ২০২০ সালে সময়মতোই মামলা করেছিলেন ইশরাক হোসেন। কিন্তু আদালত কেন মামলাটি তখন তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করলেন না? বিচার বিভাগের উচিত হবে তা খতিয়ে দেখা। খতিয়ে দেখে তা আমাদের জানাতে হবে বলছি না, কিন্তু তাদের নিজেদের বোঝার জন্যে তা দেখতে হবে। তখন কোন বিচারক দায়িত্বে ছিলেন তা তাদের দেখা দরকার।
এত বছর পর ২০২৫ সালে এসে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল মামলাটি নিষ্পত্তি করে একটা রায় দিয়েছেন। এই রায়টি সঠিক হয়েছে কি না, এটিও বিচার বিভাগকে দেখতে হবে।
এরপর এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে গেজেট প্রকাশের আগে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছিল নির্বাচন কমিশন। কিন্তু সরকারের আইন মন্ত্রণালয় কেন মতামত দেয়নি?
তারপর নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করেছে। সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় গেজেট অনুসারে শপথ পড়াল না কেন? শপথ পড়ালে কী সমস্যা হতো? তাকে শপথ পড়িয়ে দিলে মেয়াদের যে কদিন বাকি আছে, ওই সময় ইশরাক হোসেন মেয়র থাকতেন, অসুবিধা কোথায়?
এদিকে শপথ না পড়ানোয় ইশরাক হোসেন গিয়ে রাস্তায় বসে পড়লেন, এটাও তো শোভন হয়নি। তাকে মেয়র ঘোষণা করে আদালত আদেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু তাকে শপথ পড়ানো হচ্ছে না। তাহলে উনি আবার আদালতে যেতে পারতেন। আদালত অবমাননার অভিযোগে মামলা করতে পারতেন তিনি। কিন্তু তিনি তা করলেন না! এটা তো ওনার ক্যারিয়ারের জন্যও খারাপ হলো। রাজনীতি সব সময় নগ্নভাবে করতে হয় না।
এদিকে ইশরাক হোসেনের দাবি, রাজনৈতিক কারণেই তাকে শপথ পড়ানো হয়নি। বিষয়টি মনে করিয়ে দিলে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আমি তো বলেছি, সব পক্ষকেই যার যার ভুলগুলো বুঝতে হবে। চতুর্মুখী ভুল হয়েছে, সবাইকে যার যার ভুল বুঝতে হবে।’
ইশরাকের আইনজীবী এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘সরকারের উপদেষ্টা (স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া) শপথ নিয়েছেন রাগ-অনুরাগের ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু তিনি তো রাগ-অনুরাগের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি বলেই ইশরাক হোসেনকে শপথ পড়াননি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শপথ পড়াতে বলা হয়েছে, কিন্তু তিনি তা পড়াননি। এমন নয় যে, ইশরাক হোসেন শপথ পড়তে চাননি বা নেননি। এ কারণেই উপদেষ্টার রাগ-অনুরাগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।’
এদিকে গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান কার্যালয় নগর ভবনে এসে বক্তব্য দেন ইশরাক হোসেন। বক্তব্যে তিনি অসত্য ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য গণমাধ্যমে উপস্থাপনের জন্য স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা পদে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বহাল থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন বলে মত দেন। সজীব ভূঁইয়া শপথ ভঙ্গ করেছেন- এমন অভিযোগ তুলে উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করেছেন ইশরাক।
এদিন দুপুর ১টার দিকে ইশরাক নগর ভবনের একটি মিলনায়তনে সংস্থাটির প্রায় ৭০টি ওয়ার্ডের সচিবদের নিয়ে বৈঠক করেন।
বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বয়সে খুবই তরুণ। সামনে তাকে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। কাজেই জনগণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ, আদালতের রায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন তার কাছ থেকে কাম্য। অসত্য তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা তার কাজ নয়। কারণ, এত অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করে যেসব জনগণ তাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি, তাদের তিনি বিভ্রান্ত করতে পারেন না।’
তিনি বলেন, নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল আগের গেজেট বাতিল করে ইশরাক হোসেনকে মেয়র হিসেবে গেজেট প্রকাশের জন্য নির্বাচন কমিশন সচিবালয়কে নির্দেশ দিয়েছে। এই নির্দেশ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন ১০ দিনের মধ্যে ২৭ এপ্রিল সংশোধিত গেজেট প্রকাশ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠিয়ে দিয়েছে। এই সংশোধিত গেজেট পেয়ে শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন ছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগের কিছুই করণীয় নেই বলেন ইশরাক।
গত সোমবার স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, শপথ গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনাধীন থাকা অবস্থায় গেজেটের মেয়াদ শেষ হওয়ায় শপথ পড়ানো যায়নি। এই বক্তব্য উল্লেখ করে ইশরাক বলেন, ‘এ কথা সত্য হলে ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি আর শপথ পড়ার সুযোগ পাবেন না।’