দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিধি বাড়ছে। তিন কমিশনের (চেয়ারম্যানসহ) পরিবর্তে হবে পাঁচজনের কমিশন। এর মধ্যে কমপক্ষে একজন নারী কমিশনার থাকবেন। কমিশনার হিসেবে নিয়োগের যোগ্য হতে পারেন দুদকের অবসরপ্রাপ্ত দক্ষ কর্মকর্তারাও। একই সঙ্গে দুদকের কাজের প্রতিবেদন ছয় মাস পরপর অনলাইনে (ওয়েবসাইটে) প্রকাশ করতে হবে। এ ছাড়া দুদকের সব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব দেওয়া বাধ্যতামূলক। এমন সব বিধান রেখে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫-এর খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ।
বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক অধ্যাদেশটির অনুমোদন দেওয়া হয়। শিগগির এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হবে। এ ব্যাপারে গতকাল বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘বর্তমানে চেয়ারম্যানসহ তিনজন কমিশনারের সমন্বয়ে এই কমিশন কাজ করে। এখন তা বাড়িয়ে পাঁচজনের কমিশন করা হচ্ছে। এর মধ্যে একজন নারী এবং আরেকজন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হবেন।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত অধ্যাদেশে ন্যূনতম একজন নারীসহ দুদক কমিশনারের সংখ্যা তিন থেকে পাঁচে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। বিদ্যমান দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ৮(১) ধারায় আইন, শিক্ষা, প্রশাসন, বিচার, শৃঙ্খলা বাহিনী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, হিসাব ও নিরীক্ষা পেশায় অভিজ্ঞদের মধ্য থেকে এখন পর্যন্ত কমিশনার নিয়োগ করা হয়েছে। ধারাটি সংশোধন করে আইন, শিক্ষা, প্রশাসন, বিচার, শৃঙ্খলা বাহিনী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, হিসাব ও নিরীক্ষা পেশায় অভিজ্ঞদের পাশাপাশি সুশাসন কিংবা দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে নিয়োজিত সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে কমিশনার নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। সংশোধিত অধ্যাদেশে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে নিয়োজিত ব্যক্তিদের মধ্যে দুদকের অবসরপ্রাপ্ত দক্ষ কর্মকর্তারা কমিশনার হিসেবে নিয়োগের সুযোগ পাবেন বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে। বিদ্যমান আইনে ২০ বছরের অভিজ্ঞদের নিয়োগ দেওয়া হলেও সংশোধনীতে অন্যূন ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনকে কার্যকর, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে গত বছর ‘দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন’ গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। আট সদস্যের এ কমিশনে কমিশনপ্রধান করা হয়েছিল টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানকে। ওই কমিশনের ৪৭টি সুপারিশের মধ্যে অন্যতম ছিল দুদকের কমিশনার সংখ্যা পাঁচজনে উন্নীত করা। তাদের মধ্যে একজন থাকবেন নারী। বর্তমানে কমিশনে তিনজন কমিশনার রয়েছেন। তাদের একজন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অন্য দুজনের মধ্যে একজন কমিশনার (তদন্ত) এবং আরেকজন কমিশনার (অনুসন্ধান) হিসেবে সার্বিক তত্ত্বাবধান ও তদারকির দায়িত্ব পালন করেন। দুদকের নেতৃত্ব বহুমাত্রিক এবং বহু পেশার সমন্বয়ে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করতে কমিশনার সংখ্যা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল।
দুদক সংস্কার কমিশন ২০০৪ সালের দুদক আইনের ৭ ধারায় গঠিত বাছাই কমিটির নাম পরিবর্তন করে ‘বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ নামে অভিহিত করেছে। বিদ্যমান আইনে এ আছেন- প্রধান বিচারপতি মনোনীত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারক, প্রধান বিচারপতি মনোনীত সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব। গতকাল অনুমোদিত অধ্যাদেশে বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটিতে সদস্য সংখ্যা করা হয়েছে সাতজন। তারা হলেন- প্রধান বিচারপতি ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি (তিনি পদাধিকার বলে কমিটির চেয়ারম্যান হবেন)। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি, বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান, জাতীয় সংসদের সংসদ নেতার মনোনীত একজন প্রতিনিধি, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার মনোনীত একজন প্রতিনিধি ও প্রধান বিচারপতি মনোনীত দুর্নীতিবিরোধী ও সুশাসনের কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বাংলাদেশের একজন নাগরিক। বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি দুদকের কমিশনার নিয়োগের জন্য প্রতিপদের জন্য দুজন করে নাম বাছাই করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে। সেই তালিকা থেকে রাষ্ট্রপতি পাঁচজনকে কমিশনার এবং কমিশনারদের মধ্য থেকে একজনকে কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেবেন।