বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও সরকার নিয়মিত নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ, উৎপাদককে পরিশোধে বাধ্য থাকবে। বিগত সরকারের সময়ে করা চুক্তিটি বর্তমান সরকার সংস্কারের অংশ হিসেবে বাতিল করেছে। সংস্কারের ফলে নতুন বিধানে, উৎপাদনের পরিমাণ অনুযায়ী বিল পরিশোধ করে থাকে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে গত ১৫ জুন পর্যন্ত সরকারের সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যলয়ের তৈরি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব জানা যায়। অন্তর্বর্তী সরকার গত সাড়ে ১০ মাসে রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে এক গুচ্ছ সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এসব সংস্কার যখন যে সরকার দায়িত্বে থাকবে তখন সে মেনে চলবে। এতে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
জ্বালানি, রেল, নির্বাচনিব্যবস্থা, বিচার, বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং অভিবাসী, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, শ্রম ব্যবস্থাপনা, সামাজিক সুরক্ষা খাতে সংস্কার আনা হয়েছে।
ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা অধ্যাদেশ, গোপনীয়তা এবং তথ্য সুরক্ষা সম্পর্কিত নতুন আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশেও সংস্কার আনা হয়েছে।
জনপ্রশাসন খাতে সংস্কারের অংশ হিসেবে ই-প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) পোর্টাল বাধ্যতামূলক ব্যবহারে জোর দেওয়া হয়েছে। এতে প্রকল্পের ব্যয়ে স্বচ্ছতা আসবে বলেও বলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট ১৯৭৩ এ সংশোধনী আনা হয়েছে। সংস্কারের অংশ হিসেবে সন্ত্রাসী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করতে দলীয় নিবন্ধন বাতিল এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা বা যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত রাজনৈতিক দলকেও নিষিদ্ধ করার বিধান আনা হয়েছে সংস্কারের অংশ হিসেবে।
বিনিয়োগ ও ব্যবসা গতিশীল করতে বিশেষ আদালত গঠন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫০ লাখ টাকার বাণিজ্যিক বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশে বিশেষায়িত বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
রাজস্ব খাতে সংস্কারের অংশ হিসেবে রাজস্ব নীতি এবং রাজস্ব প্রশাসন বিভাগ আলাদা করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়। রাজস্ব আদায় বাড়াতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তবে এ অধ্যাদেশ ঘিরে আন্দোলন শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হবে।
বিভিন্ন অধ্যাদেশ সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাংক খাতে সংস্কার আনা হয়েছে। এতে ব্যাংকিং খাতে আর্থিকসংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
এতে বাংলাদেশ ব্যাংক রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন, বেসরকারি এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানসহ ব্যর্থ ব্যাংকগুলোর অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হবে।
সম্পদ ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং অর্থমন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে চার সদস্যের একটি টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিকে সহায়তা করতে ১০ সদস্যের ‘আইন বিশেষজ্ঞ দল’ গঠন করা হয়েছে।
সাইবার সিকিউরিটি আইনটি সংশোধন করা হয়েছে। এটা সাইবার-অপরাধ এবং হুমকি শনাক্ত করা ও প্রতিরোধ করতে সহায়তা করবে।
ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা অধ্যাদেশ, গোপনীয়তা এবং তথ্য সুরক্ষা সম্পর্কিত নতুন আইন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধন আনা হয়েছে।
এতে নারী ও শিশু সুরক্ষা বাড়বে। সংশোধনীতে ধর্ষণের শাস্তি ও ধর্ষণের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়। যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নে জোর দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা বিলের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ সংশোধন করতে কাজ করছে।
শিক্ষার সব স্তরে নতুন পাঠ্যপুস্তক আনা হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণে জোর দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এক বছর থেকে কমিয়ে ছয় মাস করা হয়েছে। সুষ্ঠু শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যমান চার বছরের অনার্স প্রোগ্রামকে তিন বছরের একাডেমিক কোর্স পুনর্গঠন করা, তারপরে প্রযুক্তিগত শিক্ষার ওপর দৃষ্টি দেওয়া হয়।
বৃত্তিমূলক শিক্ষার জন্য ই-লার্নিং বিকাশে জোর দেওয়া হয়েছে।
আগামী অর্থবছরের জন্য সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। পেনশন, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার সমন্বয় করা হয়েছে, কৃষি ভর্তুকিতে জোর দেওয়া হয়েছে।
শ্রম ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের লেবার ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলআইএমএস) ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গঠন করা হয়েছে। ফলে কারখানার সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ, শ্রমিকদের সঞ্চয় বাড়াতে কাজ করা হবে। মজুরি উপার্জনকারী কল্যাণ বোর্ড আইন ২০১৮ তে সংশোধনী আনা হয়েছে। অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং অভিবাসীদের বিধি সংশোধন করা হয়েছে।
জ্বালানি খাতের সংস্কারের অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ বাতিল করা হয়েছে। বিগত সরকারের সময়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে হব। সংস্কারের অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত বাতিল করে সরাসরি বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ে খাতে সংস্কারের অংশ হিসেবে দুই বছরের রেলওয়ে সংস্কার পরিকল্পনার আওতায় স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যেমন: বিভিন্ন রুটে ট্রেন ও কোচ সংখ্যা পুনর্বিন্যাস, গতি বৃদ্ধি, দুর্ঘটনায় জরুরি সহায়তার জন্য কুইক রেসপন্স টিম গঠন, এবং সেবা পর্যবেক্ষণের জন্য মনিটরিং সেল চালু। এ খাতের জন্য দুই বছর মেয়াদি সংস্কারের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি সংস্কারও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। স্বল্পমেয়াদি সংস্কারের মধ্যে বিভিন্ন রুটে ট্রেন এবং কোচের সংখ্যা সমন্বয় করা হয়েছে। পরিষেবার মানের তদারকি করার জন্য ‘মনিটরিং সেল’ গঠন করা হয়েছে।
নির্বাচনি সংস্কারের অংশ হিসেবে জাতীয় সংসদের আসন সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে স্বল্পমেয়াদি কারিগরি সংস্কার করা হয়েছে। ১৯৭২ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৯১সি ধারা সংশোধন করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের স্বীকৃতি প্রদানের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হবে। আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য স্বল্পমেয়াদি প্রযুক্তিগত সংস্কার করা হচ্ছে।
বিচার খাতের সংস্কারের অংশ হিসেবে স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ সংশোধন করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতির সভাপতিত্বে একটি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আরও গতিশীল করা হচ্ছে। প্রধান বিচারপতির সভাপতিত্বে স্বায়ত্তশাসিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব, নিম্ন আদালতের প্রশাসনের ওপর দ্বৈত কার্যনির্বাহী-বিচারিক নিয়ন্ত্রণের অবসান করতে সংস্কার করা হচ্ছে। বিচার বিভাগের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠায় জোর দেওয়া হয়েছে।
সংস্কারের অংশ হিসেবে সন্ত্রাসী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করতে দলীয় নিবন্ধন বাতিল করতে এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা বা যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত রাজনৈতিক দলকেও নিষিদ্ধ করা হবে।