একসময় রাজধানীর একমাত্র বিনোদন কেন্দ্র ছিল শাহবাগের শিশুপার্ক। একে আকর্ষণীয় করতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। তবে প্রকল্পের কাজ দুই বছর আগে শুরু হলেও কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র আড়াই শতাংশ, যা সন্তোষজনক নয়। এখনো বেড়া দিয়ে আটকানো পুরো প্রকল্প এলাকা।
এই হচ্ছে শাহবাগের শিশুপার্ক তথা হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী শিশুপার্ক আধুনিকীকরণ প্রকল্পের বাস্তব চিত্র। ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন- কবে বেড়ামুক্ত হবে এই বিনোদন কেন্দ্রটি। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী জুন মাসে। কিন্তু কাজ বাকি রয়েছে সাড়ে ৯৭ শতাংশ। সময় আছে মাত্র ৯ মাস। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদন ও সরেজমিন ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।
পরিকল্পনা কমিশন ও আইএমইডির প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীবাসীর জন্য বিনোদন সেবা বাড়ানোর লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়। এতে খরচ ধরা হয়েছিল ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা। বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছিল তিন বছরে অর্থাৎ ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। ১৭টি প্যাকেজে করা হচ্ছে এ প্রকল্পের কাজ। এসব প্যাকেজের চুক্তিতে সই করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস। চুক্তিমূল্য অনুযায়ী আগামী ১২ মে এসব প্যাকেজের কাজ শেষ করার কথা।
প্রায় ২৯ কোটি টাকা খরচ ধরা হয়েছে অফিস বিল্ডিং নির্মাণ কাজের। গত জুলাই পর্যন্ত খরচ হয়েছে প্রায় সাত কোটি টাকা বা ২৩ শতাংশ। বাউন্ডারি ওয়াল, ওয়াকওয়ে নির্মাণে ২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণে ২৭১টি কলামের মধ্যে ৭৫টির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এতে খরচ হয়েছে ২ শতাংশ।
ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড ড্রেনেজ ফ্যাসিলিটিজ চুক্তিমূল্যও ধরা হয়েছে প্রায় ২৬ কোটি টাকা। যার মেয়াদ আগামী ১২ মে শেষ হবে। এ পর্যন্ত প্যাকেজটির বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৪ শতাংশ। পুকুর নির্মাণ এবং ওয়াটার চ্যানেল প্যাকেজের চুক্তিমূল্যও ২৬ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এর বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ১৫ শতাংশ।
প্যাকেজ-৫-এর আওতায় সৌন্দর্যবর্ধন ও প্রয়োজনীয় ইন্টেরিয়র কাজের চুক্তিমূল্য ধরা হয় প্রায় ৩০ কোটি টাকা। যার মেয়াদ আগামী ১২ মে শেষ হবে। কিন্তু এর অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৪ শতাংশ। এভাবে বিভিন্ন কাজে গত জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পের মোট খরচ হয়েছে ১৫ কোটি ১১ লাখ টাকা বা ২ দশমিক ৫ শতাংশ।
আইএমইডির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পের কাজ দেখভাল করার জন্য প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) ৯টি সভা করার কথা। কিন্তু হয়েছে মাত্র একটি। এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) ৯টি সভা করার কথা। হয়েছে মাত্র ৫টি। এভাবে পিএসসি ও পিআইসি কম হওয়ায় কাজের গতিও বাড়েনি। ডিজাইন ও ড্রয়িং অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে না।
গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শিশুপার্কের চারদিক টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা। পূবালী ব্যাংকের গেটের সামনে দেখা যায়, প্রবাসী রাশেদুল ইসলাম তার স্ত্রী ও দুটি বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। গেট দিয়ে উঁকি মেরে দেখেন ভেতরে ফাঁকা। কোনো রাইড নেই। ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘রাজধানীর একমাত্র বিনোদনের জায়গাটি এভাবে বেড়া দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। কবে খুলবে? আবার কখন আসব দেখতে পাব তো?’ এ সময় আরও কয়েকজন দর্শনার্থী ভেতরে উঁকিঝুঁকি মারেন। দেখেন ভেতরে ফাঁকা। পার্কসংলগ্ন ফুটপাতের দোকানদাররা জানিয়েছেন, প্রতিদিন অনেক শিশু ও অভিভাবক পার্কের গেট পর্যন্ত এসে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
তাদের কথার সত্যতা যাচাই করতে ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন প্যাকেজের আওতায় রাজমিস্ত্রিরা কাজ করছেন। কবে শেষ হবে তারা কিছুই জানাতে পারেননি। তবে দেখা গেছে পুকুরের নিচের টাইলসের কাজ শেষ হয়েছে। ভেতরে পানি জমে আছে, রাইডের ভিত্তির চিহ্নগুলোই কেবল দৃশ্যমান।
পরিদর্শন শেষে আইএমইডি কিছু ব্যাপারে সুপারিশ করেছে। সেগুলো হচ্ছে যেসব সংস্থা কাজের সঙ্গে জড়িত তাদের সঙ্গে একটি আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠনের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিভিন্ন প্যাকেজের ঠিকাদারের কাজের গতিশীলতা অব্যাহত রাখতে সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে। যেসব প্যাকেজের টেন্ডার এখনো আহ্বান করা হয়নি, তার ডিজাইন কনসালটেন্টের মাধ্যমে প্রস্তুত করতে হবে। অনুমোদিত মেয়াদে প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ হবে না। কাজেই কাজ অসমাপ্ত রেখে প্রকল্প সমাপ্ত শেষ করা যায় অথবা মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। অনুমোদিত ডিপিপির স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সংস্থানকৃত ইক্যুইপমেন্ট বা রাইডস কেনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব রাইড কেনা এবং আমদানির সময় আইএমইডির প্রতিনিধিকে আবশ্যিকভাবে রাখতে হবে। প্রকল্পের খরচের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বছরভিত্তিক অডিট কার্যক্রম সম্পাদন করতে হবে।
ডিএসসিসির তথ্যমতে, ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে শাহবাগে ১৫ একর জায়গার ওপর শহিদ জিয়া শিশুপার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। পার্কটি তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। ২০২১ সালের ৩০ ডিসেম্বর ডিএসসিসির ১১তম বোর্ড সভায় শহিদ জিয়া শিশুপার্কের নাম ‘হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী শিশুপার্ক করা হয়। ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রীয় শিশুপার্কটি আধুনিকায়নের উদ্দেশ্যে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (যান্ত্রিক সার্কেল) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে প্রকল্পের কাজে গতি বাড়েনি। প্রকল্প এলাকার মধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া শাহবাগ থানার ডাম্পিং স্টেশন থাকায় কাজের বিঘ্ন ঘটছে। তা সরানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মিটিং হয়েছে। ফুল মার্কেটও সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘গত মাস পর্যন্ত সাড়ে তিন শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। সব প্যাকেজের সিভিল কাজ চলমান। গড়ে ৩৫ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। সব কাজ শেষ করার জন্য এক বছর সময় বাড়ানো হবে। আশা করি, এই সময়ে হয়ে যাবে। কারণ ৬০৪ কোটি টাকার মধ্যে ৪৪১ কোটি টাকায় বিভিন্ন রাইডের ইক্যুইপমেন্ট কেনা হবে।’
এ ব্যাপারে আইএমইডির সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব এ বি এম শওকত ইকবাল শাহীন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঠিকাদাররা সিটি করপোরেশনের এ প্রকল্পে ঠিকমতো কাজ করেননি। কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করলে আরও অগ্রগতি হতো।’