আয় বাড়াতে সরকারের নিত্যনতুন কৌশল সত্ত্বেও রাজস্ব আহরণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতির খবর পাওয়া যাচ্ছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য সীমিত থাকায় রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
অর্থনীতির বিশ্লেষক ও শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দেশে আশানুরূপ শিল্প-বিনিয়োগ হচ্ছে না। ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরের পর সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে সবচেয়ে কম বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে। এডিপিতে গতি নেই। অর্থনীতিতে গতি না বাড়লে রাজস্ব আদায় বাড়বে না। নির্বাচিত সরকার ছাড়া অর্থনীতিতে গতি আসবে না বলেও তারা মন্তব্য করেছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিভিন্ন বন্দর থেকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে নির্দেশ দিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চেয়ারম্যান দেশের বন্দরগুলোতে পর্যায়ক্রমে পরিদর্শন শুরু করেছেন। এরই মধ্যে মোংলা, বেনাপোলসহ বিভিন্ন বন্দর পরিদর্শন করেছেন। বিভিন্ন বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে গতি আনার ওপর জোর দিয়েছেন। সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, তাও পর্যবেক্ষণ করেছেন।
আমদানি করা পণ্য খালাসে এখনো পাঁচ দিন থেকে শুরু করে ১০ দিন বা তারও বেশি সময় লাগছে।
এনবিআরের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান শুল্ক-সম্পর্কিত কার্যক্রম সম্পন্ন করে এক দিনের মধ্যে পণ্য খালাসের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলসহ (সিআইসি) সব গোয়েন্দা ইউনিটকে বৈঠক করে কাজে গতি আনার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এনবিআর সূত্র নিশ্চিত করেছে, অর্থবছরের প্রথম মাসেই রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) ভাইস চেয়ারম্যান ড. মোস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘বিগত সরকারের সময় থেকেই শিল্প-বিনিয়োগে গতি আসছে না। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও এসব খাতে আশানুরূপ গতি আসেনি।
ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি ভালো না। যুক্তরাষ্ট্র উচ্চহারের শুল্ক আরোপ করেছে, যা অনেক দেশ কমাতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশ এখনো পারেনি। বাড়তি শুল্ক এরই মধ্যে অনেক দেশ কমিয়ে নিয়েছে। অথচ আমাদের সরকার এ বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কিছু করতে পারেনি। ভারতের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে টানাপোড়েন চলছে। শিল্প-কারখানা গড়ে না উঠলে, বিনিয়োগ না হলে বা ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে না পারলে রাজস্ব পরিশোধ করবেন কীভাবে? সরকার রাজস্ব আদায় বাড়াতে যত কৌশলই নিক না কেন, বাড়বে কীভাবে?’
এই বিশ্লেষক বলেন, নির্বাচিত সরকার ছাড়া আর্থনীতিতে গতি আনা কঠিন। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য হবে। দেশ-বিদেশের বিনিয়োগকারীরা সেই সরকারের ওপর আস্থা রাখবে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-বিনিয়োগে গতি আসবে। সরকারের আয় বাড়বে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, সরকারের আয় বাড়াতে হলে অর্থনীতিতে গতি আনতে হবে। ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তারা আয় করতে না পারলে সুফল পাওয়া যাবে না। সরকারের আর্থিক সংকট কাটছে না। বিদেশি ঋণ ও সহায়তার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
শিল্প খাতের অনেকে বলেছেন, ব্যবসায়ীদের অনেকে এখন ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই ব্যবসায়ীদের অনেকেই শিল্প-বাণিজ্য ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিলেন। এমনকি মাঝারি মানের ব্যবসায়ীদের অনেকেই হয়রানির আশঙ্কায় দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এতে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে, কাজ হারাবেন অনেকেই।
অন্যদিকে ডলারের দাম কমছে না। ভ্যাটের উচ্চহারের কারণে ব্যবসায়ে খরচ বেড়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর হয়নি। করপোরেট করহারের চাপ কমেনি। শিল্প-বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন না অনেকে। ফলে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি বাড়ছে না।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এতে সরকারের রাজস্ব আহরণেও বড় চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক জটিল সমীকরণ। আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের কম্পেটিটিভনেস কমে যাচ্ছে। এ থেকে উত্তরণে সরকারকে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করতে হবে, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং দক্ষ উপদেষ্টারা থাকবেন, যারা মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো বুঝে সমাধান দেবেন। তবে সর্বোপরি নির্বাচিত সরকার ছাড়া ব্যবসায়িক আস্থা ফিরবে না- এটাই দীর্ঘ মেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান খবরের কাগজকে বলেন, ব্যবসা-বিনিয়োগে আস্থাহীনতা রয়েছে। উৎপাদন, সরবরাহ ও বিপণনে ধীরগতি চলছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সবাই উদ্বেগে। ব্যবসা প্রসার ও নতুন বিনিয়োগ নিয়ে নির্বাচিত সরকারের জন্য অনেকে অপেক্ষা করছেন।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু খবরের কাগজকে বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে। বড় ব্যবসায়ীরা অনেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য রেখে পালিয়েছেন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এটা তো স্বাভাবিক। এ ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফেরাতে হবে। শিল্প-বিনিয়োগ ও ব্যবসায় আগ্রহী হলে সরকারের আয় নিশ্চিতভাবে বাড়বে।
এনবিআরের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান খবরের কাগজকে বলেন, সরকারের আয় বাড়াতে কর ফাঁকি রোধ, নন-কমপ্লায়েন্ট করদাতাদের নোটিশ দিয়ে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের জন্য মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য সীমিত থাকায় রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ ছাড়া আমদানি কমে যাওয়ায় অগ্রিম আয়কর আদায়ও কমেছে। রাজস্ব আদায়ে বড় অবদান রাখে ভ্যাট খাত। আমদানি, স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন, সরবরাহ, জোগানদার পর্যায় পর্যন্ত এই খাতের বিস্তৃতি। এর সর্বশেষ ধাপ ক্রেতা বা ভোক্তা। আমদানি, উৎপাদন, সরবরাহের পাশাপাশি উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে এই খাত বড় ধাক্কা খেয়েছে। ব্যাংকে টাকা রাখার ওপর আবগারি শুল্ক আদায় করে এনবিআর। তবে উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে ব্যাংকে গচ্ছিত টাকার পরিমাণ কমায় আবগারি শুল্কেও পড়েছে এর প্রভাব। ভোগ কমে যাওয়ায় কমেছে উৎপাদনও। শিল্প কাঁচামাল ও পণ্য আমদানি কমে যাওয়ায় আমদানি শুল্ক আদায়ে ঘাটতি দেখা গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আমদানি সহজে বাড়বে না।