বুধবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বেলা ১টা ৫০ মিনিট। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত বিজয় সরণি সিগনাল। কিছু সময় দাঁড়িয়ে দেখা গেল- ট্রাফিক সিগনাল মেনে চলাচল করছে বেশির ভাগ যানবাহন। অন্যদিকে সড়কের আইন বা নিয়মের কোনো তোয়াক্কা করছিলেন না পথচারীরা। ঝুঁকিপূর্ণ সত্ত্বেও এলোপাতাড়ি রাস্তা পারাপার বা চলাচল করতে দেখা যায় বেশির ভাগ পথচারীকে।
শুধু বিজয় সরণি মোড় নয়, গতকাল দিনভর রাজধানীর উত্তরা, বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর ও শাহবাগ এলাকায়ও প্রায় অভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। পুলিশের ট্রাফিক বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা আরও জানান, বর্তমানে রাজধানীর সড়কের ৭০টি পয়েন্টে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক সিস্টেম অটোমেশন প্রক্রিয়ায় চালানো হচ্ছে। সিগনাল সিস্টেমের অটোমেশনের ফলে সিগনালের সময় নির্দিষ্ট ও নির্ভুল হওয়ায় পথচারী এবং যানবাহনের চালকরা পূর্বানুমান করতে পারেন। সড়ক পারাপারের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্যতার অনুভব করতে পারেন। এর ফলে যানবাহনগুলো নির্দিষ্ট সময় পর সিগনাল পার হয়ে যাবে, যা একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করে।
একই সঙ্গে ডিজিটাল ও ভিডিও মামলা করা হচ্ছে। বর্তমান সময়ে সড়কে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের দায়ে যানবাহন বা চালকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য আপাতত যানবাহন চলাচলে বা ট্রাফিক সিগনালে আগের তুলনায় কিছুটা হলেও শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। তবে পথচারীদের বিষয়ে ট্রাফিক পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা খবরের কাগজকে বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ট্রাফিক সিস্টেম অটোমেশন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও বেশি প্রচার-প্রচারণার প্রয়োজন রয়েছে। সেই কাজটি করা হচ্ছে। আইন অমান্যের দায়ে মামলা করা হচ্ছে। ট্রাফিক সিস্টেম অটোমেশন প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন হলে রাজধানীতে যানজট কমার পাশাপাশি ট্রাফিক আইন ভঙ্গের প্রবণতাও অনেকাংশে কমে যাবে।
সরেজমিন দেখা যায়, উত্তরার আজমপুর সড়কে ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও পথচারীরা ঝুঁকিপূর্ণভাবে সড়ক পারাপার করছিলেন। এদিকে বনানী মোড়ে সড়কের মাঝে বন্ধ করে একমুখী সড়ক করা হলেও মাঝের ব্যারিকেড সরিয়ে তৈরি করা সামান্য ফাঁকা অংশ দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পথচারীরা সড়ক পারাপার হচ্ছিলেন। বাংলামোটর মোড় ও শাহবাগেও ছিল একই চিত্র।
দুপুরে বিজয় সরণি মোড়ে ট্রাফিক সিস্টেম অটোমেশন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সড়কে যানবাহন চলাচল করতে দেখা যায়। এই মোড়ে অনেকটা শৃঙ্খলভাবে যানবাহন চলছিল। দেখা যায়, ফার্মগেট থেকে জাহাঙ্গীর গেটমুখী ও বিপরীত পাশে সিগনাল দুটি চলছিল। এদিকে মিরপুর থেকে ফার্মগেটমুখী সিগনালটি ধরা ছিল। অন্যদিকে তেজগাঁও লাভ রোড হয়ে র্যাংগস ফ্লাইওভার দিয়ে বিজয় সরণিমুখে যানবাহন চলছিল। তবে এই পথে চলাচলকারী যানবাহনগুলোর মধ্যে গতি থাকতে দেখা গেছে।
কোনো জটলা বা যানজট চোখে পড়েনি। তেজগাঁও লাভ রোড থেকে র্যাংগস ফ্লাইওভার হয়ে বিজয় সরণি পর্যন্ত যেতে এখন দুটি সিগনালে দাঁড়াতে হয় না। লাভ রোড মোড় থেকে সাতরাস্তার দিকে কিছুটা গিয়ে রয়েছে একটি ইউটার্ন। এরপর র্যাংগস ফ্লাইওভারে উঠতে যানবাহনগুলো চলে যাচ্ছে ফার্মগেটের দিকে। তেজগাঁও থানার একটু সামনে রয়েছে আরও একটি ইউটার্ন। সেটি ঘুরে মহাখালীর দিকে চলে যাচ্ছে যানবাহন। ঠিক এদিকে ফার্মগেট থেকে তেজগাঁওমুখী যানবাহনগুলো সরাসরি একটি সিগনাল পার হয়ে র্যাংগস ফ্লাইওভার দিয়ে চলে যাচ্ছে লাভ রোডে। এই মোড়ে চারটি সিগনালের মধ্যে একটি বন্ধ করে দেওয়ায় যানবাহনের গতি অনেক বেড়ে গেছে।
বিজয় সরণি ট্রাফিক পুলিশ বক্সে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট মো. জোবায়ের খবরের কাগজকে বলেন, ‘তেজগাঁও এলাকায় বুধবার দুপুরে সড়ক অবরোধ ও আন্দোলনের জন্য ঘণ্টাখানেক সময় ট্রাফিক সিস্টেম অটোমেশন বন্ধ রাখা হয়েছিল। এ সময় সড়কে ম্যানুয়ালি সিগনাল নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘চালকদের কাছে আমরা ভালো সাড়া পাচ্ছি। যানবাহন চালকদের বেশির ভাগই নিয়ম মেনে চলছেন। যদিও কিছু যানবাহন চালক আইন অমান্য করছেন। তবে এটি সম্পূর্ণভাবে চালু হলে সবাই ট্রাফিক আইন মেনে চলতে বাধ্য হবেন। যে অমান্য করবেন বা সিগনাল ভঙ্গ করবেন তার বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিজিটাল মামলা হয়ে যাবে।’
গতকাল বেলা ২টা ১৮ মিনিটে বিজয় সরণি মোড়ে অবস্থানকালে দেখা যায়, ফার্মগেট থেকে জাহাঙ্গীর গেটমুখী সড়কে যানবাহন চলাচল করছে। এর মধ্যেই পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে জেব্রা ক্রসিং পারাপার হচ্ছিলেন। ট্রাফিক পুলিশের এক কনস্টেবল তাদের বাধা দিলেও মানতে নারাজ পথচারীরা। অন্যদিকে সিগনাল পড়লেও, বিশেষ করে কিছু মোটরসাইকেলচালক জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপরে উঠে দাঁড়াচ্ছিলেন। তাদের পেছানোর কথা জানালেও তারা মানছিলেন না। পুলিশ সদস্যরা জানান, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এই সিগনালে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে অন্তত ৭ থেকে ১০টি মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া নিয়মিত ভিডিও মামলাও হচ্ছে। এর জন্য আলাদা টিম বিভিন্ন মোড়ে কাজ করছে বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল দুপুর ১২টার দিকে বনানী মোড়ে দেখা যায়, বনানীর কামাল আতাতুর্ক রোড থেকে যানবাহনগুলো মূল সড়কে উঠতে প্রথমে বিভিন্ন গণপরিবহনের বাধার মুখে পড়ছিল। কারণ সামনে থাকা বাসগুলো এলোমেলোভাবে সড়কের মুখেই দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা-নামানোর কাজ করছিল। তবে একটু সামনে বনানী ‘বাস বে’ সম্পূর্ণ খালি দেখা যায়। সেখানে অটোরিকশা ও বেশ কিছু মোটরসাইকেল পার্কিং করা ছিল। অথচ, বাস থামানোর জন্য নির্ধারিত এ স্থানে কোনো যাত্রীবাহী বাস ঢুকতে বা থামতে দেখা যায়নি। পাশাপাশি এই মোড়ে ওই সময়ে ট্রাফিক পুলিশের কোনো সদস্যকে দেখা যায়নি। এই মোড়েও পথচারীদের ঝুঁকিপূর্ণভাবে রাস্তা পারাপার হতে দেখা যায়।
বেলা সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর বাংলামোটর মোডে দেখা যায়, এখানে ট্রাফিক সিস্টেম অটোমেশন চালু ছিল। এর পরও ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা অটোমেশন সিস্টেম ফলো করে ম্যানুয়ালি যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। তবে পথচারীদের তারা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। পথচারীদের নিয়ম মানতে বললে অনেকেই ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের দিকে তেড়ে আসেন।
বাংলামোটর ট্রাফিক পুলিশ বক্সের ট্রাফিক পরিদর্শক (টিআই) মো. জাহেদুল খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি মনে করি এই সিস্টেমটি সব জায়গায় চালু হলে ট্রাফিক আইন সবাই মানতে বাধ্য হবেন। এটা অনেক কার্যকরী হবে। আমরা অটোমেশন সিস্টেম চালাচ্ছি। এর কিছু বিষয় আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বুয়েটকেও জানানো হয়। এখন এটির ব্যাপক প্রচার দরকার। প্রচারের পাশাপাশি সড়কে কঠোর ব্যবস্থাও প্রয়োজন।’