দায়িত্ব পালনে ছিলেন নিষ্ঠাবান। অনৈতিকতাকে কাছে ভিড়তে দেননি। ভয়ভীতি উপেক্ষা করে সততাকেই পাথেয় করেছিলেন। কিন্তু প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের রোষানলে পড়ে চাকরিচ্যুত হন। তিনি হলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আলোচিত চাকরিচ্যুত উপসহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিন।
তিন বছর আইনি লড়াই চালিয়ে অবশেষে জয় পেয়েছেন তিনি। তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করতে দুদককে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। শুধু চাকরি ফেরত নয়, রায় পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে বকেয়া বেতন-ভাতা, সব সুযোগ-সুবিধাসহ চাকরিতে পুনর্বহাল করতে বলা হয়েছে। রায়ে তার চাকরিচ্যুতির আদেশকে প্রথম থেকে বাতিল (ভয়েড অব ইনিশিও) ঘোষণা করা হয়েছে। যেন বিষয়টি এমন প্রতীয়মান হয় যে তাকে কখনো চাকরিচ্যুত করা হননি। ধরে নেওয়া হবে, তিনি সব সময় চাকরিতেই বহাল ছিলেন।
তার দায়ের করা রিটের নিষ্পত্তি করে বুধবার (৯ জুলাই) এই রায় দেন হাইকোর্টের বিচারপতি রেজাউল হাসান ও বিচারপতি বিশ্বজিৎ দেবনাথের বেঞ্চ।
শুনানিতে শরীফ উদ্দিনের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার সালাহউদ্দিন দোলন। দুদকের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট আসিফ হাসান।
রায়ের পর সালাহউদ্দিন দোলন সাংবাদিকদের বলেন, ‘শরীফ উদ্দিনের চাকরিচ্যুতির আদেশ অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। রায়ে ৩০ দিনের মধ্যে জ্যেষ্ঠতা, সব সুযোগ-সুবিধাসহ তাকে চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
দুদকের আইনজীবী আসিফ হাসান বলেন, ‘রায়ের বিষয়টি দুদককে জানানো হবে। আপিল করা হবে কি না, সে বিষয়ে দুদক সিদ্ধান্ত নেবে।’
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় শরীফ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘তিন বছরের আইনি লড়াই শেষে হাইকোর্ট থেকে ন্যায়বিচার পেয়েছি। ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান না হলে হয়তো এই ন্যায়বিচার পেতাম না। চাকরি হারানোর পর অনেক কষ্টে জীবনযাপন করেছি। এখন সব দুঃখ-কষ্ট মুছে গেল। আর কোনো দুঃখ নেই।’
কক্সবাজারে ৭২টি প্রকল্পে সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকার ভূমি অধিগ্রহণে দুর্নীতি, রোহিঙ্গাদের এনআইডি ও পাসপোর্ট জালিয়াতি, কর্ণফুলী গ্যাসে অনিয়মসহ বেশ কিছু বড় দুর্নীতির ঘটনায় ২০২১ সালে মামলা ও তদন্ত করেছেন বহুল আলোচিত দুদকের উপসহকারী কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিন। এতেই তিনি প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়েন। প্রভাবশালীদের অনৈতিক প্রস্তাব, হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছিলেন। একপর্যায়ে প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের প্রকাশ্য হুমকির প্রেক্ষাপটে ২০২২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের খুলশী থানায় জিডি করেন তিনি। এই জিডি করার ১৬ দিনের মাথায় ১৭ ফেব্রুয়ারি কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই তাকে চাকরিচ্যুত করে কমিশন। কমিশনের পক্ষ থেকে চাকরিচ্যুতির সুনির্দিষ্ট কারণ বলা না হলেও দুদক কর্মচারী বিধিমালার ৫৪(২) ধারা অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কারণ দর্শানো নোটিশ ছাড়াই সরাসরি চাকরিচ্যুত করা যায় বলে গণমাধ্যমকে জানানো হয়।
আকস্মিক এই চাকরিচ্যুতির ঘটনায় বিস্মিত হন তার সহকর্মীরা। তাকে পুনর্বহালের দাবিতে দুদকের প্রধান কার্যালয়সহ দেশের কয়েকটি জেলা কার্যালয়ের সামনে প্রথমবারের মতো মানববন্ধন করেন দুদকের কর্মকর্তারা। কর্মকর্তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় গঠন করা হয় দুদক সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (ডুসা)। এর পরও কোনো সুরাহা হয়নি। তবে হাল ছাড়েননি শরীফ উদ্দিন। চাকরিচ্যুতির আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ওই বছরের ১৭ মার্চ হাইকোর্টে রিট করেন। রিটের শুনানি নিয়ে ২০২৪ সালে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। রুলের শুনানি শেষে গতকাল রায় ঘোষণা করা হলো।
চাকরিচ্যুতির পরও বিভাগীয় মামলা
শরীফ উদ্দিনকে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই ২০২২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি চাকরিচ্যুত করার পর বিভাগীয় মামলায় হাজিরা দিতে তাকে নোটিশ দেয় দুদক। নোটিশ পেয়ে ওই বছরের ১ মার্চ তিনি রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজিরা দেন। পরে অবশ্য বিভাগীয় মামলাগুলো স্থগিত করে কমিশন।
টিআইবিও এই চাকরিচ্যুতির প্রশ্ন তুলেছিল
শরীফ উদ্দিনের চাকরিচ্যুতি নিয়ে সংস্থার ভেতর ও বাইরে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কারণে ‘ধোঁয়াশা’ দূর করার আহ্বান জানিয়েছিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ওই সময় টিআইবির বিবৃতিতে বলা হয়, ‘শরীফ উদ্দিন চট্টগ্রামে কর্মরত অবস্থায় দক্ষতা ও সাহসের সঙ্গে কক্সবাজারে ভূমি অধিগ্রহণে বিশাল অঙ্কের দুর্নীতি, রোহিঙ্গা নাগরিকদের এনআইডি ও পাসপোর্ট জালিয়াতি, কর্ণফুলী গ্যাসে অনিয়মসহ বেশ কিছু আলোচিত দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ও মামলা পরিচালনায় মূল ভূমিকায় ছিলেন। এসব অভিযান ও মামলায় সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মধ্যে যাদের বিরাগভাজন হচ্ছিলেন এই কর্মকর্তা, তাদের চাপের কারণেই কি শরীফ উদ্দিনকে চট্টগ্রাম থেকে পটুয়াখালী বদলি করা এবং সর্বশেষ চাকরিচ্যুত করা হয়েছে- এমন প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠেছে। দুদককে এ বিষয়টি স্পস্ট করতে হবে। দুদকের কাছ থেকে এ প্রশ্নের উত্তর জানার অধিকার জনগণের রয়েছে।