তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে সুন্দরবনের নদী-খালে জাল টানেন বাসন্তী মুন্ডা। চোখের সামনেই বদলে যেতে দেখেছেন সবকিছু। এখন আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। বিষ দিয়ে চলে সর্বনাশা মাছ শিকার। একবার বিষ দিলে কয়েক মাসে রেণুপোনা মেলে না। হতাশা নিয়ে এসব বলছিলেন নোনাজলের এই প্রান্তিক নারী।
সুন্দরবন থেকে মধু সংগ্রহ করেই সংসার চলে মৌয়াল আবু মুসার। আগে বনে ঢুকলেই কিনার ঘেঁষে গাছে গাছে মধুর চাক পাওয়া যেত। এখন ঢুকতে হয় আরও গভীরে। বন-নদী কোনোটিই আগের মতো নেই, কমে গেছে মধু, মাছ সবকিছুই।
বন গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, উজানে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়া ও পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপের অভাবে ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। নদীভাঙনে কমছে বনের আয়তন। থেমে নেই বাঘ-হরিণ শিকারও। কমার্শিয়াল ট্যুরিজম, প্লাস্টিক দূষণসহ মনুষ্যসৃষ্ট ঝুঁকিও ক্রমাগত বাড়ছে।
এমন প্রেক্ষাপটে আজ শনিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব ম্যানগ্রোভ বা শ্বাসমূলীয় বন দিবস। জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা বা ইউনেসকোর উদ্যোগে ২০১৬ সাল থেকে প্রতিবছর ২৬ জুলাই দিনটি পালিত হয়। ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেমসের টেকসই সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে সচেতনতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ইউনেসকো দিনটিকে বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
বন, জলাভূমি, সামুদ্রিক ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের সমন্বয়ে নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় সুন্দরবন। জোয়ারের সময় শ্বাসমূলের সাহায্যে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ শ্বসনকাজ চালায়। সুন্দরবনের শ্বাসমূলীয় গাছগুলোর মধ্যে সুন্দরী, গেওয়া, গরান, পশুর, বাইন, হেঁতাল, গোলপাতা, লতা সুন্দরী, কেওড়া, ধুন্দুল, আমুর, ছৈলা, ওড়া, কাঁকড়া, খলশি উল্লেখযোগ্য; যা জোয়ার-ভাটার লোনা পানিতে টিকে থাকার জন্য অভিযোজিত। বিশ্বের ৪৮ প্রজাতির শ্বাসমূলীয় বৃক্ষের মধ্যে সুন্দরবনে রয়েছে ১৯টি।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ১০০ বছরে বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবন হারিয়েছে ২৫২ বর্গকিলোমিটার বনভূমি। গবেষণা অনুযায়ী, পশ্চিম সুন্দরবনে খুলনার কয়রা অঞ্চলে দুই দশকে (২০০০-২০) বনের ঘনত্ব কমেছে প্রায় অর্ধেক। প্রথম দশকে ব্যাপক হারে ঘন বন উজাড় হয়ে কমতে থাকে বনের বিস্তার। পরবর্তী দশকে প্রায় দ্বিগুণ হারে খালি বা পতিত জমির পরিমাণ বেড়েছে। ক্ষত-বিক্ষত সুন্দরবনে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে ভিন্ন ভিন্ন চেহারা। কোথাও লবণাক্ততার ক্রমবর্ধমান মাত্রা বনের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে। আবার কোথাও বিষের প্রভাবে প্রজনন ব্যাহত হয় জলজপ্রাণীর। বনের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় শিল্প স্থাপনও বন্ধ হয়নি।
বিপন্ন বনাঞ্চলে অস্তিত্বসংকট
মিঠা ও লবণ পানির মিশ্রণেই সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু উজানে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় আরও লবণাক্ততা বেড়েছে। এতে সুন্দরবনে নতুন গাছ জন্মানো এবং বেড়ে ওঠা ব্যাহত হচ্ছে।
সুন্দরবন সুরক্ষা কমিটি, সাতক্ষীরার সদস্যসচিব আহসানুর রহমান রাজীব বলেন, ‘জোয়ারে লবণাক্ত পানি বনের গভীরে ঢুকে পড়ে। বড় গাছ ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে, নতুন গাছ জন্ম নিলেও মাটির শক্তি ফুরিয়ে যাওয়ায় বাঁচতে পারছে না। ২০০৭ সালের সিডরের পর থেকে মান্দারবাড়িয়া চরে গাছ মরা শুরু হয়েছে, ধীরে ধীরে কমেছে চরের আয়তনও।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) ফজলুল হক বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনের আয়তন ও জীববৈচিত্র্য হ্রাস পাচ্ছে। মিঠাপানির অভাব ও লবণাক্ততার ক্রমবর্ধমান মাত্রা গাছপালা বন্য প্রাণীর অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে।’
বিষ দিয়ে মাছ শিকারের ক্ষতি ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদি বলে মনে করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বিভাগীয় সদস্য মো. সবুর রানা। বিষের প্রভাবে একদিকে মাছের প্রজনন কমেছে, তেমনি জলজপ্রাণীসহ বাঘ, মায়াবী হরিণ, বানর, পশুপাখির জীবনচক্রও ব্যাহত হচ্ছে।
বনে রাতেও নৌযান, সংকটাপন্ন এলাকায় শিল্প স্থাপনা
সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত নৌপথে এক যুগে নৌযান চলাচল বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। বিআইডব্লিউটিএর প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, রাতের বেলায় ম্যানগ্রোভ বনের ভেতর দিয়ে নৌযান চলাচল করার কথা না থাকলেও তা উপেক্ষা করা হচ্ছে।
সুন্দরবনের আশপাশে শিল্প স্থাপন নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সরকার সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটার প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় নতুন শিল্প স্থাপন নিষিদ্ধ করেছে। তবে ইতোমধ্যে এই এলাকায় বেশ কিছু শিল্প-কারখানা নির্মিত হয়েছে বা নির্মাণাধীন রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) খুলনা শাখার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মো. বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘ইউনেসকোর আপত্তির পরও রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন রয়েছে। তেলবাহী জাহাজডুবির ঘটনার পর সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে অবৈধ নৌপথ নিয়েও আপত্তি রয়েছে।’
সুন্দরবন একাডেমির পরিচালক ফারুক আহমেদ বলেন, ‘বনের অভ্যন্তরে নৌপথ ব্যবহার করে প্রতি মাসে কয়েক শ পণ্যবাহী লাইটার জাহাজ চলছে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে অবাধ যাতায়াতের কারণে শব্দদূষণে বনের স্বাভাবিক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি হয়। এতে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হবে, এটাই স্বাভাবিক। সুন্দরবনে ২২ বছরে ২৫ বার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।’
বিশ্বঐতিহ্যকে রক্ষায় প্রয়োজন টেকসই ব্যবস্থাপনা
জীববৈচিত্র্য ও ম্যানগ্রোভ বনের বাস্তুসংস্থানের টেকসই পথনকশা নির্ধারণ দরকার উল্লেখ করে সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, ‘সুন্দরবনে পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় বন বিভাগ, মৎস্য বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আলাদা সংস্থা রয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন সংস্থার দায়িত্বে থাকায় শেষ পর্যন্ত কেউই সঠিকভাবে বন রক্ষায় কাজ করতে পারে না।’
বন উজাড় বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও সচেতনতা বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘টেকসই বন ব্যবস্থাপনায় উজান থেকে নদীর স্বাভাবিক মিষ্টি পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি উদ্যোগ, স্থানীয় সচেতনতা ও বৈশ্বিক সহযোগিতায় বিশ্বঐতিহ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ টেকসই পদক্ষেপ নিতে হবে।’
বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেছেন, ‘শুধু দিবসকেন্দ্রিক উদযাপন নয়, বিশ্বঐতিহ্যের সুন্দরবনকে টিকিয়ে রাখতে কার্যকরী নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।’
সম্প্রতি সুন্দরবনসংলগ্ন মালঞ্চ নদীর চরে লিডার্স ও ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ যৌথভাবে ১ একর ৪৪ শতক জমিতে নতুন ম্যানগ্রোভ বনায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। লিডার্স নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মণ্ডল বলেন, ‘এ ধরনের টেকসই বনায়ন উপকূলীয় বাঁধকে রক্ষা করবে এবং মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’