চারদিকে সবুজ শস্যক্ষেত। মাঝখানে একটু উঁচু ভিটায় টিনশেডের একটি বাড়ি। গাছপালা ও ফসলি মাঠের মাঝে এমন একটি বাড়ি দেখে মনে হবে, সাধারণ কোনো কৃষক বা স্বল্প আয়ের মানুষের বসতভিটা। কিন্তু না, এটি কোনো সাধারণ বাড়ি নয়। কেননা, বাড়িটির চারপাশের বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে ১৫ থেকে ২০টি সিসি (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরা। পাশাপাশি রয়েছে সশরীরে পাহারার ব্যবস্থাও।
কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তের খুব কাছে এমন প্রত্যন্ত এলাকায় টিনশেডের বাড়িটি ঘিরে কেন এত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা, এমন প্রশ্নের অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাড়িটি মূলত বিরাট একটি সিন্ডিকেটের মাদকের গুদাম বা আস্তানা হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থা স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিশেষ তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করেছে। পাশাপাশি বাড়িটি সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় নজরদারি বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
স্থানীয় সূত্র ও গোয়েন্দাদের তথ্যমতে, কেবল উত্তরাঞ্চলের রৌমারীতে নয়, মরণ নেশা ইয়াবা ও আইসের রাজ্য হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারের টেকনাফ অঞ্চলেও চলছে একই কায়দায় মাদকের কারবার। চিহ্নিত মাদক কারবারিরা বিশাল ‘নেটওয়ার্ক’ গড়ে তুলে মাদকের কারবারে আধিপত্য বাড়াচ্ছে। বাসাবাড়ি বা আস্তানার চারপাশে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, সোর্স মোতায়েন ও পাহারার মাধ্যমে ইয়াবার চোরাচালান আনা-নেওয়া করছে চক্রের সদস্যরা।
প্রত্যন্ত জনপদে এখন মাদকের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এবং আস্তানা গড়ে ওঠায় নতুন করে ভাবতে হচ্ছে গোয়েন্দাদের। কারণ, উত্তরের সীমান্ত এলাকাগুলো দিয়ে সাধারণত ফেনসিডিল, গরু, মসলাসহ বিভিন্ন পণ্য চোরাচালানের কথা শোনা গেলেও এখন সেই ধারা কিছুটা পাল্টে যাচ্ছে। সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় সাধারণ মানের বাসাবাড়ি মাদকের গুদাম বা আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
গোয়েন্দাদের তথ্যমতে, ভারত থেকে ফেনসিডিল, হেরোইনসহ নেশাজাতীয় পণ্য সীমান্ত দিয়ে সুকৌশলে পাচারের পর ওই সব বাড়িতে মজুত করা হচ্ছে। এরপর সুযোগ মতো তা দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। একইভাবে মায়ানমার থেকে যেসব ইয়াবা বা ক্রিস্টাল মেথ (আইস) বাংলাদেশে ঢুকছে, সেগুলোও কয়েক হাত ঘুরে ভারতে পাচারের জন্য উত্তরাঞ্চলের ওই ধরনের আস্তানায় রাখা হচ্ছে। বলতে গেলে ওই সব আস্তানা ট্রানজিট হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, নিবিড় মনিটরিংয়ের মাধ্যমে মাদক চক্রের এই কারবার চলে। যখনই সন্দেহজনক কারও (সংস্থা বা বাহিনীর) আনাগোনা টের পায়, তখনই আগাম খবরে তারা মাদক বা অবৈধ সবকিছু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে ফেলে। এরপরও গোয়েন্দারা এরই মধ্যে রৌমারী সীমান্তে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী জাহের উদ্দিন ফকিরের বাড়ি, তথা মাদকের একটি আস্তানা শনাক্ত করেছেন। রৌমারী থেকে নদীপথ ব্যবহার করে জামালপুর-শেরপুর রুট ব্যবহার করে ঢাকায় মাদকের চালান সরবরাহ করা হয়। এই জাহেরের বিরুদ্ধে ঢাকা, জামালপুর, শেরপুর, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন থানায় মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দারা।
দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, রৌমারী এলাকার সীমান্ত পিলার ১০৬৩/২-এস থেকে আনুমানিক ৫০ গজ ভেতরে মাদক ব্যবসায়ী জাহের উদ্দিনের টিনশেডের বাড়ি। ওই বাড়ি থেকে সব ধরনের অবৈধ মাদক কারবার পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। মাদক কারবার নির্বিঘ্নে চালাতে বাড়ির চারপাশে ১৫ থেকে ২০টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে কিছু ক্যামেরা সীমান্তের দিকে মুখ করে স্থাপন করা হয়েছে যাতে করে বাড়ি থেকেই ৫০ গজ দূরের সীমান্ত এলাকা পর্যবেক্ষণ করা যায়। ওই বাড়িতে মনিটরিং প্যানেল বসিয়ে ফুটেজ পর্যালোচনা করে অবৈধ মালামাল ভারত থেকে আনা-নেওয়ার কাজ চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি চক্রের সদস্যদেরও দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, প্রশাসনের অভিযান ঠেকাতে জাহের তার বাড়ির চারপাশে সিসি ক্যামেরা বসিয়েছেন। এতে করে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কারও আসার আগেই সংবাদ পেয়ে তিনি পালিয়ে যান। জাহেরকে ধরতে ওই আস্তানায় একাধিকবার অভিযান চালিয়েও রৌমারী থানা-পুলিশ ব্যর্থ হয়েছে।
ওই অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ৩৫ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান এ প্রসঙ্গে খবরের কাগজকে বলেন, ‘সীমান্তের কাছাকাছি সিসি ক্যামেরা দিয়ে মাদক কারবারের ওই তথ্য আমাদের কাছেও রয়েছে। ওই মাদক কারবারিকে আমাদের নজরদারির মধ্যে রেখেছি।’
তিনি বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় একশ্রেণির মানুষ আছে, যারা মাদকসহ নানা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। অনেক সময় তারা বড় সিন্ডিকেট বা নেটওয়ার্ক গড়ে এসব অপকর্ম চালানোর চেষ্টা করে থাকে। বিজিবি সীমান্ত এলাকায় এসব বিষয়ে সব সময় সজাগ দৃষ্টি রেখে কাজ করে যাচ্ছে।’
এদিকে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া এবং বান্দরবানের ঘুমধুম অঞ্চলের সীমান্তসহ সাগরপথে প্রতিনিয়ত বড় বড় ইয়াবার চালান ঢুকছে বাংলাদেশে। গত ১৯ আগস্ট নাফ নদীতে অভিযান চালিয়ে ১ লাখ পিস ইয়াবা জব্দ করে বিজিবি। তার আগে ১৪ আগস্ট উখিয়ার কাঁটাখাল সীমান্ত এলাকায় বিজিবির অভিযানে ৪ লাখ ৮০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়। এভাবে মাঝেমধ্যে বড় ধরনের মাদকের চালান আটক হচ্ছে সীমান্তের এই এলাকায়।
স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, টেকনাফের হ্নীলা ইউপির আলীখালী এলাকার হারুন (কিছুদিন আগে যৌথ বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার), রঙ্গীখালীর শাহ আজম, মৌলভীবাজারের মরিচ্যাঘোনা এলাকার ফয়সাল প্রকাশ, চৌড়ঙ্গবাড়ির ফয়সাল, হ্নীলার সাইফুল প্রকাশ ওরফে আতর সাইফুল, হ্নীলা পশ্চিম সিকদার পাড়ার মোস্তাক প্রকাশ ওরফে ডিবি মোস্তাক ওরফে সোর্স মোস্তাক, লেদার জাহাঙ্গীর ও বোরহান, পালংখালী বটতলী এলাকার আবুল ফয়েজ এবং হ্নীলা ইউপির ফুলের ডেইল এলাকার আবু তালেবের বিরুদ্ধে সিসি ক্যামেরা, সোর্স বা পাহারাদার বসিয়ে ইয়াবার কারবার চালানোর জোরালো অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা অনেকেই এসব তৎপরতা দেখলেও চক্রের ভয়ে প্রকাশে মুখ খোলেন না। এসব মাদক কারবারি বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে একাধিকবার গ্রেপ্তারও হয়েছেন। কিন্তু কিছু দিন পরে জামিনে বেরিয়েই তারা ফের সক্রিয় হন মাদক কারবারে।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, বর্তমানে চিহ্নিত মাদক কারবারিদের অনেকেই ছোট-বড় নেটওয়ার্ক গড়ে ইয়াবার তৎপরতা চালাচ্ছে। এই কাজে তারা রাস্তার মোড়ে মোড়ে পাহারাদার বসিয়ে রেখেছেন। নিজ বাড়ি বা আস্তানায় যাওয়ার সড়কে একাধিক ‘স্পিড ব্রেকার’ বসিয়েছেন, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গাড়ি নিয়ে দ্রুত পৌঁছাতে না পারে। পাশাপাশি স্থানীয়দের আতঙ্কে রাখতে তারা সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ গড়ে তুলেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. সাইফউদ্দিন শাহীন খবরের কাগজকে বলেন, ‘পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থা মাদকের বিরুদ্ধে সার্বক্ষণিক মনিটরিং এবং অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। মাদকের প্রশ্নে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। জিরো টলারেন্স নীতিতে পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করছে।’